চিত্রনায়িকা চম্পার যে আক্ষেপ আজও রয়ে গেছে

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিন বোন সুচন্দা, ববিতা ও চম্পা—এই তিনটি নাম যেন একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনজনই নায়িকা, তিনজনই একেকটি অধ্যায়, তিনজনই জাতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গর্বের জায়গা দখল করে আছেন। আজ তাঁদের মধ্যে চম্পার জন্মদিন। নীরব, পরিমিত, মার্জিত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকের কাছে হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য আস্থার নাম। পদ্মা নদীর ধারে জেলের সংসার হোক কিংবা মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন—চম্পা পর্দায় এলেই দর্শকের মনে হতো, চরিত্রটা যেন সত্যিই তাঁর শরীর-মনে বাসা বেঁধে আছে।

তারকা পরিবারে বড় হওয়া এক শান্ত স্বভাবের মেয়ে
চম্পার পুরো নাম গুলশান আরা আক্তার চম্পা। ১৯৬৫ সালের ৫ জানুয়ারি যশোরে জন্ম তাঁর। বড় হতে হতে তিনি দেখেছেন তাঁর দুই বোন সুচন্দা আর ববিতাকে রৌপ্যজগতের আলোয় ঘেরা পৃথিবীর মধ্যে হাঁটতে। সেই পরিবেশে জন্ম বলেই হয়তো শিল্পস্বভাবটা তাঁর ভেতরে খুব স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছিল। তবু তিনি নিজেই বলতেন—শুরুতে নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে কল্পনাই করতেন না।
শুরু করেছিলেন মডেলিং দিয়ে। তারপর অভিনয় করেন আবদুল্লাহ আল–মামুনের জনপ্রিয় নাটক ‘ডুব-সাঁতার’-এ। সেই নাটক যেন এক চাবিকাঠির মতো খুলে দেয় তাঁর সামনে নতুন দরজা। দর্শক ও নির্মাতারা বুঝতে পারেন, সংযত দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অভিনয়শক্তি।

গুলশান আরা আক্তার চম্পা
শিল্পীর সৌজন্যে

‘তিন কন্যা’: পর্দায় তিন বোন
১৯৮৫ সাল। শিবলি সাদিক পরিচালিত ‘তিন কন্যা’ ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করলেন সুচন্দা, ববিতা ও চম্পা। বাংলা চলচ্চিত্রে এটি নিঃসন্দেহে বিরল মুহূর্ত। এ ছবিতেই নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন চম্পা। প্রথম ছবিতেই তিনি দেখিয়ে দেন, তাঁর অভিনয় হবে সংযত, স্বাভাবিক ও গভীর আবেগময়। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল আলাদা—চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতো দৃঢ়তা আর কোমলতা একসঙ্গে মিশে থাকত। এরপর আসতে থাকে একের পর এক ছবি—‘সহযাত্রী’, ‘ভেজা চোখ’, ‘কাসেম মালার প্রেম’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘চন্দ্রকথা’। তখন ঢালিউড-জগতে প্রায়ই বলা হতো, বড় বাজেটের ছবি হলে নায়িকা হবেন চম্পা। তাঁর প্রতি নির্মাতাদের সেই আস্থা তৈরি হয়েছিল অভিনয়ের প্রতি তাঁর সততা ও চরিত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই।

বাণিজ্যিক সীমানা পেরিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্র
চম্পা শুধু গ্ল্যামারনির্ভর বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা নন, তিনি বারবার জীবনঘনিষ্ঠ ছবিতেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বিশেষ করে গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘শাস্তি’ ও মুরাদ পারভেজের ‘চন্দ্রগ্রহণ’—এই ছবিগুলোতে তাঁর অভিনয় তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়।

চরিত্রের গভীরে ঢুকে অভিনয় করার যে শক্তি, সেটাই তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি কখনো অতিরঞ্জিত হননি, কখনো বাড়তি আবেগের ভাঁজ চাপাননি। চম্পার অভিনয় ছিল অনেকটা নীরব নদীর মতো—বাহুল্যবর্জিত অথচ গভীর ও স্থির।

বোন সুচন্দা, ববিতার সঙ্গে গুলশান আরা চম্পা। ছবি: ফেসবুক থেকে

এই দীর্ঘ অভিনয়-পথচলায় চম্পা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন পাঁচবার। তাঁর অভিনীত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘অন্য জীবন’, ‘উত্তরের খেপ’, ‘শাস্তি’ ও ‘চন্দ্রগ্রহণ’—এসব ছবিতে পাওয়া স্বীকৃতি আজ তাঁর শিল্পজীবনের মাইলফলক হয়ে আছে।

চম্পার আক্ষেপ
এখন চম্পাকে নিয়মিত দেখা যায় না পর্দায়। মাঝেমধ্যে সাক্ষাৎকারে অভিমানভরা এক সত্যি কথা বলতেন তিনি, ‘ভাবলে খারাপ লাগে, আমাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।’ তবু অভিনয়ের প্রতি তাঁর প্রেম অটুট। তিনি এখনো চান ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে কাজ করতে। তাঁর বিশ্বাস, ‘একজন শিল্পী হবেন পানি, যে পাত্রে যেখানে রাখা হবে, সেখানকার রং-রূপটাই ধারণ করবেন।’ নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের কাজ তাঁর ভালো লাগে। বিশেষ করে বহুরূপী অভিনয়ের উদাহরণ টানতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন চঞ্চল চৌধুরীর নাম। চঞ্চল চৌধুরী যেভাবে চলচ্চিত্রে ভিন্ন ভিন্ন সাজে-চরিত্রে অভিনয় করছেন, সেভাবেই কাজ করতে চান। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে খুব আগ্রহী চম্পা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে পুরোনো-নতুনদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলে মনে করেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমার সফল এই অভিনেত্রী। তাঁর মতে, এভাবেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের সিনেমা।

এক পরিবারে তিন নায়িকা—বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন নজির বিরল। তাই তারকা পরিবারে জন্ম নেওয়াকে জীবনের বড় সৌভাগ্য মনে করেন চম্পা। তবু তাঁর মনে থেকে গেছে একটি না-পাওয়ার বেদনা, ‘আমাদের তিন বোনকে আরও বেশি কাজে লাগানো যেত। শিল্পের আরও অনেক জায়গায় আমাদের করার ছিল। আমরা যদি একসঙ্গে কিছু কাজ করে যেতে পারতাম, তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদের নতুনভাবে চিনত।’ তারকাখ্যাতির আড়ালে এই আক্ষেপ যেন তিন বোনেরই এক যৌথ অভিব্যক্তি।

সুলতানা চরিত্রে চম্পা
ভিডিও থেকে

সমালোচকদের মতে, জীবনে তিনি কখনো খুব আড়ম্বরের মানুষ ছিলেন না। ছিলেন স্বভাবতই শান্ত, গুছিয়ে চলা, আত্মমগ্ন। তাই হয়তো তাঁর অভিনয়েও ছিল ভেতরের দিকে ঝুঁকে থাকা এক গভীরতা। সংলাপের অতিরিক্ত ভঙ্গি নয়, চোখের চাউনিতেই তিনি বলে দিতেন অনেক কথা।