১০ তারকার মুক্তিযুদ্ধের প্রিয় সিনেমা
‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ থেকে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘গেরিলা’ কিংবা ‘আমার বন্ধু রাশেদ’—মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ১০ নির্মাতা ও শিল্পীর কাছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রিয় সিনেমার কথা শুনেছে প্রথম আলো।
১. আগুনের পরশমণি
২. জীবন থেকে নেয়া
৩. গেরিলা
জয়া আহসান, অভিনয়শিল্পী
‘আগুনের পরশমণি’ আমার অসম্ভব প্রিয়। আমার অসম্ভব প্রিয় আরেক ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’। একটি পরিবারের ভেতর দিয়ে দেশ চালানোকে কীভাবে দেখানো যায়, সেটা আমরা সিনেমাটির মাধ্যমে দেখতে পারি। ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমায় দেখি, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দমবন্ধকর অবস্থা ও মানুষের আবেগের বিষয়টি সুন্দরভাবে উঠে এসেছে।
সব সময় যুদ্ধের ছবি হতে হলেই যে শুধু যুদ্ধ দেখাতে হবে তেমনটা নয়, কয়টা ছবি আসলে ‘গেরিলা’র মতো হয়? ‘গেরিলা’র মতো ছবি বানানো তো সম্ভব নয়। ‘গেরিলা’র মতো ছবিও যেমন দরকার, তেমনি ‘আগুনের পরশমণি’র মতো ছবিও দরকার। ‘গেরিলা’ মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল। ‘গেরিলা’ ছবির ভয়াবহতা বেশির ভাগ মানুষ নিতে পারেনি। তার মানে, মুক্তিযুদ্ধ কতটা ভয়াবহ ছিল।
পরিচালক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেছিলেন, ‘“আমি ‘গেরিলা’ ছবিতে কিছু দেখাতেই পারিনি। আমি শুধু চেষ্টা করেছি সত্যের একটু কাছাকাছি যেতে।’” তা–ও মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহতা, নৃশংতা, তিনি কিছুই দেখাতে পারেননি; সেখান থেকে তিনি এটা বানিয়েছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি ‘গেরিলা’ ছবিতে অভিনয় করতে পেরেছি, এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের, মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আমাদের টিমের ছোট্ট একটা নৈবেদ্য। ছবিটিতে অভিনয় করতে গিয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিল। এত সত্য, এত সুন্দর ও এত বিশ্বাসযোগ্যভাবে সবকিছু শুটিং সেটে হচ্ছিল, আমার কাছে মনে হচ্ছিল যুদ্ধই চলছিল। প্রতিটি শটে মনে হয়েছে, যুদ্ধ করছি। কোনো শটে জয়া আহসান থেকে বিলকিস বানুতে ডুবতে আমার এক সেকেন্ডও লাগেনি। সেটা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল, আমার কাছে মনে হয়েছিল, আমি একদম একাত্তরে চলে গেছি।
আমি কৃতজ্ঞ আমার পরিচালকের প্রতি, আমার পুরো টিমের প্রতি। কারণ, আমি এ রকম একটা চরিত্রে কাজ করতে পেরেছি। আমার জীবনে করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ ‘গেরিলা’।
‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ ছবির সেই দৃশ্যটা দেখলে এখনো কাঁদি। এখনো যখন সোশ্যাল মিডিয়াতে আসে, সুচরিতা ম্যাডাম সৎছেলেদের লুকিয়ে রেখে তার আপন ছেলে, যে কিনা একটু স্পেশাল চাইল্ড ছিল, সেই বাচ্চাকে যখন রাজাকারদের বা পাকিস্তানি আর্মিদের হাতের সামনে এগিয়ে দেয়, স্টেনগান দিয়ে সেই ছেলেকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে হত্যা করে, এখনো সেই দৃশ্য দেখলে আমি ছোটবেলার মতো কাঁদি। ওই দৃশ্যটা দেখে কাঁদেনি, এমন মানুষ কম পাওয়া যাবে। আমার কাছে মনে হয়, ওই দৃশ্যটা সবার দেখা উচিত। মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে আমি যে কথা বলতে চাই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যত বড় ছিল, সে অনুযায়ী আমাদের সাহিত্যেও আসেনি মুক্তিযুদ্ধ, চলচ্চিত্রেও আসেনি।
মুক্তিযুদ্ধকে আমরা কেউ তুলে ধরতে পারিনি। এটা তুলে ধরাটা আসলে খুব কঠিন, কেউ পারিনি। এটা নিয়ে আরও কাজ হওয়া উচিত। আরও বেশি কাজ করা উচিত। কারণ, একমাত্র ছবির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব এবং জানাতে পারব যে কীভাবে করে আমরা বাংলাদেশ নামটা পেয়েছি; কীভাবে আমরা আমাদের মানচিত্রটা পৃথিবীর বুকে আঁকতে পেরেছি আসলে।
১. জীবন থেকে নেয়া
২. আলোর মিছিল
৩. আবার তোরা মানুষ হ
শাকিব খান, অভিনেতা
আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধের ছবির মধ্যে মাস্টারপিস ‘জীবন থেকে নেয়া’। ছোটবেলায় টেলিভিশনে এই সিনেমা দেখেছি। তখন তো প্রতি মাসের শুক্রবারে বিভিন্ন ধরনের সিনেমা দেখাত। ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চসহ বিভিন্ন দিবসে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখানো হতো। পরিবারের সবাই মিলে আমরাও সেসব সিনেমা দেখতাম। স্কুলে যখন পড়ি, তখনই প্রথম ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি দেখি। পরদিন দেখতাম, স্কুলেও সবাই এ সিনেমা নিয়ে কথা বলছে। বড়দের মধ্যেও এ সিনেমার গল্প নিয়ে আলোচনা হতো।
আমার কাছে মনে হতো, হাসতে হাসতে একটা সিনেমা কতটা অসাধারণভাবে স্বাধীনতার কথা বলে দিল! এমনও শুনেছি, এ সিনেমা বানানোর জন্য ওই সময়ে সিনেমার কয়েকজনকে ভোগান্তিতেও পড়তে হয়েছিল। সিনেমা তো আসলে এমনই হওয়া উচিত। আমার কাছে মনে হয়, ‘জীবন থেকে নেয়া’ নির্দিষ্ট কোনো ঘরানার নয়, সব শ্রেণির সিনেমা হয়ে উঠেছে। একেবারে সাধারণ মানুষ যেমন ছবিটি দেখে এন্টারটেইনড হয়েছে, স্বাধীনতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছে, তেমনি বোদ্ধাশ্রেণির মানুষও খুব সহজেই সবকিছু রিলেট করতে পেরেছে। আমার কাছে এই ছবি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে তৈরি একটা মাস্টারপিস। বিনোদনের মাধ্যমে এই ছবির গল্প মুক্তিযুদ্ধকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছে, এটা সত্যি অন্য রকম।
‘আলোর মিছিল’ আমার দেখা আরেকটি প্রিয় সিনেমা। ছবির গল্পে সদ্য স্বাধীন হওয়া বিপর্যস্ত দেশে মুক্তিকামীদের লড়াই, অভাব-অনটনের মধ্যে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজের রাতারাতি ধনী হওয়া এবং সমাজের সুবিধাবাদী, লোভী মানুষের শুধু নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য দেশের সর্বনাশের বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গের এক অসাধারণ ভিজ্যুয়াল ‘আলোর মিছিল’। এ সিনেমায় সাবিনা ইয়াসমীনের গাওয়া ‘এই পৃথিবীর পরে/ কত ফুল ফোটে আর ঝরে’ তো কালজয়ী। সিনেমার গল্পটা আমার মন ছুঁয়ে যায়।
‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিটিও আমার প্রিয়। কেন জানি মনে হয়, এই ছবির নামটাই দারুণ, ভীষণ ভালো লাগার। আমার মনে হয়েছে, ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সব সময়ের তরুণদের জন্য প্রযোজ্য। তরুণেরা যদি বিপথে যায়, তাদের জন্য এটা ভালো একটা ফিল্ম। তবে কষ্টের বিষয় হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ যত বড় একটি ব্যাপার, এটা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আর সেভাবে ছবি তৈরি হলো না।
আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের গল্পে আরও সিনেমা নির্মাণ করা উচিত। আমাদের এই দেশটা যে অনেক কষ্টের বিনিময়ে পাওয়া, সিনেমার মাধ্যমেও তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জানতে পারবে।
১. মাটির ময়না
২. শ্রাবণ মেঘের দিন
৩. অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী
গিয়াস উদ্দিন সেলিম, নির্মাতা
‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ সিনেমাটি ছোটবেলায় দেখেছি। ‘মাটির ময়না’ ও ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
১. ওরা ১১ জন ২. জীবন থেকে নেয়া ৩. আগুনের পরশমণি
চঞ্চল চৌধুরী, অভিনেতা
মুক্তিযুদ্ধের অনেক সিনেমাই আমার প্রিয়। ‘ওরা ১১ জন’ থেকে শুরু করে কিংবা তারও আগে থেকে যদি বলি, ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি আমার প্রিয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের আগের ছবি। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের ‘আগুনের পরশমণি’, তৌকীর (আহমেদ) ভাইয়ের ‘জয়যাত্রা’, বাচ্চু (নাসির উদ্দীন ইউসুফ) ভাইয়ের ‘গেরিলা’ আমার প্রিয় সিনেমা। সর্বশেষ আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধের প্রিয় সিনেমার মধ্যে রয়েছে আকরাম খানের ‘নকশীকাঁথার জমিন’।
প্রতিটি ছবিতেই সেই সময়ের জীবনবাস্তবতা, মুক্তিযুদ্ধকালের পরিস্থিতি উঠে এসেছে। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্ম। এই ছবিগুলো দেখে কিছু বাস্তবতা আমরা দেখতে পাই বা বুঝতে পাই। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের কথা চিন্তা করি, তাহলে এই ছবিগুলোর কথা বলতে হবে। সব কটি সিনেমার চিত্রনাট্য, গল্প ও অভিনয়ে সেই সময়টাকে আসলে ধরা যায়।
১. আলোর মিছিল
২. ওরা ১১ জন
৩. আবার তোরা মানুষ হ
শিহাব শাহীন, নির্মাতা
সিনেমাগুলো স্বাধীনতার পরপরই নির্মিত হয়েছিল। ছোটবেলায় ছবিগুলো দেখেছি। সেই স্মৃতি এখনো অমলিন।
১. আলোর মিছিল
২. আবার তোরা মানুষ হ
৩. হাঙর নদী গ্রেনেড
শারমীন সুলতানা সুমী, সংগীতশিল্পী
ছোটবেলায় আব্বা-আম্মাসহ পরিবারের সবার সঙ্গে এই ছবিগুলো দেখা হতো। ছবিগুলো দেখার পর গল্প হতো। দেশকে ভালোবাসতে শেখার প্রথম পাঠ হিসেবে সিনেমাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আমার জীবনে।
১. মাটির ময়না
২. আগুনের পরশমণি
৩. মেঘমল্লার
তানিম নূর, নির্মাতা
‘মাটির ময়না’, ‘আগুনের পরশমণি’ ও ‘মেঘমল্লার’-এ সিনেম্যাটিক এক্সিলেন্স আছে। মুক্তিযুদ্ধকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে; সংগ্রাম, বীরত্ব, ত্যাগ উঠে এসেছে। ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমায় শহরের গল্প, ‘মাটির ময়না’ সিনেমায় গ্রামের গল্প আর ‘মেঘমল্লার’ সিনেমায় মফস্সলের গল্প বলা হয়েছে।
১. জীবন থেকে নেয়া
২. মাটির ময়না
৩. আগুনের পরশমণি
রায়হান রাফী, নির্মাতা
এই তিন সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধের আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবিগুলো দেখে আবেগতাড়িত হয়েছি।
১. আমার বন্ধু রাশেদ
২. হাঙর নদী গ্রেনেড
৩. গেরিলা
তাসনিয়া ফারিণ, অভিনেত্রী
যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, তাঁরা ছবিগুলো দেখলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ইমোশনালি কানেক্ট করতে পারবেন। আমার দেখা প্রথম মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। এরপর খুঁজে খুঁজে বেশ কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা দেখেছি।
১. আমার বন্ধু রাশেদ
২. জীবন থেকে নেয়া
৩. মুক্তির গান
খায়রুল বাসার, অভিনেতা
‘আমার বন্ধু রাশেদ’ সিনেমায় একজন কিশোরের দেশপ্রেম আমাদের প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করেছে। কিশোরের ত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কতটা বর্বরতা–নৃশংসতা সয়েও নিরস্ত্র বাঙালি এই বাংলার জয় চেয়েছিল।
‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় একটি পরিবারের গল্পের মধ্য দিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থার জটিল বিষয় আমাদের সহজ করে বলেছেন শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান। তা ছাড়া এ সিনেমার গানগুলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জাগরণের গানে পরিণত হয় এবং আমাদের জাতীয় সংগীত আমরা শুনি এ সিনেমায়। মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে তা জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত হয়।
মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী আর গানের অবদান নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ বারবার আমাদের মুক্তির ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।