এফডিসিতে হঠাৎ দেখা ফারিয়া–নিশোর, কী করছেন তাঁরা...

এফডিসিতে শনিবার শুটিংয়ে আফরান নিশো ও নুসরাত ফারিয়াকোলাজ

শনিবারের দুপুর। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) ঢুকতেই বোঝা গেল, দীর্ঘদিন পর পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য যেন একটু ফিরেছে। কোথাও শুটিংয়ের প্রস্তুতি, কোথাও সেট তৈরির ব্যস্ততা, আবার কোথাও শিল্পী-নির্মাতাদের আড্ডা। এক ফ্লোর থেকে আরেক ফ্লোরে ছুটছেন ইউনিটের লোকজন। এরই মধ্যে এফডিসিতে আলাদা শুটিংয়ে ব্যস্ত আফরান নিশো ও নুসরাত ফারিয়া। একজন বিজ্ঞাপনচিত্রের শুটিং করছেন, অন্যজন ওয়েব ফিল্মের।

‘লাপাত্তা’ ওয়েব ফিল্মের শুটিংয়ে নুসরাত ফারিয়া
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

শুটিংয়ের সূত্রে অনেক দিন পর দেখা হলো নিশো ও ফারিয়ার। একে অপরের কাজের খবর নিলেন, কিছু সময়ের জন্য আড্ডায়ও মেতে উঠলেন। এরপর এফডিসির এদিক–ওদিক ঘুরে দেখা গেল আরও পরিচিত মুখ, শোনা গেল পুরোনো দিনের গল্প।

‘লাপাত্তা’ ওয়েব ফিল্মের শুটিংয়ের একটি দৃশ্যে নুসরাত ফারিয়ার সঙ্গে রুশো শেখ
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

বেলা দেড়টার পর এফডিসির ঝরনা স্পটের পুকুরের পাড়ে ‘লাপাত্তা’ ছবির দৃশ্যধারণের জন্য প্রস্তুত পরিচালক। সহকারীর মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছেন নায়িকার কাছে, যেন তাড়াতাড়ি আসেন। পেছন ফিরে দেখা গেল, শুটিং স্পটে আসছেন নুসরাত ফারিয়া। পরনে গোলাপি শাড়ি। পাশে একজন ছাতা ধরে হাঁটছেন। এগোচ্ছেন ঝরনা স্পটের দিকে। একটা সময় পৌঁছে গেলেনও। ফারিয়ার অপেক্ষাই যেন করছিলেন পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয়। তাঁর নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাপাত্তা’ দিয়ে অনেক দিন পর ক্যামেরার সামনে নুসরাত ফারিয়া। এই নির্মাতার সঙ্গে এবারই প্রথম কাজ করছেন তিনি।
ফারিয়া আসার আগেই সাজানো হয় ঝরনা স্পটের ছোট্ট পুকুরের ‘সেতু’। বাহারি রঙের কাপড়ে সাজানো হয়েছে ‘সেতু’টি। চারপাশে নানা জাতের ফুল। সব মিলিয়ে অন্য রকম এক আবহ। পরিচালক জানালেন, সিনেমায় ফারিয়া নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছেন। সেই চরিত্রের প্রয়োজনেই এমন সাজসজ্জা।

‘লাপাত্তা’ ওয়েব ফিল্মের শুটিংয়ে নাসির উদ্দিন খান ও নুসরাত ফারিয়ার সঙ্গে সহশিল্পীরা
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

অন্যদিকে নায়কের কস্টিউম পরে আগে থেকেই স্পটে ঘোরাঘুরি করছিলেন রুশো শেখ। ‘লাপাত্তা’য় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় শুটিং। পরিচালকের মুঠোফোন থেকে তখন উচ্চ ভলিউমে বাজছে মনির খান ও কনকচাঁপার গাওয়া ‘এই বুকে বইছে যমুনা’। নব্বইয়ের দশকের দর্শকের কাছে পরিচিত এই গানটি ‘প্রেমের তাজমহল’ সিনেমায় রিয়াজ ও শাবনূরের ঠোঁটে জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘লাপাত্তা’য়ও অল্প সময়ের জন্য গানটি ব্যবহৃত হবে। তবে এবার পর্দায় গানটির সঙ্গে দেখা যাবে নুসরাত ফারিয়া ও রুশো শেখকে। কয়েকবার দৃশ্যটি ধারণ করার পর পরিচালকের পছন্দ হয়। পরের দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত হন ফারিয়া। এবার তাঁর সঙ্গে একই ফ্রেমে অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান থাকবেন। পরিচালক জানালেন, ছবিটিতে নাসির উদ্দিন খান তিন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করছেন। এর মধ্যে দুটি চরিত্র মুচি সম্প্রদায়ের বাবা ও ছেলের, তৃতীয় চরিত্রটি ব্যবসায়ীর।

‘লাপাত্তা’ ওয়েব ফিল্মের শুটিংয়ের একটি দৃশ্যে নুসরাত ফারিয়ার সঙ্গে রুশো শেখ
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

শুটিংয়ের ফাঁকে ফারিয়ার সঙ্গে কথা হয়। নতুন কাজ নিয়ে বেশ রোমাঞ্চিত তিনি। বললেন, ‘গল্পটা চমৎকার।’ অনেক দিন পর পছন্দের একটি চরিত্র নিয়ে কাজে ফিরতে পেরে তাঁর ভালো লাগার কথাও বোঝা গেল কথায়। উঠে এল আফরান নিশোর প্রসঙ্গ। ফারিয়া জানালেন, এফডিসিতে নিশোর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি তাঁর শুটিং করছিলেন, ফারিয়ার খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনিও নিশোর কাজের খবর নিয়েছেন। অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় দুজনেরই ভালো লেগেছে।

শুটিংয়ের অভিনয়শিল্পী আফরান নিশো ও পার্থ শেখকে দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন পরিচালক শঙ্খ দাশ গুপ্ত
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

ফারিয়ার শুটিং থেকে বেরিয়ে অন্যদিকে যেতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। পরিচালক সমিতির সামনের ফ্লোরে তখন অন্য আরেকটি ছবির শুটিংয়ের প্রস্তুতি। অভিনয়শিল্পী কিংবা পরিচালক কাউকেই তখন দেখা গেল না। সেট ডিজাইনে যুক্ত ইউনিটের একজন সদস্য বলেন, ‘বাসর হবে মাটির ঘরে’ ছবির গানের শুটিং হবে সেখানে। সেখান থেকে বের হতেই দেখা মিলল একসময়ের ব্যস্ত ও গুণী পরিচালক বাদল খন্দকারের। ‘দুনিয়ার বাদশা’ দিয়ে নির্মাণে যাত্রা শুরু করা এই নির্মাতা একে একে নির্মাণ করেছেন ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘পৃথিবী তোমার আমার’, ‘মিস ডায়না’, ‘সাগরিকা’, ‘প্রেম করেছি বেশ করেছি’ ও ‘বিদ্রোহী পদ্মা’র মতো সিনেমা। পরিচালক সমিতির বারান্দায় কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন বাদল খন্দকার। এই প্রতিবেদককে দেখে ডাকলেন। শুরু করলেন গল্প। কথায় কথায় উঠে এল এহতেশাম, মনতাজুর রহমান আকবর থেকে হালের রায়হান রাফী—বাংলাদেশের সিনেমার বিভিন্ন সময়ের নির্মাতাদের প্রসঙ্গ। ছিল হেলাল খান, সালমান শাহ, শাকিব প্রসঙ্গও। পুরোনো দিনের সিনেমা, এফডিসির স্মৃতি আর নির্মাণের নানা গল্পে জমে ওঠে আড্ডা। এখন অবশ্য বাদল খন্দকার নির্মাণের চেয়ে ব্যবসায় বেশি মনোযোগী। তবে সময় পেলে এফডিসিতে চলে আসেন। পুরোনো জায়গায় এসে পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করা, আড্ডা দেওয়া তাঁর কাছে অনেকটা স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার মতোই আনন্দ।

শুটিংয়ের ফাঁকে পরিচালক শঙ্খ দাশ গুপ্তের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন অভিনয়শিল্পী আফরান নিশো
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

এফডিসির ক্যানটিনের সামনেও তখন শুটিং চলছে। ইউনিটের লোকজনের কাছে জানতে চাইলে জানালেন, আফরান নিশোর শুটিং। বিজ্ঞাপনচিত্রের। হাঁটতে হাঁটতে দেখা হলো অভিনেতা শরিফ সিরাজের সঙ্গে। বাইরে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন তিনি। এই শুটিংয়ের তিনিও অংশ। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, মেকআপ রুমে নিশো আছেন। কড়ইতলার পাশের নির্ধারিত রূপসজ্জা কক্ষে গিয়ে দেখা মিলল আফরান নিশোর। অনেক দিন পর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর দেখা। তখন দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি চলছিল তাঁর। কথার শুরুতেই নিজে থেকে জানতে চাইলেন, মেহেদী হাসান হৃদয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি কি না। জানালাম, হৃদয়ের ‘লাপাত্তা’র শুটিং পরিস্থিতি দেখতে এসেছি এবং ফারিয়ার সঙ্গেও দেখা হয়েছে। শুনে তিনিও জানালেন, ফারিয়ার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে এবং দুজনই একে অপরের খোঁজখবর নিয়েছেন।

কাজের প্রসঙ্গ উঠতেই জানালেন, এ বছরে তাঁকে আবার বড় পর্দায় দেখা যেতে পারে। একটি ‘সুড়ঙ্গ ২’, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে—সিনেমার সংখ্যা দুটিও হতে পারে। তবে কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়।

শুটিংয়ের ফাঁকে পরিচালক শঙ্খ দাশ গুপ্তের সঙ্গে অভিনয়শিল্পী আফরান নিশো
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

রূপসজ্জা কক্ষে এ সময় এলেন বিজ্ঞাপনচিত্রটির পরিচালক শঙ্খ দাশ গুপ্ত। এফডিসির নানা বিষয় নিয়ে কথাবার্তার মধ্যেই সেখানে হাজির এ সময়ের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী ও তরুণ পরিচালক পার্থ শেখ। এরপর আড্ডা যেন অন্য রকম হয়ে উঠল। এফডিসি নিয়ে নিজেদের স্মৃতিচারণা করলেন তাঁরা। শুটিংয়ের নানা অভিজ্ঞতা, জীবনে ঘটে যাওয়া মজার ঘটনা—একটার পর একটা গল্পে জমে উঠল হাসি-আনন্দের আসর। বাইরে তখন শুটিংয়ের ব্যস্ততা, আর ভেতরে চলচ্চিত্রের মানুষদের গল্পে ফিরে আসছিল এফডিসির নানা সময়ের স্মৃতি।

ফেরার পথে কড়ইতলার সামনে দেখা হলো রূপসজ্জাশিল্পী মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে। জানালেন, নতুন একটি কাজের বিষয়ে কথা বলতে এফডিসিতে এসেছেন। শিগগিরই সেই কাজ শুরু হওয়ার কথা।

একই দিনে এফডিসিতে চলেছে তিনটি আলাদা শুটিং। একদিকে নুসরাত ফারিয়ার ‘লাপাত্তা’, অন্যদিকে আফরান নিশোর বিজ্ঞাপনচিত্র। কাজ আলাদা হলেও সেই শুটিং দুটিই যেন দীর্ঘদিন পর তাঁদের আবার মুখোমুখি করে দিল। আর তাঁদের দেখা হওয়ার সূত্র ধরে এক দিনের এফডিসি হয়ে উঠল আরও অনেক গল্পের—নতুন কাজের, পুরোনো স্মৃতির, আড্ডার এবং সিনেমার মানুষের চেনা ব্যস্ততার।

দৃশ্যধারণ শেষে পরিচালক মেহেদী হাসানের পাশে বসে মনিটর দেখে নিচ্ছেন নুসরাত ফারিয়া
ছবি : পরিচালকের সৌজন্যে

এফডিসির অলিগলি, রূপসজ্জা কক্ষ, ঝরনা স্পট, ক্যানটিন কিংবা কড়ইতলা—প্রতিটি জায়গায় যেন আলাদা আলাদা গল্প। কোথাও ক্যামেরার সামনে নতুন দৃশ্য তৈরি হচ্ছে, কোথাও পুরোনো দিনের সিনেমা নিয়ে আড্ডা। সব মিলিয়ে শনিবারের এফডিসি যেন মনে করিয়ে দিল, ক্যামেরার বাইরে ঘটে যাওয়া এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হয়তো এফডিসির গল্পকে আরও জীবন্ত করে রাখে।