‘ভাইয়া, তোমার হাতটা দাও’—রুবেলের উপহারে চমকে গেলেন সোহেল রানা
চিত্রনায়ক বড় ভাই মাসুদ পারভেজ সোহেল রানার একটি ছোট্ট ইচ্ছার কথা মনে রেখেছিলেন চিত্রনায়ক ছোট ভাই মাসুম পারভেজ রুবেল। এক বছর, দুই বছর নয়—প্রায় ৪০ বছর ধরে। বড় ভাই নিজেই হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন সেই ঘটনা। কিন্তু ভুলে যাননি রুবেল। তাই এত বছর পর বড় ভাইয়ের সেই পুরোনো পছন্দের কথা মনে রেখে তাঁকে দামি একটি ঘড়ি উপহার দিলেন তিনি। ছোট ভাইয়ের এই ভালোবাসার উপহারে ইমোশনাল সোহেল রানা।
মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা ও মাসুম পারভেজ রুবেল—দেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় দুই অভিনয়শিল্পী ভাই। প্রায় ৪০ বছর আগে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে গিয়েছিলেন সোহেল রানা। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই রুবেল ও পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন। চিকিৎসা শেষে চিকিৎসক জানান, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। এরপর হাসপাতাল থেকে হোটেলে ফেরেন তাঁরা। সুস্থ থাকার আনন্দে বিকেলে বেরিয়ে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে একটি ঘড়ির দোকানে ঢোকেন তিনজন।
দামি ঘড়ির প্রতি সব সময় আগ্রহ ছিল সোহেল রানার। তাই দেশের বাইরে যখনই যেতেন, ঘড়ির দোকানে একবার ঢুঁ মারতেন। ১৯৮৫ সালের সেদিনও গিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর হাতে ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা (সেই সময়ের) দামের রাডোর একটি ঘড়ি। নতুন আরেকটি দামি ঘড়ি কেনার ইচ্ছা থেকেই শোরুমে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে একটি ঘড়ি দেখানো হয়, যেটির দাম ছিল প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। দাম শুনে কিছুটা হতবাক হয়ে যান তিনি।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে আজ শনিবার দুপুরে সোহেল রানা বলেন, ‘ঘড়ির দোকানে গিয়ে বললাম, ভালো ঘড়ি দেখান। সেই সময় আমার হাতে ৩০ হাজার টাকা দামের সুন্দর একটা রাডো পরা ছিল। যত দূর মনে পড়ে, আমাকে দোকানি দেখিয়েছিল পাতেক ফিলিপ—ওই সময়ে ঘড়িটির দাম সাড়ে সাত লাখ টাকা চেয়েছিল। দাম শুনে আমি হতচকিত হয়ে পড়ি। তারপর বললাম, আরও কম দামের দেখান। তখন কমাতে কমাতে বুচারার ব্র্যান্ডের একটি ঘড়ি কিনেছিলাম। ওই সময়ে ঘড়িটির দাম ছিল ৫০ হাজার টাকা।’
তবে ঘড়ি কিনে শোরুম থেকে বেরিয়ে এলেও পছন্দের সেই দামি ঘড়িটির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন সোহেল রানা। বিষয়টি খেয়াল করেছিলেন ছোট ভাই রুবেল। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার দশক। সোহেল রানা ভুলে গেলেও রুবেলের মনে রয়ে যায় সেই ঘটনা। সোহেল রানা বলেন, ‘বুচারার কিনলেও পাতেক ফিলিপ ব্র্যান্ডের ঘড়ি যে বারবার দেখছিলাম, এটা আমার ছোট ভাই খেয়াল করেছিল। আজ এত বছর পর সে শুধু আমার জন্য ঘড়ি কিনতে ব্যাংককে গেছে। আমি যে ঘড়িটা সেদিন দেখেছিলাম, ওটার দাম এখন কোটি ছাড়িয়েছে।’
চার দশক আগের সেই ঘড়িটি শেষ পর্যন্ত কেনা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বড় ভাইয়ের পছন্দের কথা ভুলে যাননি তিনি। ইউরোপিয়ান একটি দামি ব্র্যান্ডের সুন্দর ঘড়ি কিনে এনেছেন সোহেল রানার জন্য। বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার উত্তরায় সোহেল রানার বাসায় যান রুবেল। তখনই বড় ভাইকে চমকে দেন তিনি। সোহেল রানা বলেন, ‘কথা বলার এক পর্যায়ে রুবেল বলল, ভাইয়া তোমার হাতটা দাও। আমি হাত বাড়িয়ে দিতে দেখি, একটা প্যাকেট খুলল। খুলে আমার হাতে অসাধারণ একটি ঘড়ি পরিয়ে দিল। আর বলল, পাতেক ফিলিপ তো দিতে পারলাম না, যেটা তোমার শখ ছিল—কিন্তু এটা দিলাম।’
ঘড়িটি হাতে পরিয়ে দেওয়ার পরই ছোট ভাইকে বুকে টেনে নেন সোহেল রানা। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর কাছে উপহারের দাম নয়, এত বছর পরও ভাই যে তাঁর সেই ছোট্ট ইচ্ছার কথা মনে রেখেছেন—সেটিই সবচেয়ে বড়। সোহেল রানা বলেন, ‘টাকা বিচার্য বিষয় না, ছোট ভাই যে বড় ভাইয়ের চাওয়ার কথা মনে রেখেছে—এটা অনেক বড় ব্যাপার। যে ঘড়িটা এনেছে, সেটাও কিন্তু ওর সাধ্যের চেয়ে অনেক ওপরে, ভাইয়ের জন্য এটা কিনে এনেছে—এই উপহারের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর কোনো তুলনা চলে না।’
সোহেল রানার সংগ্রহে পছন্দের আরও কয়েকটি ঘড়ি আছে। কিন্তু রুবেলের দেওয়া এই ঘড়িটি এখন তাঁর কাছে আলাদা। সোহেল রানা বলেন, ‘আমার অন্য ঘড়িও থাকবে—তবে ছোট ভাইয়ের এই উপহারের ঘড়িটা এখন আমার সবচেয়ে বেশি পরা হবে।’