সামনে এলেন ‘দম’-এর আসল নূর, কাঁদলেন-কাঁদালেন

৪ এপ্রিল বিকেলে নূর ইসলাম ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন এই সিনেমার কলাকুশলীরা

ঈদে মুক্তি পেয়েছে রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘দম’। এই সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো। মো. নূর ইসলামের সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। ৪ এপ্রিল বিকেলে নূর ইসলাম ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন এই সিনেমার কলাকুশলীরা। সেখানে নূর ইসলাম জানিয়েছেন তাঁর জীবনের সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা। ২০০৮ সালে আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে অপহৃত হয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘দম’।

স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন (রানি) ও নূর ইসলাম
ছবি: চরকি

নূর ইসলাম সিনেমাটিকে আন্তর্জাতিক মানের বলে উল্লেখ করেন এবং একই সঙ্গে তিনি আফরান নিশোর অভিনয়কে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ বলে অভিহিত করেন। সঙ্গে এদিন তিনি জানিয়েছেন তাঁর অপহরণ সময়ের কিছু পরিস্থিতি ও অনুভূতির কথা।
নূর ইসলাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নির্মাতা রেদওয়ান রনি এবং প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিলের প্রতি, যাঁদের কারণে ১৮ বছর পর তাঁর জীবনের এই জয়ের গল্প সাধারণ মানুষের সামনে এসেছে। তিনি জানান, ভূরাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কিছু বিষয়ের ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে তাঁকে অপহরণ করা হয় এবং একপর্যায়ে নেওয়া হয় হত্যার সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন

দোয়া ইউনূস এবং উদ্ধার
নূর ইসলাম জানান, তাঁকে হত্যার জন্য গাধার পিঠে বসিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ঠিকমতো পানিও খেতে পারছিলেন না। গাধা হাঁটতে শুরু করলে স্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী ‘দোয়া ইউনূস’ পড়া শুরু করেন। নূর ইসলাম বলেন, ‘ওরা আমাকে জবাই করার জন্য প্রস্তুত ছিল। আমি খুব জোরে জোরে দোয়া ইউনূস পড়ছিলাম। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার সারা শরীর গরম হয়ে গেছে, এক ঐশ্বরিক শক্তি অনুভব করলাম। চার ঘণ্টা ধরে আমাকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষে কমান্ডারের নির্দেশে ওরা আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল এবং বলল, “তোর ওপর আল্লাহর রহমত আছে, তোকে আর মারা যাবে না।”’

পর্দার নূরের সঙ্গে বাস্তবের নূর
ছবি: চরকি

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
নূর ইসলাম ১৮ বছর পর কৃতজ্ঞতা জানান সে সময়ের আপামর জনসাধারণ, টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি। তিনি বিশ্বাস করেন, সব ধর্মের মানুষের দোয়া এবং মহান আল্লাহর অশেষ রহমতেই তিনি আজ বেঁচে আছেন।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি বার্তা
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নূর ইসলাম বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই ৮৪ দিনের ঘটনা ২ ঘণ্টা ৮ মিনিটের সিনেমায় পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ জানুক, মানুষের দোয়ায় বরকত আছে। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আপনার ভেতরে যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্বাস আছে, দম আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হার মানা যাবে না।’
৪ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নূর ইসলামের স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন (রানি)। তাঁর স্বামী বেঁচে আছেন এটা বিশ্বাস করা এবং বাংলাদেশে স্বামীকে ফিরিয়ে আনার লড়াইটা করেছেন তিনি। ঘুরেছেন সংবাদমাধ্যম ও সরকারি অফিসে অফিসে। সবাই একসময় হাল ছেড়ে দিলেও হাল ছাড়েননি আনোয়ারা পারভীন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হতো সে বেঁচে আছে। আমার বিশ্বাস ছিল সে যদি মারা যায়, আমি টের পাব। অনেকেই মনে করত আমি পাগল হয়ে গেছি, বেশি বেশি করছি, কিন্তু আমার কেমন লাগত সেটা আমি বোঝাতে পারব না। সবাই তো ধরেই নিয়েছিল সে আর ফিরবে না। কিন্তু সাংবাদিকেরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। সে যে বেঁচে আছে, সেটা আরও দৃঢ় হয় সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যে। ওই সময় আমি কত বিভিন্ন অফিসে গিয়েছি, তাঁরা বিরক্ত হয়েছেন, কিন্তু আমার আর কিছু করার ছিল না।’

আরও পড়ুন

পর্দার নূর ও রানি
বড় পর্দায় মো. নূর ইসলামের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো, সিনেমায় যাঁর নাম থাকে শাহজাহান ইসলাম নূর এবং পূজা চেরী অভিনয় করেছেন রানি চরিত্রে।
আফরান নিশো তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। অভিনেতা বলেন, ‘নূর ভাই এবং তাঁর স্ত্রীকে এখন হয়তো আপনারা ভালোই দেখছেন কিন্তু তাঁদের ভেতরে এখনো সেই সব দিনের কথা স্পষ্ট। আমি বা আমরা যখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, সময় কাটিয়েছি, তখন সেই ক্ষোভ সেই হাহাকারটা দেখেছি। ১৮ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাগুলো এখনো তাঁদের হুবহু মনে আছে; কারণ, সেগুলো এখনো জীবন্ত। সিনেমার পর্দায় সবটুকু যন্ত্রণার চিত্রায়ণ করা সম্ভব নয়, কারণ সেই অভিজ্ঞতার তীব্রতা দর্শকদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই আমরা একটা সর্বজনীন জায়গা থেকে কাজটা করেছি।’
মো. নূর ইসলাম ও আনোয়ারা পারভীন যখন কথা বলছিলেন, তখন চোখ ছলছল করে উঠেছে পূজার, গলা ধরে এসেছে। সেই অনুভূতিগুলো কাটিয়ে পূজা বলেন, ‘তাঁরা বাস্তব জীবনের নায়ক-নায়িকা। আমার চরিত্রের অনুপ্রেরণা আমি তাঁদের কাছ থেকেই নিয়েছি।’

পর্দার নূর–রানির সঙ্গে বাস্তবের নূর–রানি
ছবি: চরকি

পরিচালক ও প্রযোজক
২০২৩ সালে মো. নূর ইসলামের গল্পটি পড়েন নির্মাতা রেদওয়ান রনি। সে সময় তিনি সিনেমা নির্মাণের জন্য অন্য একটি গল্প নিয়ে এগোচ্ছিলেন, কিন্তু এই ঘটনা তাঁকে এতটাই বিচলিত করে যে এই গল্প নিয়েই তিনি নির্মাণ করে ফেলেন তাঁর নতুন সিনেমা। সংবাদ সম্মেলনে রেদওয়ান রনি বলেন, ‘গল্পটি যখন প্রথম পড়েছি, তখন কেঁদেছি, যখন প্রথম নূর ভাইয়ের সঙ্গে গল্প শোনার জন্য বসেছি, তখন দুজন একসঙ্গে কেঁদেছি। নূর ভাই আমাকে তাঁর ডায়েরিটা দিয়েছিলেন, সেটা পড়লে বোঝা যায় কেন এটা দমের গল্প, কেন এটা বাংলাদেশের বা বাংলাদেশির জিতে যাওয়ার গল্প। সেটাই আমরা পর্দায় তুলে আনার চেষ্টা করেছি। আমার একটা টেনশন ছিল, নূর ভাই সিনেমাটি দেখে কী বলবেন। সিনেমা দেখে এসে তিনি যখন আমাদের জড়িয়ে ধরেছেন, তখন আমি চিন্তামুক্ত হয়েছি।’
‘দম’ সিনেমা প্রযোজনা করেছে এসভিএফ আলফা-আই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড ও চরকি। এসভিএফ আলফা-আই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার শাকিল দর্শকদের এবং সিনেমা সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। এমন অদম্য সাহসিকতার একটি গল্প, বাংলাদেশের গল্প যেন সবাই দেখতে পারে, সে জন্য সারা দেশেই সিনেমাটা পরিবেশিত হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি। জানান, ২৪ এপ্রিল থেকে সিঙ্গেল স্ক্রিনেও মুক্তি পাবে ‘দম’।
নির্মাতা রেদওয়ান রনির সঙ্গে ‘দম’ সিনেমার চিত্রনাট্য করেছেন সৈয়দ আহমেদ শাওকী, আল-আমিন হাসান নির্ঝর, মো. সাইফুল্লাহ রিয়াদ, রবিউল আলম রবি।