‘স্বপ্নের ঠিকানা’ থেকে ‘তোমাকে চাই’, আবার বড় পর্দায় সালমান শাহ

সালমান শাহছবি: আর্কাইভ থেকে

মাত্র সাড়ে তিন বছরের অভিনয়জীবন। চলচ্চিত্রের সংখ্যা মাত্র ২৭। অথচ মৃত্যুর ৩০ বছর পরও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর আবেদন এতটুকু কমেনি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে দর্শক, বদলেছে চলচ্চিত্রের ভাষা ও দেখার মাধ্যম; কিন্তু সালমান শাহ রয়ে গেছেন একই রকম জনপ্রিয়। তাঁর পোশাক, চুলের ধরন, অভিনয় কিংবা পর্দায় উপস্থিতি এখনো নতুন প্রজন্মের আলোচনায় ফিরে ফিরে আসে।

আগামীকাল ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে প্রয়াত এই নায়কের অভিনীত তিনটি চলচ্চিত্র বিনা মূল্যে প্রদর্শনের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। তিন দিন ধরে বড় পর্দায় আবার দেখা যাবে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ও ‘তোমাকে চাই’ ।

সালমান শাহ
ফাইল ছবি

তিন দিনে তিন সিনেমা

‘সালমান শাহ স্মরণে’ শিরোনামের এ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী চলবে ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর। বিএফডিসির ভিআইপি প্রজেকশন মিলনায়তনে প্রতিদিন বিকেল চারটায় একটি করে চলচ্চিত্র দেখানো হবে।

প্রথম দিন ৬ সেপ্টেম্বর প্রদর্শিত হবে এম এ খালেক পরিচালিত ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ । ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটিতে সালমান শাহর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন শাবনূর ও সোনিয়া। নব্বইয়ের দশকের ব্যবসাসফল ও আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম এটি।

পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর একই সময়ে দেখানো হবে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই বড় পর্দায় অভিষেক হয়েছিল সালমান শাহ ও মৌসুমীর। প্রথম চলচ্চিত্রেই দর্শকের মন জয় করে নিয়েছিলেন সালমান।

প্রদর্শনীর শেষ দিন ৮ সেপ্টেম্বর দেখানো হবে মতিন রহমান পরিচালিত ‘তোমাকে চাই’। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটিতে সালমানের বিপরীতে ছিলেন শাবনূর। সালমান–শাবনূর জুটির জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

সালমান শাহ
ভিডিও থেকে

বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান জানান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর খবর প্রকাশের পর থেকেই দর্শক ও সালমান শাহর ভক্তদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ সাড়া পেয়েছি। তাই আমন্ত্রিত দশ৴কদেরও সুযোগ করে দিতে হচ্ছে। চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সালমান শাহর অগণিত ভক্তের জন্য আয়োজনটি উন্মুক্ত থাকবে।’

প্রদর্শনীতে কোনো প্রবেশমূল্য লাগবে না। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে দর্শকেরা প্রিয় নায়কের চলচ্চিত্র বড় পর্দায় দেখার সুযোগ পাবেন। প্রয়াত এই অভিনেতার অভিনয়, জনপ্রিয়তা ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান স্মরণ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রথম সিনেমাতেই তারকা

সালমান শাহর প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দারিয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে তাঁর জন্ম। শৈশবে ছায়ানটে সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে আসার আগে বিজ্ঞাপনচিত্র ও টেলিভিশন নাটকে কাজ করেছিলেন তিনি।

১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর যেন রাতারাতি বদলে যায় তাঁর জীবন। প্রাণবন্ত অভিনয়, সংলাপ বলার সহজাত ধরন, পর্দায় স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি ও সমকালীন ফ্যাশন তাঁকে অন্য নায়কদের থেকে আলাদা করে দেয়। প্রথম চলচ্চিত্রের সাফল্যেই তিনি হয়ে ওঠেন তরুণ দর্শকের নতুন নায়ক।

সালমান শাহ
ফাইল ছবি

এরপর সালমান শাহকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক মুক্তি পায় ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘বুকের ভেতর আগুন’।

সালমান শাহর ২৭টি চলচ্চিত্রের ১৩টিতেই নায়িকা ছিলেন শাবনূর। পর্দায় দুজনের রসায়ন দর্শকের কাছে এতটাই গ্রহণযোগ্য হয়েছিল যে নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি হয়ে ওঠেন তাঁরা। তবে মৌসুমী, শাবনাজ, লিমা, শিল্পী ও সোনিয়াসহ সে সময়ের আরও কয়েকজন অভিনেত্রীর সঙ্গেও অভিনয় করেছিলেন সালমান।

নায়ক থেকে সময়ের প্রতীক

সালমান শাহর জনপ্রিয়তা কেবল তাঁর চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নায়কের পোশাক, চুলের ধরন ও পর্দায় উপস্থিতি কেমন হতে পারে—সেটিরও নতুন একটি ধারণা তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর জ্যাকেট, শার্ট, মাথার ক্যাপ কিংবা চুলের ছাঁট অনুসরণ করতেন তরুণেরা।
প্রেমিক চরিত্রের পাশাপাশি পারিবারিক গল্প, সামাজিক সংকট কিংবা প্রতিবাদী তরুণের ভূমিকাতেও দর্শক তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। একই সময়ে আবেগ, রোমান্স ও তারুণ্যের ভাষা পর্দায় তুলে ধরতে পারার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নব্বইয়ের দশকের একটি প্রতীক।

সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ই বলে দেয়, সে সময় নির্মাতা ও প্রযোজকদের কাছে সালমান শাহর চাহিদা কতটা ছিল। মৃত্যুর পরও তাঁর অভিনীত কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। সেগুলোও প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টেনেছিল।

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে সালমান শাহ ও মৌসুমী

যে শূন্যতা পূরণ হয়নি

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪ বছর। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছিল চলচ্চিত্র জগৎ ও অসংখ্য ভক্তকে। মৃত্যুর তিন দশক পরও তাঁকে ঘিরে স্মৃতিচারণা, আলোচনা ও বিতর্ক থামেনি।

এত বছরেও কেন সালমান শাহর জনপ্রিয়তা কমেনি—এর উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে তাঁর অসমাপ্ত যাত্রায়। দর্শকের চোখে তিনি কখনো বয়স বাড়াননি; পর্দায় চিরতরুণ হয়েই রয়ে গেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো এখন ইউটিউব কিংবা টেলিভিশনে দেখা গেলেও বড় পর্দায় দেখার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। বিএফডিসির তিন দিনের আয়োজন তাই শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নয়; তিন দশক আগে থেমে যাওয়া এক নায়কের সময়ের কাছে ফিরে যাওয়ারও সুযোগ।

৬ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটায় ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ দিয়ে শুরু হবে সেই ফিরে দেখা। পরের দুই দিন পর্দায় আসবে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ও ‘তোমাকে চাই’। মৃত্যুর ৩০ বছর পর আবার আলো নিভবে মিলনায়তনে, পর্দা আলোকিত হবে, আর দর্শকের সামনে ফিরে আসবেন চিরতরুণ সালমান শাহ।