শাকিব খান কি এবার পিছিয়ে গেলেন

‘প্রিন্স’ ছবির ‘পরী’ গানের পোস্টারে শাকিব খান ও জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু

তিন বছর আগে, ২০২৩ সালে পবিত্র ঈদুল ফিতরে ‘প্রিয়তমা’য় নতুন এক শাকিব খানকে দেখা যায়। সিনেমায় তাঁর ভিন্নধর্মী লুক যেমন নজর কাড়ে, তেমনি ব্যবসায়িক বিচারেও সিনেমাটি নতুন এক মাইলফলক গড়ে। এরপর তিন ঈদে মুক্তি পেয়েছে তিন ধরনের তিনটি ছবি ‘তুফান’, ‘বরবাদ’ ও ‘তাণ্ডব’। ভিন্ন ভিন্ন গল্প হলেও শাকিব খান তিনটি সিনেমাতেই হয়ে উঠেছিলেন পুরোদস্তুর অ্যাকশন হিরো। প্রতিটি সিনেমায় নিজেকে নতুন করে ভেঙেছেন, গড়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এই ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’য় প্রিয় তারকাকে আরও নতুন রূপে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন দর্শক। তাঁদের প্রত্যাশা কি মেটাতে পারল ‘প্রিন্স’?

একনজরে

সিনেমা: প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা

ধরন: অ্যাকশন-ড্রামা

পরিচালক: আবু হায়াত মাহমুদ

গল্প: মেজবাহ উদ্দিন সুমন

চিত্রনাট্য: মেজবাহ উদ্দিন, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, অনম বিশ্বাস ও আশরাফুল আলম

অভিনয়: শাকিব খান, জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু, তাসনিয়া ফারিণ, লোকনাথ দে, দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য, ইন্তেখাব দিনার, রাশেদ মামুন অপু, শরীফ সিরাজ

রানটাইম: ২ ঘণ্টা ২৯ মিনিট

নব্বইয়ের দশকের পুরান ঢাকার অপরাধজগতের অন্ধকার অধ্যায়ের গল্প নিয়ে সিনেমাটি বানিয়েছেন আবু হায়াত মাহমুদ। শুরুতে দেখা যায়, ইব্রাহিম তথা প্রিন্সকে (শাকিব খান) কাঁটাতারের বেড়া কেটে পালাতে সাহায্য করছেন নায়িকা দিলরুবা (তাসনিয়া ফারিণ)। ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা শুনে বোঝা যায়, কেউ একজন এ তথ্য পাচার করেছে পুলিশের কাছে। এ তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ রেইড করে। ধরা পড়ে ইব্রাহিমের সহযোগী ভুট্টি (শরীফ সিরাজ)। তারপর ভুট্টির বয়ানে এগিয়ে চলে গল্পের কাহিনি।
ভুট্টির বস, অর্থাৎ বাবু ওস্তাদের (মৃত্যুঞ্জয় ভট্টাচার্য) সহযোগী ছিল ইব্রাহিম ও ভুট্টি। বাবু ওস্তাদের মাধ্যমেই বারে বাউন্সারের কাজ নেয় ইব্রাহিম। বারে কমিশনারের ছেলের সঙ্গে মারামারি করে জেলে যায়। সেখানেই পুরান ঢাকার অপরাধজগতের নেতা গোপাল করের (লোকনাথ দে) সঙ্গে পরিচয়। ধীরে ধীরে গোপালের সহযোগী থেকে পুরান ঢাকার ত্রাস প্রিন্স হয়ে ওঠে ইব্রাহিম। কিন্তু গোপালের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন আফগানি পাঠান (দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য)। পাঠানকে টপকে কি ঢাকার অপরাধজগতের মালিক হতে পারে গোপাল আর প্রিন্স? নাকি হার মানতে হয় পাঠানের কাছে? এমন গল্পের ওপর ভিত্তি করেই এগিয়েছে প্রিন্স।

‘প্রিন্স’–এ শাকিব খান। ভিডিও থেকে

অপরাধজগৎ নিয়ে সিনেমার ফর্মুলা মেনেই শুরু হয় ‘প্রিন্স’-এর গল্প। তবে নির্মাণে মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারেননি আবু হায়াত মাহমুদ। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল খাপছাড়া চিত্রনাট্য আর ডিটেইলিং। নব্বইয়ের দশকের পুরান ঢাকার পটভূমিতে সিনেমার গল্প বলা হলেও ভৌগোলিক অসংগতি বারবার চোখে পড়ে। কোথাও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কোনো স্থানের দেখা পাওয়া যায়নি। পাওয়া যাবে কী করে, সিনেমার পুরান ঢাকার দৃশ্যের শুটিংই তো হয়েছে কলকাতায়। শুটিং রিয়েল লোকেশনেই হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু পর্দায় সেটা বারবার বোঝা যাবে কেন?

সিনেমার পটভূমি যে নব্বইয়ের দশক, তা মেনে নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। বিশেষ করে নব্বইয়ের পটভূমিতে নির্মিত সিনেমায় ছাদে ছাদে মোবাইল টাওয়ার আর সেলুনে রাউটারের উপস্থিতি খুবই দৃষ্টিকটু। অসংগতি কেবল পটভূমি বা চিত্রায়ণে নয়, সম্পাদনাতেও। এ সিনেমার গল্পকে ভাগ করা হয়েছে দুটি অধ্যায়ে—চ্যাপটার ওয়ান: রাইজ অব দ্য প্রিন্স আর চ্যাপটার টু: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা। কিন্তু কোন ঘটনা আগে ঘটছে আর কোনটি পরে, সিনেমার অধিকাংশ সময় তা ধরতেই পারেননি দর্শক।

আরও পড়ুন

এ ধরনের বাণিজ্যিক সিনেমায় নায়কের নায়কোচিত পারফরম্যান্স বা মাস মোমেন্টও সেভাবে ছিল না। নায়ক আর খলনায়কের চিরচেনা রোমাঞ্চ, টক্কর, দ্বৈরথও কম। গ্যাংস্টার সিনেমার উত্তেজনাও নেই।

এবার আসা যাক অভিনয়ে। গোপাল কর চরিত্রে লোকনাথ দে ভালো অভিনয় করলেও প্রিন্সের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেকটাই খাপছাড়া। ঠান্ডা মাথার আফগানি পাঠান চরিত্রে দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য ভালো। কিন্তু তাঁর চরিত্রের ভয়াল দিক নির্মাতা পর্দায় তুলে ধরতে পারেননি। বরং ভুট্টি চরিত্রে শরীফ সিরাজ ভালো করেছেন। টর্চারের দৃশ্যে তাঁর অভিব্যক্তি ছিল দারুণ। পুলিশ কর্মকর্তা মিনহাজের চরিত্রে ইন্তেখাব দিনারও মন্দ নন, কিন্তু তিনি নিজেকে কেন ‘দ্য মিনহাজ’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, এর পেছনের কোনো কারণ দেখাতে পারেননি পরিচালক। তেমনি প্রিন্সের পরিবারের একটি অংশ গল্পে ঢোকানো হলেও এটি ছিল অপ্রয়োজনীয়। একইভাবে ইব্রাহিমের গ্যাংস্টার হয়ে ওঠার কোনো ব্যাখ্যা সেভাবে নেই, কেবল কয়েকটি সংলাপের মাধ্যমে সেটা বোঝানো যথেষ্ট ছিল না। মোটের ওপর সিনেমার পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতারা মন্দ করেননি, কিন্তু মুশকিল হলো, তাঁদের সবাই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, পুরান ঢাকার গল্পে কলকাতার উচ্চারণ কানে লেগেছে বারবার।

‘প্রিন্স’–এর দৃশ্যে তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: টিজার থেকে

পরিচালক সবচেয়ে হতাশ করেছেন শাকিব-ভক্তদের। গত কয়েক বছরে মুক্তি পাওয়া শাকিব খানের সিনেমাগুলোয় তাঁকে উত্তরোত্তর উন্নতি করতে দেখা গেছে। ‘তুফান’ আর ‘বরবাদ’-এ স্টাইলিশ অ্যাকশন আর ‘তাণ্ডব’–এ হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট করে চমকে দিয়েছিলেন শাকিব। কিন্তু তাঁর সেই অ্যাকশনের ক্ষমতাকেই যেন কাজে লাগাতে পারেননি পরিচালক। পুরো সিনেমার অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি গড়পড়তা। আর অ্যাকশনের প্রায় পুরোটাই অস্ত্রনির্ভর, সেখানেও বৈচিত্র্য কম। দুর্বল নির্মাণে শাকিব খানের ইব্রাহিম তথা প্রিন্সের চরিত্রও খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাই মনে হলো, টানা কয়েক বছর চমকে দেওয়ার পর শাকিব কি এবার একটু পিছিয়ে গেলেন?
অন্যদিকে শাকিব খানের বিপরীতে সোনিয়া চরিত্রে জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু ছিলেন বেমানান। প্রথম দিকের রোমান্টিক দৃশ্যগুলোয় চলনসই হলেও শেষ দিকে তিনি ছিলেন একেবারেই সাদামাটা। জ্যোতির্ময়ীর সঙ্গে পর্দায় শাকিবের রসায়ন মোটেও জমেনি।

তবে তাসনিয়া ফারিণের উপস্থিতি কম সময়ের জন্য হলেও তিনি তাঁর চরিত্রে ছিলেন উজ্জ্বল। বিশেষত ‘জ্বালা জ্বালা’ ও ‘ডিসকো সুন্দরী’ গানে ফারিণের নাচ ও অভিব্যক্তি ছিল দারুণ। এ সিনেমায় তাঁকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল। সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি, চলে যাওয়া আবার ফিরে আসা—সবই যেন ঘটেছে হুট করে।
সিনেমায় রোমান্টিক গান ‘পরী’ গেয়েছেন ইমরান মাহমুদুল ও কোনাল। ড্যান্স নাম্বার ‘জ্বালা জ্বালা’য় কণ্ঠ দিয়েছেন রুনা লায়লা ও প্রীতম হাসান। আর ‘ডিসকো সুন্দরী’ গেয়েছেন জি এম আশরাফ ও দোলা রহমান। চিত্রায়ণ ভালো হলেও দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে গানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আবেদন হারিয়েছে। নব্বইয়ের গল্পের সিনেমার গানে সেই সময়ের ছাপও খুব একটা দেখা যায়নি।

‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাকিব খান
ভিডিও থেকে

আবহসংগীতও সিনেমার মেজাজের সঙ্গে মানানসই ছিল না। বেশ কয়েক বছর ধরে আবহসংগীতে আরাফাত মহসীন নিধি ভরসার নাম হয়ে উঠলেও এ সিনেমায় নামের প্রতি মোটেও সুবিচার করতে পারেননি তিনি।

ভিএফএক্স ছিল এই সিনেমার আরেকটি দুর্বল দিক। ২০২৬ সালে এসে বড় বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমায় এত দুর্বল ভিএফএক্স হতাশ করেছে। শাকিব খানের হাতে যে আইকনিক মেশিনগানের ছবি পোস্টার, টিজারে দেখা গেছে, সে দৃশ্যটিতেই যেন সবচেয়ে কম নজর দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে হতাশার, কিছু সাধারণ দৃশ্যের শুটিং হয়েছে গ্রিন স্ক্রিনে, যা খুবই দৃষ্টিকটু।

তবে এত দুর্বলতার পরও নির্মাতা যে বড় আয়োজনে শাকিব খানকে নিয়ে একটি ভালো অ্যাকশন সিনেমা করতে চেয়েছিলেন, সেটা স্পষ্ট। কয়েকটি দৃশ্যে শাকিব খানের অভিব্যক্তি দারুণভাবে তুলে ধরেছেন চিত্রগ্রাহক। একটি দৃশ্যে শাকিব খান জ্যোতির্ময়ীর সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলে পরের দৃশ্যেই প্রচণ্ড রাগের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন, দৃশ্যটি ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন চিত্রগ্রাহক। একজনের মৃত্যুর পর সবার একত্র হওয়ার দৃশ্যটার চিত্রায়ণও দুর্দান্ত। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সবার মাথায় ছাতা, শোকের আবহ—দেখতে দারুণ লাগে। এ সিনেমার চিত্রগ্রাহক ছিলেন অমিত রায়, শৈলেশ অবস্থি ও সাহিল রনি।

‘প্রিন্স’–এর টিজারে শাকিব খান। ভিডিও থেকে

সবচেয়ে বড় চমক ছিল শেষে, যেখানে সিকুয়েলের ইঙ্গিত স্পষ্ট: দৃশ্যটি যেমন যত্ন নিয়ে করা হয়েছে, তেমনই শাকিব খানকে দেখতেও লেগেছে দারুণ। দেখে আফসোস লেগেছে, এই ছাপ কেন পুরো সিনেমায় নেই!

তবে সিনেমায় যত দুর্বলতাই থাকুক, ছবিতে শাকিব খান থাকলে তাঁর ভক্তরা আর কিছুই চান না। তাই শাকিব–ভক্তরা তো বটেই, বাণিজ্যিক অ্যাকশন সিনেমাপ্রেমীরা দেখতে পারেন প্রিন্স।