বাস্তবের কাছাকাছি চরিত্রেই নিজেকে খুঁজে পান তিনি
নাচের রিয়েলিটি শো দিয়ে দর্শকের নজরে আসেন, এখন তো টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। নতুন ধারাবাহিক ‘লক্ষ্মী নিবাস’-এ অভিনয় দিয়ে সম্প্রতি আবারও আলোচনায় এসেছেন। প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্যকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যক্তিগত সংগ্রাম—সবকিছু নিয়েই খোলামেলা কথা বললেন অক্ষিতা মুদগল।
বাস্তবের কাছাকাছি গল্পের টান
নতুন ধারাবাহিকটি কেন তাঁকে আকৃষ্ট করল—এ প্রশ্নে অক্ষিতার জবাব, ‘গল্পটা ভীষণ সুন্দর। এক মধ্যবয়সী দম্পতি আর তাঁদের কিছু অপূর্ণ স্বপ্নকে ঘিরে কাহিনি এগিয়েছে। সাধারণত আমরা তরুণদের গল্পই বেশি দেখি, কিন্তু এখানে মধ্যবয়সী মানুষের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা হলো, এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র খুব পরিচিত মনে হয়—দর্শকের মনে হবে, এরা যেন আমাদের চারপাশের মানুষ।’
চরিত্র গ্রহণের প্রসঙ্গেও ছিল একধরনের সততা। অক্ষিতার ভাষায়, ‘আমাকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, এখানে “নায়িকা” হয়ে ওঠার দরকার নেই, চরিত্রটাকে বাস্তবের কাছাকাছি রাখতে হবে। এই সততাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে। বাস্তবের চরিত্রের মধ্যে আমি যেন নিজেকে খুঁজে পাই।’
নিজের অভিনীত চরিত্রটির সঙ্গে মিল খুঁজতে গিয়ে অক্ষিতা বলেন, ‘স্বভাবে রাধিকা আর আমি একেবারেই আলাদা। তবে পরিবারের প্রতি টান, উদারতা আর মূল্যবোধে বিশ্বাস—এই জায়গাগুলোয় মিল রয়েছে। পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে প্রতিক্রিয়া জানানোর ধরনটা আলাদা।’
আগ্রা থেকে মুম্বাই
মাত্র ১০ বছর বয়সে আগ্রা থেকে মুম্বাই—এই দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতি আজও স্পষ্ট মনে আছে। ‘এই পথচলা আমার কাছে সুন্দর এক অভিজ্ঞতা। লড়াই ছিল, কিন্তু তখন এত ছোট ছিলাম যে সবটা বুঝে উঠতে পারিনি। পুরো পথে মা-ই ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। এমন সময়ও গেছে, যখন এক রাত ঘরছাড়া থাকতে হয়েছে। তবু কখনো ভেঙে পড়েননি মা,’ বলেন তিনি।
শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে কেটেছে অক্ষিতার ছেলেবেলা। শৈশব হারানোর কোনো আক্ষেপ নেই? ‘একদমই না। বরং মনে হয়, আমার শৈশব এখনো চলছে। মায়ের কাছে আমি আজও সেই ছোট্ট মেয়েটাই। বাবা-মা আমার সরলতাকে আগলে রেখেছেন,’ বলেন অক্ষিতা।
তারকাদের সঙ্গে কাজের স্মৃতি
শিশুশিল্পী হিসেবে অক্ষয় কুমার ও ইমরান হাশমির মতো বলিউড তারকার সঙ্গে কাজ করেছেন। অক্ষিতা বলেন, ‘ইমরান হাশমির সঙ্গে কাজ খুব বেশি ছিল না। তবে বিক্রম ভাট স্যারের কাছ থেকে প্রথম বড় প্রশংসাটা পাই। তিনি বলেছিলেন, একদিন আমি অনেক দূর যাব।’ অক্ষয় কুমারের সঙ্গে কাজের স্মৃতি তাঁর কাছে বিশেষ। ‘একটা ক্লাসরুম দৃশ্যে ক্যামেরা সেট হচ্ছিল। তখন অক্ষয় স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কে কে ওনার সঙ্গে “টিক-ট্যাক-টো” খেলতে চায়। সবার মধ্য থেকে আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। ১০০ টাকার বাজি ধরেছিলেন। জিতে গিয়ে মজা করে টাকা চাইলে বলেছিলাম, টাকা মায়ের কাছে। উনি হেসে মাকে ডেকে টাকা আনতে বলেছিলেন। সেদিনের মুহূর্তটা আজও মনে আছে।’
আলাপচারিতায় অক্ষিতা জানালেন, বলিউড অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত তাঁর চিরকালীন অনুপ্রেরণা। ‘ছোটবেলা থেকেই আমি ওনার অন্ধ ভক্ত। নাচ আর অভিনয়—দুটোতেই তিনি আমাকে মুগ্ধ করেছেন। আজও যদি কেউ আমাকে “স্টারস্ট্রাক” করতে পারেন, তিনি মাধুরী দীক্ষিত।’
নাচ ও অভিনয়—দুটোই জীবন
নাচ দিয়েই শুরু—‘ড্যান্স ইন্ডিয়া ড্যান্স’-এর মঞ্চে। একসময় কোরিওগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। এখন অভিনয়েই পুরো মনোযোগ। তবে নাচের প্রভাব অস্বীকার করেন না। ‘নাচ আর অভিনয়—দুটোই অনুভূতি আর অভিব্যক্তির শিল্প। নাচ আমাকে অভিনয়ে অনেক সাহায্য করেছে। দুটোর মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নিতে পারব না, দুটোই আমার জীবনের অংশ।’
ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা বা ওটিটিতে কাজ পাওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং? অক্ষিতা মনে করেন, সময় বদলেছে, ‘একসময় টিভির শিল্পীদের জন্য ওটিটিতে সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল। এখন পরিস্থিতি আলাদা। প্রতিটি মাধ্যমের নিজস্ব চ্যালেঞ্জ আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একজন শিল্পী হিসেবে নিজেকে উন্নত করা।’
প্রতিযোগিতা, বৈষম্য ও কঠিন সময়
লিঙ্গবৈষম্যের প্রশ্নে অক্ষিতার অভিজ্ঞতা ইতিবাচক, ‘টেলিভিশন সব সময় নারীকেন্দ্রিক গল্পকে গুরুত্ব দিয়েছে। নারী চরিত্রগুলো গভীরভাবে লেখা হয়। আমি কখনো বৈষম্যের মুখে পড়িনি।’ প্রতিযোগিতা নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার, ‘সবচেয়ে বড় লড়াই নিজের সঙ্গে। অন্যের ভালো কাজ আমাকে ভয় দেখায় না; বরং অনুপ্রাণিত করে।’
তবে পেশাগত জীবনের চেয়েও ব্যক্তিগত জীবনের একটি অধ্যায়কেই অক্ষিতা সবচেয়ে কঠিন বলে মনে করেন। সম্প্রতি তাঁর মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার হয়েছে। ‘অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া মানসিকভাবে খুব কঠিন ছিল। তবে পরিবার প্রতিটি মুহূর্তে পাশে ছিল। ধৈর্য আর সময় মানুষকে আরও শক্ত করে তোলে,’ বলেন অক্ষিতা।
অক্ষিতা জানান, অভিনয় ছাড়া অন্য কোনো পেশা কখনো ভাবেননি। ‘অভিনয়ই আমার স্বপ্ন। এই পথেই এগিয়ে যেতে চাই’—বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে একধরনের দৃঢ়তা। এই দৃঢ় উচ্চারণের প্রমাণও দিয়েছেন, খুব ছোট বয়সে শুরু করা সেই যাত্রা আজও থেমে নেই; বরং প্রতিটি চরিত্রে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা যেন তাঁকে আরও পরিণত করে তুলছে।