কৃষকের লড়াই থেকে স্বাস্থ্যসেবায় দুর্নীতি, সিনেমায় যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিলেন বিজয়
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা ধরনের সিনেমা করেছেন থালাপতি বিজয়। তবে চলতি দশকে তাঁকে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সিনেমায়। কৃষকদের কষ্ট, ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতি থেকে শুরু করে এসব সিনেমায় এসেছে নানা রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। জেনে নেওয়া যাক বিজয়ের পাঁচ রাজনৈতিক সিনেমার গল্প।
‘থামিঝান’: সাধারণ মানুষের আইনজীবী
২০০২ সালের এই ছবিতে বিজয় অভিনয় করেছিলেন সূর্য নামের এক তরুণ আইনজীবীর চরিত্রে। তাঁর লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে আইন সম্পর্কে সচেতন করা। ছবির বিভিন্ন দৃশ্যে দেখা যায়, তিনি সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। বাসের কন্ডাক্টর বয়স্ক যাত্রীকে খুচরা টাকা না দিলে প্রতিবাদ করছেন, আবার করপোরেশনের অবহেলায় দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ নিয়েও সরব হচ্ছেন।
আবদুল মজিদ পরিচালিত এই ছবির আরেকটি বিশেষ দিক হলো, এটি ছিল প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার জীবনের প্রথম সিনেমা। ছবির ট্যাগলাইন ছিল—‘বর্ন টু উইন’। পরবর্তী সময়ে বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থানের দিকে তাকালে এই স্লোগানটিও যেন নতুন অর্থ পায়।
‘থালাইভা’: নেতার জন্ম
‘থালাইভা’ শব্দের অর্থই নেতা। পরিচালক এ. এল. বিজয় নির্মিত এই ছবিতে একজন নৃত্যশিল্পীর গল্প দেখানো হয়, যিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে ফিরে এসে বাবার জায়গায় দাঁড়িয়ে অসহায় মানুষের জন্য লড়াই করেন। ২০১৩ সালে ছবিটি মুক্তির সময় ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে সময় তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জয়লতিতা। শোনা যায়, ছবির ট্যাগলাইন ‘টাইম টু লিড’ নিয়েও রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। অনেকের মতে, এই ছবির মধ্য দিয়েই বিজয় প্রথমবার স্পষ্টভাবে ‘জননেতা’ ইমেজ তৈরি করতে শুরু করেন।
‘কাঠি’: কৃষক ও পানির লড়াই
পরিচালক এ আর মুরুগুদাসের এই ছবিতে বিজয় দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। একদিকে অপরাধী, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। ছবির মূল সংঘাত তৈরি হয় এক করপোরেট ব্যবসায়ী ও কৃষকদের মধ্যে। কৃষিজমি দখল, পানিসংকট ও গ্রামীণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে এগোয় গল্প। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে কৃষক ইস্যু বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি, সামাজিক বার্তার কারণেও আলোচিত হয়েছিল। অনেকে বলেন, এখান থেকেই বিজয়ের ‘প্রো-পিপল’ বা জনমুখী ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হয়।
‘মারসেল’: স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে বিস্ফোরক সংলাপ
অ্যাটলি পরিচালিত এই ছবিতে বিজয় তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক সংলাপ। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির এক দৃশ্যে বিজয় অভিনীত চরিত্র প্রশ্ন তোলে—ভারতে ২৮ শতাংশ জিএসটি নেওয়া হলেও কেন সবার জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় না, অথচ সিঙ্গাপুরে কম কর নিয়েও বিনা খরচে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব?
এই সংলাপ ঘিরে তুমুল বিতর্ক হয়। ভারতীয় জনতা পার্টির কিছু নেতা ছবিটির সমালোচনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। রাজনৈতিক ভাষ্য যে বিজয়ের ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে, ‘মারসেল’ সেটি আরও পরিষ্কার করে দেয়।
‘সরকার’: একটি ভোটের শক্তি
আবারও এ আর মুরুগুদাসের পরিচালনায় নির্মিত এই ছবিতে বিজয় অভিনয় করেন ধনী ব্যবসায়ী সুন্দর রামাস্বামীর চরিত্রে। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে দেখা যায়, বিজয় অভিনীত চরিত্রটি বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসে তিনি দেখেন, তাঁর ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে। এরপর তিনি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। ছবিটি ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কথা বলে। এমনকি গল্পের এক পর্যায়ে নায়ক নিজেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন।
আজ যখন বাস্তব রাজনীতিতে বিজয় সক্রিয়, ভোটে জিতে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তখন ‘সরকার’ সিনেমার অনেক দৃশ্যই যেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বলে মনে হয়।
এবার বাস্তবের ময়দানে
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা এখন তামিলনাড়ুর অন্যতম আলোচিত বিষয়। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর আসন্ন ছবি ‘জন নায়গান’ নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ ছবিটিও রাজনৈতিক বার্তায় ভরপুর বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ, ছবির নামের অর্থই ‘জননেতা’।
দ্য হিন্দু অবলম্বনে