মন্ত্রীদের কথায় লাগাম টানতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ সোহেল রানার

‘ওরা ১১ জন’ ছবির প্রযোজক মাসুদ পারভেজ, অভিনেতা হিসেবে যিনি সোহেল রানা নামে পরিচিতকোলাজ

নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র কয়েক দিন পেরিয়েছে। এরই মধ্যে দু-একজন মন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নজরে এসেছে মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্রের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী ও রাজনীতিবিদ সোহেল রানার। তিনি এ নিয়ে ফেসবুকে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘কিছু মন্ত্রীর বক্তব্যে এখনই “লাগাম টানতে” হবে।’

ফেসবুক পোস্টের শুরুতে সোহেল রানা লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, গত তিন দিনে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের জনসাধারণ অত্যন্ত আনন্দ এবং আশার সঙ্গে গ্রহণ করেছে আপনাকে।’ এরপরই তিনি সতর্ক করেন, নতুন সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বক্তব্যে সংযম প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ‘কিছু মন্ত্রীদের বক্তব্যে এখনই লাগাম টানানো দরকার। কোন বিশেষ সংবাদ ব্যতিরেকে তাঁদের সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ায় চেহারা দেখানোর প্রয়োজন নেই। মন্ত্রণালয়ের কোন সংবাদ ওই মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দিলেই চলবে। বিশেষ প্রয়োজনে তাঁদের আসা দরকার হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে অনুমতি নিয়ে আসা যেতে পারে।’

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী কী বলতে চেয়েছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে এ ধরনের কথা বলা তাঁর উচিত হয়নি। একজন প্রতিমন্ত্রীর কথাও আমার নজরে এসেছে, যাকে নিয়ে কথা বলাটা খুব মুশকিল। কারণ, তার বাবা আমার ছোট ভাইয়ের মতো (সাদেক হোসেন) খোকা, তারই ছেলে ইশরাক হোসেন এই কথাটা বলেছে, যা মোটেও ঠিক না।
সোহেল রানা

‘সময়ের আগে সমালোচনা নয়, সতর্কবার্তা’
পোস্টের পর প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় সোহেল রানার। তিনি বলেন, ‘যেকোনো জিনিসের সময় দেওয়া উচিত। সময়ের আগে সমালোচনা করা অন্যায়। আমি সমালোচনা করিনি, বরং অনুরোধ করেছি কয়েকটা বিষয়ে নজর দিতে। শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসার আগে দ্রুত চিকিৎসা করা দরকার—এই কথাটাই বলতে চেয়েছি।’
সোহেল রানা মনে করেন, ইতিহাসে ‘অতিকথন’ বা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য অনেক সময় বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের দেশে আগেও দেখেছি, ইতিহাসেও দেখেছি, অতিকথন বাংলাদেশের সর্বনাশের অন্যতম কারণ। সরকারে যাঁরা থাকেন, তাঁদের বক্তব্যের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারপ্রধানের ওপরই বর্তায়।’

‘মন্ত্রী মানেই আর দলের নেতা নন’
সোহেল রানা বলেন, সরকারে গেলে একজন এমপি বা মন্ত্রী আর কেবল দলের প্রতিনিধি থাকেন না, তিনি তখন পুরো দেশের প্রতিনিধি। তাই তাঁকে হিসাব করে কথা বলতে হয়।

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মন্ত্রীদের মিডিয়ার সামনে আসার দরকার নেই। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রই কথা বলুক। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে বক্তব্য দেওয়া যেতে পারে।
সোহেল রানা

‘আমরা তো পৃথিবীর অনেক দেশের মন্ত্রীদের এভাবে প্রতিদিন মিডিয়ার সামনে কথা বলতে দেখি না। মুখপাত্ররাই কথা বলেন। খুব জরুরি কোনো বিষয় হলে তবেই তাঁরা সামনে আসেন। আমাদের এখানে অনেক সময় মন্ত্রীদের হিরো হওয়ার মানসিকতা কাজ করে। একসঙ্গে অনেক মাইক্রোফোন দেখলে কেউ কেউ ভাবেন, আমি তো হিরো হয়ে গেছি! তখন ভুলে যান, তিনি সরকারের অংশ। কথাবার্তা এমনভাবে বলেন, শুনলে রাজনৈতিক কর্মী মনে হয়। কিন্তু এটা তো বক্তৃতার মঞ্চ না,’ বললেন সোহেল রানা। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সরকারের দু-একজন মন্ত্রীর দু-একটা কথা আমার ভালো লাগেনি। শুরুতেই যদি এসব বিষয়ে লাগাম টানা না হয়, তাহলে সামনে আরও অনেকে উল্টাপাল্টা কথা বলতে শুরু করবে।’

সোহেল রানা। প্রথম আলো

‘বিনিয়োগ নিয়ে হুট করে শত্রু বানানো ঠিক না’
বিএনপি সরকার গঠন করেছে মাত্র কয়েক দিন। কয়েক দিন না হলে মানুষ তাদের নিয়ে আরও ভয়াবহরকম প্রতিক্রিয়া দেখাত। প্রথম প্রথম বিধায় হয়তো মানুষ বলছে, দেখা যাক, সামনে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কোন বক্তব্য নিয়ে তাঁর আপত্তি—জানতে চাইলে সোহেল রানা নির্দিষ্ট করে দু-একজন মন্ত্রীর মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ‘সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী কী বলতে চেয়েছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে এ ধরনের কথা বলা তাঁর উচিত হয়নি। একজন প্রতিমন্ত্রীর কথাও আমার নজরে এসেছে, যাকে নিয়ে কথা বলাটা খুব মুশকিল। কারণ, তার বাবা আমার ছোট ভাইয়ের মতো (সাদেক হোসেন) খোকা, তারই ছেলে ইশরাক হোসেন এই কথাটা বলেছে, যা মোটেও ঠিক না।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের কয়েকটা বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিয়ে ইশরাক বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে “জিহাদ ঘোষণা”করলাম! আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি তো বিরোধী দলের নেতা না, আপনি সরকারে। যে বিভাগ নিয়ে কথা বলেছেন, তা-ও আপনার না। এসব বড় বড় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে যদি লাগামহীন কথা বলে শুরুতেই শত্রু বানিয়ে ফেলে, তাহলে তো বিপদ। বিনিয়োগ যদি বন্ধ হয়ে যায়, দেশের উন্নতি হবে কীভাবে? মানুষজনের চাকরি হবে কীভাবে? যেসব ব্যবসায়ীর কথা বলা হয়েছে, তাদের একটা বলয় আছে, সিন্ডিকেটে তারা এসবের নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারের উচিত, কৌশলে সেই বলয়টাকে ভাঙা। এত বড় বড় সব প্রতিষ্ঠানকে হুট করে যদি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এটা মোটেও ভালো কথা না। কোনো বিষয়ে যদি কোনো মতামত থাকেও, সেটা নিজেদের মন্ত্রিসভায় আলোচনা করতে পারে, কীভাবে এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলাপ হতে পারে।’
সোহেল রানা মনে করেন, যদি কোনো সিন্ডিকেট বা অনিয়ম থাকে, তাহলে তা মন্ত্রিসভায় আলোচনা করে কৌশলগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রকাশ্যে লাগামহীন মন্তব্য পরিস্থিতি জটিল করতে পারে।

আরও পড়ুন

‘শৃঙ্খলা দরকার’
ফেসবুক পোস্টে সোহেল রানা লিখেছেন, ‘বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মন্ত্রীদের মিডিয়ার সামনে আসার দরকার নেই। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রই কথা বলুক। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে বক্তব্য দেওয়া যেতে পারে।’ প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, ‘আমি কিন্তু বলেছি, জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে কথা বলতেই হলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়েই বলুক। এতে একটা শৃঙ্খলা থাকে এবং প্রধানমন্ত্রীর নজরেও সব থাকে। এই কয়েক দিনে কেউ কেউ জঘন্য রকমের কথা বলে ফেলেছে।’ তাঁর ভাষায়, ‘প্রথমবার এমপি হয়ে মন্ত্রী-এতে কেউ কেউ হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। এখনই সরকারপ্রধানকে লাগাম টানতে হবে। নাহলে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলবে।’

সোহেল রানা
ছবি: আইজ অন স্টুডিও ইউটিউব চ্যানেলের সৌজন্যে

শুরুতেই সতর্কবার্তা
সোহেল রানা বলেন, নতুন সরকার গঠনের মাত্র কয়েক দিন হয়েছে বলেই হয়তো সাধারণ মানুষ এখনো অপেক্ষা করছে। ‘কয়েক দিন না হলে প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হতে পারত। মানুষ ভাবছে, দেখা যাক সামনে ঠিক হয় কি না।’ তাঁর মতে, শুরুতেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে সরকার ও দলের জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে। ‘আমি সমালোচনা করিনি, অনুরোধ করেছি—এখনই লাগাম টানুন। এতে সরকার শক্ত হবে, শৃঙ্খলাও থাকবে।’ নতুন সরকারের পথচলার শুরুতেই একজন প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদের এই সতর্কবার্তা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এ বার্তাকে কীভাবে গ্রহণ করে।