এই হলগুলোর সেই প্রচারণা শুধু পোস্টারেই আটকে থাকত না। ঘোড়ার গাড়িতে বাদ্যি-বাজনা বাজিয়ে হয়তো কোনো একটা সিনেমা হলের পক্ষ থেকে ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন সিনেমার প্রচার চলত। অন্য আরেকটি হল কর্তৃপক্ষ হয়তো ট্রাকের ওপর টানাত সিনেমার বিশাল আকারের ব্যানার পোস্টার। বর্ণিল সাজে সাজানো ওই ট্রাকটি রাজনৈতিক মিছিলের মতো প্রচুর মানুষ নিয়ে শহরময় ঘুরত।

default-image

ভার্চ্যুয়াল জগতের এই যুগে সিনেমা প্রচারণার রকমফেরই বদলে গেছে। কিন্তু তারপরও ‘দিন: দ্য ডে’র পোস্টার আমাকে টেনে নিয়ে গেল স্মৃতিমেদুর কৈশোরে। সিদ্ধান্ত নিলাম, পুরোনো দিনের মতো এবার ঈদের ছুটিতে হলে গিয়ে সিনেমা দেখব। ঈদের পরদিন অর্থাৎ ১১ জুলাই মিরপুর সনি সিনেপ্লেক্সে গিয়ে দেখি ‘দিন: দ্য ডে’ সিনেমার সন্ধ্যাকালীন শোয়ের কোনো টিকিট নেই। চলে এলাম বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্সে।

ব্ল্যাকে টিকিট কাটা, শো শেষ হওয়ার পর হুড়মুড়িয়ে দর্শকের বের হওয়া—এগুলো এখন বাংলা সিনেমার সোনালি অতীত। কিন্তু হলের অন্ধকার কক্ষে ঢুকতেই দেখি হাউসফুল। একেবারের সামনের সারি, যেখানে ঘাড় উঁচিয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, সেখানেও দর্শকে ঠাসা। পর্দায় নায়ক অনন্ত জলিলের ‘এন্ট্রি’ হতেই মুহুর্মুহু করতালি। একটু পরপর অনন্ত জলিলের ‘অন্য রকম’ উচ্চারণে ডায়ালগ—সেটা শুনে আবার করতালি।

এসব দেখেশুনে আবারও যেন ফিরে গেলাম সিনেমার সোনালি সেই দিনে। বিপদে পড়া নায়িকাকে উদ্ধার করতে যখন পর্দায় নায়কের আগমন ঘটত, নিজে এভাবে কত যে হাততালি দিয়েছি।

default-image

‘দিন: দ্য ডে’ সিনেমার বাজেট, কাহিনি, শিল্পীদের অভিনয়, নির্মাণশৈলী, শিল্পগুণ—এসব নিয়ে কোনো আলোচনা করতে চাই না। কিন্তু একটা ব্যাপার স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের দর্শকদের আবারও হলমুখী করার একটা চেষ্টা করছেন অনন্ত জলিল।

এই সিনেমা মুক্তি দেওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, নটর ডেম কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান চালিয়েছেন অনন্ত জলিল। হলে হলে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে বসে সিনেমা দেখছেন। সিনেমা হলে দর্শক আনা বা প্রচারণার এই কাজটাই ইদানীং খুব কম দেখা যায় বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে। প্রযোজক হয়তো এই আশায় থাকেন, সিনেমা ভালো হলে দর্শক এমনিতেই হলে আসবেন। কিন্তু সেই দিন এখন নেই। পাশের দেশ ভারতে, এমনকি কলকাতায় টালিউডের সিনেমার প্রচারণার যেসব অভিনবত্ব দেখি সেগুলো আমাদের দেশে কেন নেই?

default-image

গত কয়েক বছরে এমনও অনেক সিনেমা দেখেছি, যেগুলো গুণে, মানে, অভিনয়ে, নির্মাণে অনন্ত জলিলের সিনেমার চেয়ে হাজার গুণ ভালো। কিন্তু সিনেমাটা দেখার পর কেবলই মনে হয়েছে, ‘আহারে, এই সিনেমা নিয়ে কেন দেশে কোনো হইচই নেই?’ গত কয়েক দিন ফেসবুকের একটা বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে ‘দিন: দ্য ডে’ সিনেমা নিয়ে দেওয়া স্ট্যাটাস। কেউ নেতিবাচক লিখছেন, কেউ ইতিবাচক। দিন শেষে বাংলা সিনেমা আবারও আলোচনায়, এটা তো মানতেই হবে।

সমালোচকেরা বলছেন, ‘দিন: দ্য ডে’র চেয়ে ঈদে মুক্তি পাওয়া আরেকটি সিনেমা ‘পরাণ’–এর প্রতি দর্শকদের আগ্রহ বেশি। সে হিসাবে যাচ্ছি না। এই যে বাংলা সিনেমা নিয়ে আবারও চায়ের কাপে ঝড় উঠছে, সেটা তো ঈদের নতুন ছবিগুলো ঘিরেই। এটাই–বা কম কী? অনন্ত জলিলের বাচনভঙ্গি বা উচ্চারণ নিয়ে ট্রল হয়। অনন্ত জলিলের নাম শুনে অনেকে ধারণা করে নেন, সিনেমাটা কেমন হবে। কিন্তু হলে গিয়ে হইহুল্লোড় করে সিনেমা দেখার যে মজা, যে আনন্দ হারিয়ে গিয়েছিল আমাদের জীবন থেকে, সেই আনন্দ আর নির্মল বিনোদন পাওয়ার সেতুবন্ধ হয়ে উঠতে পারে নতুন এসব ছবি। সবাইকে অনুরোধ করব, হলে গিয়ে ছবি দেখুন। বাংলা সিনেমার দিন ফিরুক, এই প্রত্যাশা।

ঢালিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন