প্রথমবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমা
বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে (অরিজোন্তি) প্রথমবার জায়গা করে নিল বাংলাদেশের সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন রুবাইয়াত হোসেন। বাংলাদেশ সময় আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ভেনিস উৎসবের মনোনয়ন ঘোষণা শুরু হয়। ৩টা ৩৫ মিনিটে বাংলাদেশের সিনেমাটির মনোনয়ন ঘোষণা করেন উৎসব সভাপতি আলবের্তো বারবেরা।
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো এই চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসর ভেনিস লিডোতে চলবে আগামী ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ক্যারিয়ারের চতুর্থ সিনেমা দিয়ে ভেনিসের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেওয়া রুবাইয়াতের জন্য সহজ ছিল না। কারণ, ভেনিসে হাজারো সিনেমার মধ্যে সেরা সিনেমাগুলো নির্বাচিত হয়। ধাপে ধাপে চলে এই প্রক্রিয়া। সেখানে এবার শুরুতেই সুসংবাদটি পেলেন রুবাইয়াত।
রুবাইয়াত প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিনেমাটি ভেনিসে সাবমিট করার কদিন পরই জানতে পারি, এটি ভেনিসের আয়োজকেরা পছন্দ করেছেন। এটা ছিল আমার জন্য, আমার ক্যারিয়ারের জন্য অসাধারণ একটি খবর। কিন্তু কোন শাখায় সিনেমাটির প্রিমিয়ার হবে, সেটা নিয়ে কিছুই বলেনি। এটা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। অবশেষে জানতে পারি, সিনেমাটি উৎসবে অফিশিয়াল শাখা হরাইজন (অরিজোন্তি) বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে।’
এর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবের আঁ সার্তে রিগা বিভাগে মনোনয়ন পায় বাংলাদেশের আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের সিনেমা ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। সেটা ছিল কানের অফিশিয়াল শাখায় দেশের কোনো সিনেমার প্রথম মনোনয়ন। তারপর বাংলাদেশের সিনেমার বড় অর্জন এল ভেনিসের মনোনয়ন থেকে।
বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরা নিয়ে রুবাইয়াত আরও বলেন, ‘বাংলাদশের হয়ে দেশের সিনেমা দিয়ে ভেনিসে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি, এটাই আমার জন্য অনেক সম্মানের। এটা আমার জন্য অনেক ভালো লাগার। এটা আমার স্বপ্নপূরণের গল্প। আমি চাই, দেশের সিনেমা আরও ভালো জায়গায় যাক।’
১৯৩২ সালে যাত্রা শুরু করা ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হরাইজন বা অরিজোন্তি। এটি অফিশিয়াল শাখা। এ শাখায় চোখ থাকে বিশ্বের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমালোচকদের। কারণ, তরুণ ও আগামীর প্রতিভাবান নির্মাতাদের সিনেমা তুলে ধরে এই শাখা। এ শাখার সিনেমায় স্থানীয় গল্প, উপস্থাপনা, গল্প বলার ধরন, বিষয়বস্তুর নতুনত্ব, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব রয়েছে, এমন চ্যালেঞ্জিং গল্পের সিনেমাগুলোকেই তুলে ধরে।
কী আছে এই ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমায়? এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক হরর চলচ্চিত্র। ঢাকার বিউটি পারলারকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এই সিনেমা। বিয়ে, মেকআপ ও একটি বিউটি পারলারের গল্প নিয়েই এই সিনেমা। বিয়ের সাজের প্রস্তুতি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্য, শরীর, বিশ্বাস, স্মৃতি ও ভয়কে ঘিরে এক অস্বস্তিকর ও রহস্যময় জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে একটি মেয়ে। এর মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে সচেতনতার বার্তা।
সিনেমার জনরা সামাজিক হলেও এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হরর ঘরানা। এর আগে ‘মেহেরজান’, ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সিনেমাগুলো বানালেও এবার প্রথম হরর বেছে নিয়েছেন তিনি। রুবাইয়াত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নারী হয়ে সব সময় নারীদের গল্প বলি। এবারও সিনেমায় তুলে ধরেছি নারীদের কথা। সব সময়ই মনে হয়েছে, নারী হয়ে আমার দায়বদ্ধতা রয়েছে নারীদের গল্প বলা। আর আমি চারপাশে যা দেখি, সেগুলোই গল্প আকারে জায়গা পায়। এবারও আমি আমার চেনা গল্প বলেছি। যে গল্পের সঙ্গে আমার নারী হিসেবে বহু ইমোশন জড়িয়ে রয়েছে।’
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আমার অভিনীত প্রথম সিনেমা। সিনেমাটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হচ্ছে, তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রথম কোনো সিনেমা এত বড় উৎসবে যাচ্ছে। আমি খুবই খুশি। উৎসবে অংশ নেব। সব মিলিয়ে অনেক ভালো লাগছে। আমাকে প্রধান চরিত্রে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য পরিচালককে ধন্যবাদ।’
সিনেমায় সহ-অভিনয়ে রয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু ও সুনেরাহ্ বিনতে কামাল। এ ছাড়া আরও অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম ও মোহাম্মদ বারীসহ অনেকে।
রুবাইয়াত শিল্পীদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার সিনেমায় স্বল্প ব্যাপ্তি জানার পরও বাঁধন, সুনেরাহ্, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলমসহ সবাই আগ্রহ দেখিয়ে এগিয়ে এসেছেন, এ জন্য সবার কাছে কৃতজ্ঞতা। আমার কলাকুশলীদের সহায়তা ছাড়া হয়তো এত দূরে আসতে পারতাম না। আমার সহকারী থেকে টিমের সবার সহায়তায়ই শেষ পর্যন্ত সিনেমা ভালো একটি জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি।’
রুবাইয়াতের এই অর্জনের শুরুটা ছিল একাধিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে তহবিল সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। জার্মান ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড, পর্তুগালের ফিল্ম ইনস্টিটিউট, ইউইমেজেসসহ পাঁচটি দেশ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় সিনেমাটি। পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটি নির্মিত হচ্ছে। বর্তমানে তাঁর সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব নিয়েছে আলোচিত প্রতিষ্ঠান সিনেমা বুটিক।
আগামী ২-১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই উৎসব। উল্লেখ্য, ভেনিসে বাংলাদেশের সিনেমা এবার প্রথম অংশ নিলেও এর আগে ২০১০ সালে ইশতিয়াক জিকোর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘৭২০ ডিগ্রিজ’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের নির্বাচিত হয়েছিল। এটি ছিল উৎসবে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছিল রুবাইয়াতের খনা টকিজ। এবারও ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর বাংলাদেশি সহপ্রযোজক খনা টকিজ। আপাতত সিনেমাটি নিয়ে এক বছর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে ঘুরতে চান রুবাইয়াত।