বাংলা সিনেমার বিশ্বযাত্রা
অল্প বাজেটে, মেডিকেল কলেজের সংকীর্ণ একটি করিডর আর কয়েকটা কক্ষের শ্বাসরোধী আবহে পুরো গল্পটা বলা হয়েছে। তারপরও নীতিতে অটল এক একাকী মাকে নিয়ে বানানো ছবিটার চিত্রভাষা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের মনে অনুরণন তুলেছে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ছবিটি ২০২১ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের আঁ সার্তেঁ রিগা বিভাগে মনোনয়ন পায়। সেই প্রথম কানের প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনয়ন পায় বাংলাদেশি কোনো সিনেমা। সেই শুরু, এরপর নিয়মিতই বিদেশি উৎসবে যাচ্ছে দেশের সিনেমা। বিদেশি উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমা আগেও গেছে কিন্তু ‘রেহানা’র পর সংখ্যাটা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে বেড়েছে পুরস্কার।
উৎসবে–পুরস্কারে জোয়ার
২০২৩ সালে ২৮তম বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জেতে ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর বলী। মর্যাদাপূর্ণ এ উৎসবের নিউ কারেন্টস বিভাগে সেটাই ছিল বাংলাদেশি কোনো ছবির প্রথম পুরস্কার। এটি সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার জেতা কোনো বাংলাদেশি সিনেমা। সে বছর একই বিভাগে জায়গা পেয়েছিল বাংলাদেশের আরেক সিনেমা বিপ্লব সরকারের আগন্তুক।
শঙ্খ দাশগুপ্তের প্রথম সিনেমা প্রিয় মালতী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। সিনেমাটি এর আগেই কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ায় প্রদর্শিত হয়েছে। পরে ঢাকা চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরামা সেকশনে সেরা সিনেমার পুরস্কার পায় প্রিয় মালতী। এ ছবি দিয়েই বড় পর্দায় মেহজাবীন চৌধুরীর অভিষেক। যদিও তাঁর এটি দ্বিতীয় সিনেমা। মেহজাবীন–অভিনীত প্রথম সিনেমা সাবা মুক্তি পায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে। মুক্তির আগে টরন্টো, বুসান, রেড সি, গটেনবার্গ, সিডনি, রেইনডান্সসহ দুনিয়ার নানা প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোয় প্রদর্শিত হয় মাকসুদ হোসাইনের প্রথম সিনেমাটি।
গত বছরের সেপ্টেম্বরই মুক্তি পায় লীসা গাজীর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা বাড়ির নাম শাহানা। এর আগে ২০২৩ সালে জিও মামি মুম্বাই চলচ্চিত্র উৎসবে জেন্ডার সেনসিটিভিটি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ছবিটি। লন্ডন, শিকাগো, মেলবোর্ন, রোমের চলচ্চিত্র উৎসবেও সিনেমাটি নানা পুরস্কার জিতেছে।
গত বছর মে মাসে আবারও কানে যায় বাংলাদেশের সিনেমা। ৭৮তম কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র শাখায় বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করে আদনান আল রাজীবের আলী। সেই প্রথম দেশি কোনো সিনেমা কানের স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগে জায়গা করে নিয়েছিল। নারীদের গান গাইতে মানা, এমন একটি উপকূলীয় শহর থেকে গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শহরে যেতে চায় এক কিশোর। এমন গল্প নিয়ে তৈরি সিনেমাটির নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন আল আমিন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়েই এখন বাণিজ্যিক ধারার বাংলা সিনেমার দর্শক। ২০২৫ সালে বিদেশের বাজার থেকে আয়ে বছরের শুরু থেকেই এগিয়ে ছিল বরবাদ, জংলি ও দাগি। পরে যুক্ত হয় উৎসব ও তাণ্ডব। প্রতিটি সিনেমার গড় আয় ১ লাখ ডলারের বেশি। দেশের বাইরে জংলির পরিবেশনার দায়িত্বে ছিলেন জাহিদ হাসান। একই সঙ্গে তিনি সিনেমাটির প্রযোজক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সিনেমা হল নেই। মাল্টিপ্লেক্স হাতে গোনা। শুধু দেশে সিনেমা রিলিজ করে তাই টাকা ওঠানো সম্ভব না। সেখানে বিদেশের বাজার আমাদের জন্য বোনাস। যেমন শুধু জংলি দিয়ে আমরা ১ লাখের বেশি ডলার আয় করেছি। এটা আমাদের ভরসার জায়গা তৈরি করছে।’
গত বছরের শেষে আসে বড় সুখবর: রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে একসঙ্গে আমন্ত্রণ পায় বাংলাদেশের তিন সিনেমা—রইদ, মাস্টার ও দেলুপি। এই প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের তিন বিভাগে জায়গা করে নেয় তিনটি দেশি সিনেমা। উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ টাইগার কম্পিটিশনে জায়গা পায় রইদ, বিগ স্ক্রিন বিভাগে মাস্টার আর ব্রাইট ফিউচার শাখায় দেলুপি। গত ২৯ জানুয়ারি নেদারল্যান্ডসের রটারড্যামে শুরু হওয়া এ উৎসবে বিগ স্ক্রিন বিভাগে পুরস্কার জেতে মাস্টার। ছবিটির নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের আগের ছবি নোনাজলের কাব্যও দুনিয়ার নানা প্রান্তের বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হয়, জেতে পুরস্কার।
রাজনৈতিক থ্রিলার মাস্টার স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া শিক্ষক জাহিরের উত্থানের গল্প। সময়ের প্রয়োজনে একজন শিক্ষকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তৈরি হয় নানা সংকট। তাঁকে নির্বাচিত করতে যাঁরা সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই শিক্ষকের কাছে অন্যায্য সুবিধা দাবি করতে থাকেন। একদিকে সাহায্যপ্রত্যাশীদের চাপ, অন্যদিকে নিজের বিবেক। এই দ্বন্দ্ব তাঁকে ভিন্ন এক মানুষে পরিণত করে—এমন গল্প নিয়ে তৈরি সিনেমাটিতে উঠে এসেছে দেশের তৃণমূল রাজনীতির নানা দিক। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পাওয়া ছবিটি পরিচালনার পাশাপাশি প্রযোজনাও করেছেন রেজওয়ান।
বিদেশি উৎসবে আরেক আলোচিত দেশি সিনেমা ছিল মেহেদি হাসানের বালুর নগরীতে। এটি কার্লোভি ভেরি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রক্সিমা শাখায় প্রতিযোগিতা করে জিতে নেয় গ্রাঁ প্রি। এ পুরস্কারের অর্থমূল্য ১৫ হাজার ডলার। সিনেমাটি পরে বুসান, কায়রো, ব্যাংককসহ ১০টির মতো চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছে।
বাড়ির নাম শাহানাসহ গত কয়েক বছরে গুপী বাঘা প্রোডাকশনস লিমিটেডের বেশ কয়েকটি সিনেমা বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছে। দেশি ছবির বিদেশযাত্রা নিয়ে গুপী বাঘা প্রোডাকশনস লিমিটেডের প্রযোজক ও পরিচালক আরিফুর রহমান বললেন, ‘ফিল্ম জিওগ্রাফির কথা চিন্তা করলে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বা আমার সমসাময়িক অন্য আরও যে কয়েকজন বাংলাদেশে থেকে কাজ করেছি, আমাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল এটা। সারা পৃথিবী এখন বদলাচ্ছে। আগে কেবল শৈল্পিক ধারার সিনেমা যেত উৎসবে, এখন বাণিজ্যিক সিনেমাও যাচ্ছে।’
তবে এই প্রযোজক মনে করিয়ে দিলেন বাংলাদেশের বাস্তবতায় সিনেমা প্রযোজনার চ্যালেঞ্জের কথাও, ‘বাংলাদেশের ছবি প্রযোজনা করা একটি কঠিন। তহবিল পাওয়া যায় না, আবার বানানোর পর পরিবেশনার ক্ষেত্রেও সেভাবে সহায়তা পাওয়া যায় না। বিশ্বের সব জায়গায় কিন্তু সব ধরনের ছবির জন্য সহায়তার নানা ক্ষেত্র আছে, কিন্তু বাংলাদেশে এটা নেই। এ কারণে আমাদের আসলে মূল দায়িত্বটা ছিল বাংলাদেশের ছবির একটা আলাদা বৈশ্বিক পরিচিতি তৈরি করা, একটা আলাদা বাজার তৈরি করা। এখন যে আমাদের এত ছবি বিদেশের উৎসবে যাচ্ছে—এ বছর বাংলাদেশ থেকে তিনটা ছবি গেল রটারড্যামে—এটা আসলে আমাদের সেই চেষ্টারই সুফল। আমি বলব যে এখন বাংলাদেশ উৎসবে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ভারতের চেয়েও এগিয়ে। বাংলাদেশের ছবি প্রত্যেক বছরই যাচ্ছে এবং ভালো করছে। এ জন্য আমরা খুবই খুশি। আমাদের বাজারও বড় হচ্ছে।’
এবার কানে স্বপ্লদৈর্ঘ্য সিনেমা বিভাগে বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছে আলী। ছবিটির নির্মাতা আদনান আল রাজীব বলেন, ‘এটা দারুণ ব্যাপার। এমন কিছু অর্জন করব, এটা কখনোই ভাবিনি। আমি শুধু শৈল্পিক মাধ্যমে গল্পটি বলতে চেয়েছিলাম, যেটা আমি সব সময়ই চেষ্টা করি। শুধু এটাই বলব, এটা আমার জীবনের জন্য অনেক বড় একটা অর্জন। এমনকি দেশের জন্যও। আমরা তো আসলে কখনোই কান উৎসবের কথা ভাবিনি। এটা তো স্বপ্নের মতো ব্যাপার।’
আলীর অন্যতম প্রযোজক তানভীর হোসেন মনে করেন সিনেমাটির কানে স্বীকৃতি নবীন নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করবে। তিনি বলেন, ‘স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে তো আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এ ধরনের কাজের মধ্য দিয়েই একজন তরুণ বা নবীন বড় ও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। আমাদের সিনেমা কানের মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নেওয়া. পরে বিশেষ স্বীকৃতি পাওয়া—এসব উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা বলেই মনে করি। এই জায়গা করে নেওয়ার মাধ্যমে আমরা বলতে চাই, আমরাও বিশ্বমানের কাজ করি।’
আসছে বিদেশি তহবিল, বিনিয়োগ
দেশি সিনেমা যেমন বিদেশি উৎসবে যাচ্ছে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগও পাচ্ছে। রটারড্যাম উৎসব চলার সময়ই মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ সিনেমায় নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয় অডিশাস অরিজিনালস। ইন্টারন্যাশনাল এমি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী প্রযোজক অপূর্ব বকশি ২০২০ সালে মনিশা থ্যাগারাজানের সঙ্গে যৌথভাবে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন। নেটফ্লিক্সের এমি বিজয়ী সিরিজ দিল্লি ক্রাইম দিয়ে প্রযোজনা সংস্থাটি যাত্রা শুরু করে। এরপর বানিয়েছে দ্য হান্ট ফর বীরাপ্পন, ডব্লিউওএমবি (উইমেন অব মাই বিলিয়ন), দ্য গ্লাসওয়ার্কার–এর মতো প্রশংসিত প্রকল্প। রইদ–এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিয়ে অপূর্ব বলেন, ‘মেজবাউরের রইদ শক্তিশালী, পৌরাণিক ও মানবিক—এটি আবেগকে একধরনের প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। ছবিটির মৌলিক বার্তা হলো—জীবন নিজেই নিজের জন্য আকাঙ্ক্ষিত। এমন দার্শনিক সাহসিকতা খুব কম সিনেমায় দেখা যায়। এটি আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।’
একই উৎসব চলার সময় রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের মাস্টার সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হয় যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযোজনা সংস্থা কাওয়ানন ফিল্মস। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন কারমেন চ্যাপলিন ও আশিম ভল্লা। তাঁদের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে চার্লি চ্যাপলিন: আ ম্যান অব দ্য ওয়ার্ল্ড। চ্যাপলিন ও ভল্লা জানান, সিনেমাটি সমাজের এমন এক বিরল চিত্র তুলে ধরে, দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে যা খুব কমই দেখা যায়। এটি কেবল সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাই তুলে ধরে না, বরং রাজনীতির মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কেও গভীর ধারণা দেয়।
মেহেরজান, আন্ডার কনস্ট্রাকশন, মেড ইন বাংলাদেশ-খ্যাত পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের নতুন সিনেমা দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড–এও যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন বিদেশি প্রযোজনা সংস্থা। সবশেষ ইতালির ফ্যাশন হাউস প্রাদার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ফন্ডাসিওনে প্রাদা থেকে এটি ৮০ হাজার ইউরো (১ কোটি ১৬ লাখ টাকা) তহবিল পেয়েছে। দেশের কোনো সিনেমা এককভাবে এত বড় অঙ্কের সহায়তা আগে কখনো পায়নি। সিনেমাটির সম্পাদনার কাজ শেষ করে ফ্রান্স থেকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন রুবাইয়াত। পর্তুগালের লিসবনে আবহসংগীতসহ বেশ কিছু কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিয়ে, মেকআপ ও একটি বিউটি পারলারের গল্প নিয়ে এই সিনেমা। সামাজিক ঘরানার এই সিনেমাটিতে যুক্ত হয়েছে হরর উপাদান। এবারই প্রথম হরর জনরায় কাজ করলেন রুবাইয়াত। শৈশবে পারলারে চুল কাটাতে যাওয়ার দিনগুলোতে শোনা একটা গল্প তাকে প্রতিবার পারলারে গিয়ে চুল কাটতে গিয়ে ভয়ের জগতে নিয়ে যেত। সেই শোনা গল্পটিই একটু একটু করে এক যুগের বেশি সময় ধরে ডানা মেলেছে। রুবাইয়াত বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব গল্পগুলোর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাহিদা রয়েছে বলেই কিন্তু আমাদের সিনেমাটি নানা জায়গা থেকে সহায়তা পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের প্রযোজক যুক্ত হচ্ছেন। ডিস্ট্রিবিউটর আসছে। দেশের প্রচলিত গল্প নিয়ে কাজ করতে চাই। যে গল্পে উঠে আসবে আমাদের নারীদের কথা। আমাদের নিজস্ব কথা, আমাদের সংস্কৃতির কথা।’
রুবাইয়াতের এই সিনেমাটি এর আগে জার্মান ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড, পর্তুগালের ফিল্ম ইনস্টিটিউট, ইউইমেজেসসহ বেশ কিছু জায়গা থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটির শুটিং শেষ হয়। সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম। দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড-এ আরও অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন, সুনেরাহ বিনতে কামাল ও রিকিতা নন্দিনী শিমু।
গত বছরের শেষের দিকে বার্লিন ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড থেকে ৪০ হাজার ইউরোর (প্রায় ৫৭ লাখ টাকা) তহবিল পায় সুরাইয়া, বাংলাদেশের সিনেমার জন্য যা বড় একটি অর্জন। একই সঙ্গে সিনেমায় যুক্ত হয়েছেন নরওয়ের প্রযোজক আর্নে ধার। সিনেমাটি পরিচালনা করছেন রবিউল আলম রবি। সিনেমার প্রযোজক ফজলে হাসান। এখন সিনেমাটির শুটিংয়ের পূর্বপ্রস্তুতি চলছে।
সাবা রাজনৈতিক সিনেমা নয়, তবে পরোক্ষভাবে ঠিকই নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন নির্মাতা। সংবাদ পাঠিকার ভয়েসওভারে ফাঁপা উন্নয়ন, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তায় তরুণদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা, কোভিড–পরবর্তী বেকারত্ব যেমন এসেছে, তেমনি দেখা গেছে বাড়িতে বাড়িতে পানির সংকট। এসেছে চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা। মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ যখন অসুস্থ হয়, অস্ত্রোপচারের তিন লাখ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বিবেকটাকে পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিতে হয়।
বিপ্লব সরকারের দ্বিতীয় সিনেমা দ্য ম্যাজিক্যাল মেন-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এশিয়ার আলোচিত প্রযোজক ফ্রান বর্জিয়া। সিঙ্গাপুরভিত্তিক এই স্প্যানিশ প্রযোজক প্রায় দুই দশক ধরে সিনেমা প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত। অচিরেই ছবির কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন বিপ্লব। বাংলাদেশের এই তরুণ নির্মাতা জানান, শুধু ফ্রানই নন, তাঁর সিনেমায় যুক্ত হয়েছেন ফ্রান্সের আরেক প্রযোজক ফ্রাঁসোয়া দো–আর্তেমেয়ার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিকল্প ধারার সিনেমার প্রযোজক হিসেবে তিনিও আলোচিত।
বিপ্লব জানান, ‘বেশির ভাগ সময়ই আমাদের প্রযোজকের সংকটে থাকতে হয়। কে প্রযোজনা করবে, এ প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে। সেখানে প্রযোজক পাওয়াটা স্বাধীন ঘরানার সিনেমার পরিচালকদের জন্য সুখবর।’ তিনি বলেন, ‘আমার সিনেমায় যে দুজন প্রযোজক যুক্ত হয়েছেন, দুই বছর আগে আগন্তুক নিয়ে বুসানে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে পরিচয়। সে সময় আমার সিনেমাটি তাঁরা পছন্দ করেন। পরে নিজেরা আগ্রহী হয়েই আমার পরবর্তী সিনেমা সম্পর্কে জেনে প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হন। বাংলাদেশের সিনেমার পাশে তাঁদের থাকাটা দারুণ একটি খবর।’
বিদেশে ব্যবসা
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়েই এখন বাণিজ্যিক ধারার বাংলা সিনেমার দর্শক। ২০২৫ সালে বিদেশের বাজার থেকে আয়ে বছরের শুরু থেকেই এগিয়ে ছিল বরবাদ, জংলি ও দাগি। পরে যুক্ত হয় উৎসব ও তাণ্ডব। প্রতিটি সিনেমার গড় আয় ১ লাখ ডলারের বেশি। দেশের বাইরে জংলির পরিবেশনার দায়িত্বে ছিলেন জাহিদ হাসান। একই সঙ্গে তিনি সিনেমাটির প্রযোজক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সিনেমা হল নেই। মাল্টিপ্লেক্স হাতে গোনা। শুধু দেশে সিনেমা রিলিজ করে তাই টাকা ওঠানো সম্ভব না। সেখানে বিদেশের বাজার আমাদের জন্য বোনাস। যেমন শুধু জংলি দিয়ে আমরা ১ লাখের বেশি ডলার আয় করেছি। এটা আমাদের ভরসার জায়গা তৈরি করছে।’
জংলির পর আলোচনায় ছিল উৎসব। অল্প সময়েই প্রায় ৩ লাখ ডলার আয় করে এটি নতুন রেকর্ড গড়ে। সিনেমার পরিচালক তানিম নূর মনে করেন, আশার একটা নাম হয়ে উঠছে বিদেশের বাজার। এই পরিচালক আরও বলেন, ‘বুঝতে পারছি, আমাদের সিনেমার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। আরও বড় পরিসরে মুক্তি দিতে পারলে আরও বেশি আয় করতে পারতাম। এই বাজার আমাদের সিনেমার জন্য বড় একটি সুযোগ। ভারতের বাংলাভাষী দর্শকও আমাদের সিনেমা দেখতে চায়। ওখানে উদ্যোগ নিয়ে নিয়মিত সিনেমা মুক্তি দিলে আমাদের জন্য অনেক আশাব্যঞ্জক খবর হবে।’
গত বছর বিদেশের বাজার থেকে সিনেমাগুলো ১২ লাখ ডলারের বেশি আয় করেছে।
নতুন গল্প, নতুন করে বলা গল্প
বাইরের নির্মাতাদের প্রায়ই নিজের জীবন বা আশপাশের ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানাতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশি নির্মাতারাও মন দিয়েছেন আধা আত্মজৈবনিক গল্পে। বালুর নগরীতে সিনেমার কথাই ধরা যাক। নির্মাতা মেহেদী হাসানদের একটা বিড়াল ছিল। সেই বিড়ালের লিটার বক্সের জন্য বালু সংগ্রহ করতে যেতেন তাঁর স্ত্রী মাহজাবীন খান। মোটরসাইকেলে করে বালু সংগ্রহের সময় নারী হওয়ার কারণে রাস্তায় তাঁকে বুলিংয়ের শিকার হতে হতো। প্রায়ই অদ্ভুত সব ঘটনার মুখোমুখি হতেন মাহজাবীন। স্ত্রীর কাছ থেকে সেই ঘটনাগুলো শুনে একটা চিত্রনাট্য খাড়া করেন মেহেদী। এই সবই ২০১৬ সালের ঘটনা। আট বছর ধরে লেগে থাকা সেই সিনেমাই বালুর নগরীতে।
মাকসুদ হোসাইনের সাবায় তুলে ধরা হয়েছে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অসুস্থ মায়ের (রোকেয়া প্রাচী) সেবায় লিপ্ত এক তরুণীর (মেহজাবীন চৌধুরী) গল্প। এখানেও কিন্তু স্ত্রী ত্রিলোরা খানের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই সিনেমাটি চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন নির্মাতা। মাকসুদ হোসাইন বলেন, ‘প্রায় ২৫ বছর আগে ঢাকায় আমার স্ত্রী ও তার মা এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হন। দুর্ঘটনার পর থেকে ত্রিলোরার মা একজন প্যারাপ্লেজিক, প্রতিদিনের যত্নের জন্য ত্রিলোরা আর তার বাবার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ত্রিলোরার বাবার মৃত্যুর পর কাছ থেকে দেখেছি, যথেষ্ট টাকা, ২৪ ঘণ্টা নার্সিং সাপোর্ট আর পরিবার পাশে থাকার পরও মাকে সামলানো ত্রিলোরার জন্য কতটা কঠিন ছিল। সেখান থেকেই আমার মাথায় আসে—যদি ঢাকার নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এমন এক তরুণীর গল্প বলা যায়, যেকোনো সাহায্য, টাকা বা পরিবার ছাড়াই মাকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়ছে? সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে আমাদের সাবা।’
লীসা গাজীও নিজের আশপাশে দেখা গল্প থেকেই তৈরি করেছেন বাড়ির নাম শাহানা। তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে তালাকপ্রাপ্ত নারী হিসেবে আমি নিজেও প্রচুর সামাজিক কুসংস্কার ও অন্যায়ের শিকার হয়েছি। ফলে আমি বেশ ভালোভাবেই জানি, এই নারীরা কীভাবে নিজের ঘরে ও পরিবারে নৈমিত্তিক নিষ্ঠুরতার শিকার হন, প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হন, যা প্রায় সমাজচ্যুত হবারই নামান্তর। এত সব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েও যেসব নারী নিজেদের চলার পথ নিজেরা তৈরি করেন, তাঁদের সাহস এবং আবেগমথিত জটিল গল্পগুলো সব সময়ই আমাকে উদ্বুদ্ধ করে, সেসব গল্পই আমি বলতে চেয়েছি। দীপা তেমনি একজন নারী। তার জীবন নিয়ে অন্যদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত যে গ্রহণ করে না, বরং নিজের মতো করে বাঁচার জন্য লড়াই চালিয়ে যায়।’
কেবল নিজের জীবনের বা আশপাশে দেখা গল্পই যে বলছেন নির্মাতারা, তা কিন্তু নয়; গল্পভাষায়ও এসেছে বদল। যেকোনো বিষয় তাঁরা পর্দায় তুলে আনতে যথেষ্ট পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন। যেমন বাড়ির নাম শাহানায় সিনেমার মূল সুর নারীর লড়াই; পাশাপাশি উঠে এসেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, ধর্মান্ধতার মতো বিষয়। কিন্তু এগুলোর কিছুই বক্তৃতার মতো করে বলা হয়নি, নারীবাদের ক্লাসও নেননি নির্মাতা; বরং দীপার মাধ্যমেই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মোটাদাগে বিষয়বস্তু শুনে যতটা গুরুগম্ভীর মনে হয়, বাড়ির নাম শাহানা মোটেও তেমন বিষণ্ন কোনো সিনেমা নয়, বরং উদ্যাপনের গল্প।
একইভাবে মায়ের অসুস্থতা আর পারিপার্শ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে একা এক তরুণীর সংগ্রামের গল্প হয়েও মাকসুদ হোসাইনের সাবা দমবন্ধ করা কোনো বিষণ্নতার ছবি নয়। মা ও মেয়ের খুনসুটি দেখতে দেখতে দর্শক হেসে উঠেছেন বারবার। ছোট ছোট প্রতিটি কাজ থেকেও কীভাবে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, নির্মাতা যেন সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। চিকিৎসকের বারণ সত্ত্বেও কাচ্চি নিয়ে মায়ের পাগলামি ভোজনরসিক বাঙালির চরিত্রই তুলে ধরে। দেশের সিনেমায় নাগরিক জীবন মানেই যেন রঙিন আলোর ঝলকানি কিংবা শহুরে প্রেমিক-প্রেমিকার মেকি দুঃখ–কষ্ট। সেই পথে না হেঁটে শহরের মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত পরিবারে আলো ফেলেছে সাবা। তুলে এনেছে নানা আঁচড়–পড়া দৈনন্দিন জীবন।
সাবা রাজনৈতিক সিনেমা নয়, তবে পরোক্ষভাবে ঠিকই নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন নির্মাতা। সংবাদ পাঠিকার ভয়েসওভারে ফাঁপা উন্নয়ন, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তায় তরুণদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা, কোভিড–পরবর্তী বেকারত্ব যেমন এসেছে, তেমনি দেখা গেছে বাড়িতে বাড়িতে পানির সংকট। এসেছে চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা। মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ যখন অসুস্থ হয়, অস্ত্রোপচারের তিন লাখ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বিবেকটাকে পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিতে হয়।
গত বছর মুক্তি পাওয়া শিহাব শাহীনের সিনেমা দাগির চিত্রনাট্যও বহুমাত্রিক। প্রায়শ্চিত্তের গল্পের সঙ্গে শিশুদের জন্য ‘গুড টাচ, ব্যাড টাচ’ বোঝার প্রয়োজনীয়তা, পারিবারিক যৌন হয়রানি, জেন–জি, জেন–আলফার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভরতা, সীমান্তবর্তী জেলা শহরে বেকার তরুণদের চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ার প্রলোভন—আলগা কোনো বক্তৃতা ছাড়াই চিত্রনাট্যে ঢুকে গেছে এসব বিষয়।
স্থানীয় বিষয় পর্দায় তুলে আনার জন্য পরিচিত নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম। গত বছর নিজের প্রথম সিনেমা দেলুপিতেও আছে সেই ছাপ। তাওকীরের নির্মাণশৈলীর মূলশক্তি—পরিমিতি, স্থিরতা ও কঠিন বাস্তবতার নিস্পৃহ বয়ান। বিন্দুমাত্র অতিনাটকীয়তা ছাড়াই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বিস্তৃত বিষয় পর্দায় তুলে ধরেছেন তিনি। সংযত ক্যামেরা, বাস্তবিক সংলাপ আর নীরবতার ভেতর লুকিয়ে থাকা টান টান উত্তেজনা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই বাস্তবতা।
৫ আগস্ট–পরবর্তী দেশের ঘটনাপ্রবাহর ছোট এক প্রতিচ্ছবি যেন দেলুপি। একই ফ্রেমে সমান্তরালে প্রবাহিত হয়েছে ক্ষমতার বদল, বন্যা, দখলদারি, শ্রেণিসংঘাত থেকে প্রেম ও সন্দেহ—সব।
বেড়েছে নারীপ্রধান সিনেমা
উপমহাদেশের বাস্তবতায় এ অঞ্চলে নারীকেন্দ্রিক সিনেমা এমনিতেই কম। তবে আশ্চর্যজনকভাবে গত এক-দুই বছরে মুক্তি পাওয়া উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর বেশির ভাগের কেন্দ্রে আছে নারী চরিত্র। এসব সিনেমায় কখনো উঠে এসেছে নারীদের উদ্যাপনের গল্প, কখনো নারীর লড়াই, কখনোবা নারী নির্মাতা নিজেই বলেছেন নারীর গল্প।
২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর মুক্তি পায় প্রিয় মালতী। শঙ্খ দাশগুপ্তের সিনেমাটি দেখে মনে হবে এ যেন সিনেমা নয়, বাস্তবের নিখুঁত রূপান্তর। কেবল গল্প নয়, অভিনয়, কারিগরি দিক, সিনেমাটোগ্রাফি আর নির্মাণ মিলিয়ে সিনেমা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রিয় মালতী। শুধু এ সিনেমাই নয়, গত দেড় বছরে মুক্তি পাওয়া নারীকেন্দ্রিক সব সিনেমাতেই কমবেশি এই চিত্র পাওয়া গেছে। অতিনাটক, দুঃখ-কষ্ট আর হাহাকার থেকে নারীকেন্দ্রিক সিনেমাকে মুক্তি দিয়েছেন নির্মাতারা।
মাকসুদ হোসাইনের সাবায় মা ও মেয়ের সম্পর্ক, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব যেভাবে উঠে এসেছে, দেশের সিনেমায় অনেক দিন এমনটা দেখা যায়নি। এটি যে দেশে মুক্তি পাওয়া গড়পড়তা সিনেমার চেয়ে সব বিচারেই অনেক এগিয়ে, এ কথা বললে ভুল বলা হবে না।
আবার লীসা গাজীর বাড়ির নাম শাহানায় যেভাবে নারীর সংগ্রাম ও উদ্যাপন তুলে ধরা হয়েছে, সেটাও তারিফ করার মতো।
করোনার সময়ের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প জয়া আর শারমীন। মৃত্যুর মুখোমুখি ধনী-দরিদ্রের সব ভেদ যখন ঘুচে যায়, সেই সময়ের দুজন মানুষের অকপট প্রকাশই এ সিনেমার মূল ভাব। গত বছর মুক্তি পাওয়া পিপলু আর খানের সিনেমাটিও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
একইভাবে গত বছর ঈদুল আজহার সিনেমার ভিড়ে ব্যতিক্রম ছিল এশা মার্ডার: কর্মফল। অন্য নারীকেন্দ্রিক সিনেমাগুলোর তুলনায় সানী সানোয়ারের সিনেমাটি মেজাজে পুরোমাত্রায় বাণিজ্যিক। তবে সেখানেও পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা কীভাবে নানাভাবে অনাচার ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, তা উঠে এসেছে। দেশে মৃত্যুরহস্য ঘরানার সিনেমা, খুনের ঘটনার তদন্ত নিয়ে সিনেমা নতুন নয়। তবে এ সিনেমায় গল্প যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, নিঃসন্দেহে তা ঢাকাই সিনেমায় মৃত্যুরহস্য ঘরানার উদাহরণ হয়ে থাকবে। গত বছর মুক্তি পেয়েছে অমিতাভ রেজা চৌধুরীর সিনেমা রিকশা গার্ল ও মুর্তজা অতাশ জমজমের ফেরেশতে। দুই সিনেমাতেই প্রধান চরিত্র নারী।
দেশের নারীকেন্দ্রিক সিনেমা নিয়ে লীসা গাজীর মত, নারীকেন্দ্রিক সিনেমা মানেই কান্নাকাটি, অতিনাটকীয়তা কিংবা শুধুই লড়াই—এটাই প্রচলিত ধারণা। ‘সতী’ কিংবা ‘সর্বংসহা’ হিসেবে এত দিন যেভাবে নারীদের তুলে ধরা হয়েছে, এ ধারণা থেকেও বের হয়ে আসা দরকার। নারীদের মনেও রয়েছে অনেক স্তর, তারাও জটিল। তারা স্বপ্নচারী, অনুভূতিপ্রবণ ও সাহসী। একজন সাধারণ নারীও যখন নিজের চেষ্টায় অসাধারণ হয়ে ওঠেন, সেই গল্পই পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।
নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত মনে করেন, একজন নির্মাতার কাজ শুধু বিনোদন দেওয়া নয়, সময়ের মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরা। প্রিয় মালতী তাঁর কাছে কোনো সাহসী পদক্ষেপ মনে হয়নি, নারীকেন্দ্রিক সিনেমা বানাতে চান, এটা নিয়েও আলাদা করে ভাবেননি। বরং তাঁর মনে হয়েছে গল্প বলার একটি স্বাভাবিক ধারা, ইন্ডাস্ট্রিতে যা এত দিন উপেক্ষিত ছিল। তাঁর মতে, ‘চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করার জন্য নারীকেন্দ্রিক সিনেমা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’
নতুন কী আসছে
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক দিন নতুন সিনেমা মুক্তি পায়নি। তবে ঈদে আবারও চাঙা হওয়ার অপেক্ষায় ঢাকাই সিনেমা। নতুন ১২টি সিনেমা মুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, পরের ঈদেও মুক্তির মিছিলে আছে আরও গোটা দশেক সিনেমা।
এই ঈদে মুক্তির তালিকায় আছে শাকিব খান অভিনীত আবু হায়াত মাহমুদের প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা। ১৯৯০–এর দশকের অপরাধজগতের পটভূমিতে তৈরি ছবিটিতে ঢাকার গ্যাংস্টার–সংস্কৃতির একটি অধ্যায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। সিনেমায় শাকিবের বিপরীতে অভিনয় করছেন কলকাতার জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু ও ঢাকার তাসনিয়া ফারিণ।
ওটিটি ও সিনেমা—দুই মাধ্যমেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আফরান নিশো। এবার ঈদে দম নিয়ে আসছেন তিনি। এই সিনেমা দিয়ে বহু দিন পরে চলচ্চিত্র নির্মাণে ফিরছেন রেদওয়ান রনি। সত্য ঘটনা অনুপ্রাণিত সারভাইভাল ঘরানার ছবিটির একটা বড় অংশের শুটিং হয়েছে কাজাখস্তানে।
বিরতির পর ঈদ উৎসবে দেখা যাবে আরিফিন শুভর নতুন ছবি মালিক। সাইফ চন্দনের অ্যাকশন-ড্রামা ঘরানার ছবিতে শুভর বিপরীতে অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম।
গত বছরের পবিত্র ঈদুল ফিতরে বরবাদ বানিয়ে আলোচনায় আসেন পরিচালক মেহেদী হাসান। এবার ঈদে আসছে তাঁর রাক্ষস। ছবিতে অভিনয় করেছেন সিয়াম আহমেদ ও কলকাতার সুস্মিতা চট্টোপাধ্যায়। পরিচালক জানান, বরবাদ সিনেমার মতো রাক্ষস সিনেমায়ও ভরপুর অ্যাকশন, ভায়োলেন্স থাকবে। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় ছবিটির শুটিং হয়েছে।
থাকছে রায়হান রাফীর সিনেমাও। পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে তাঁর নতুন সিনেমা প্রেশার কুকার। পরিচালক ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম সূত্রে জানা গেছে, এ সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, প্রচলিত অর্থে কোনো নায়ক এতে নেই। কিছু নারী চরিত্র ঘিরে আবর্তিত হবে পুরো গল্প।
গত বছর উৎসব বানিয়ে চমকে দেন পরিচালক তানিম নূর। এবার বনলতা এক্সপ্রেস নিয়ে আসছেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের কিছুক্ষণ উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি তৈরি হচ্ছে। চিত্রা নামের এক মেয়ের এক দিনের ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে সিনেমার কাহিনি। ছবিতে চিত্রা চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাবিলা নূর। আরও আছেন শরীফুল রাজ, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, বাঁধন, মম প্রমুখ।
এসব সিনেমা ছাড়াও বছরের বাকি সময়ে মুক্তি পাওয়ার কথা মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ, সাকিব ফাহাদের সোলজার, রায়হান রাফীর আন্ধার, এন রাশেদ চৌধুরীর সখী রঙ্গমালা। দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও মুক্তি পাবে এসব সিনেমা। কোনো সিনেমা হয়তো দেশে–বিদেশের বাজারে ব্যবসা করবে, কোনোটিতে নতুন ঢঙে গল্প বলে চমকে দেবেন নির্মাতা। এই তালিকায় নেই, এমন কোনো সিনেমাও হয়তো বড় কোনো উৎসবে জায়গা করে চমকে দেবে সবাইকে।
আমরা সেই অপেক্ষাতেই রইলাম।