শুরুতে উল্লেখ করা দেয়াল দিয়ে সমাজের শ্রেণিবৈষম্য বুঝিয়েছেন তিনি। দেয়ালের এক পাশে বস্তি, যেখানে সমাজের দরিদ্র লোকের বাস। অন্য পাশে বারিধারা, উচ্চবিত্তদের ঠিকানা।

দেয়ালের ফুটো গলে বারিধারায় যাওয়া হাসান ও জাভেদ কাঁঠাল নিয়ে ফিরতে পারে না, যে দৃশ্য দিয়ে পরিচালক হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, এটা ধনীদের এলাকা বাবা, এখন যত তুচ্ছ জিনিসই হোক, তুমি নিয়ে বের হতে পারবে না।

‘কাঁঠাল’ শুরু হয় ক্রিকেট ম্যাচের দৃশ্য দিয়ে। সিনেমাটির প্রধান চরিত্র হাসান (ইশরাক তূর্য) আরেক হাসান মানে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানে পাঁড় ভক্ত। আপাতত তাঁর জীবনের একমাত্র স্বপ্ন বলা যায় সাকিব আল হাসানের একটি জার্সি জোগাড়। এক দোকানে জার্সি একটা পছন্দ হয়েছে বটে; তবে বড্ড বেশি দাম। বাবা জেলহাজতে, মা কাজ করে সংসার চালায়। ৫০০ টাকা দিয়ে হাসানকে জার্সি কিনে দেবে কে? হাসান তার সাধারণ লাল-সবুজ জার্সির ওপর লাল টেপ দিয়ে সাকিবের নাম লিখে মাঠে নেমে যায়। সতীর্থরা দ্রুতই ধরে ফেলে তাঁর চালাকি, প্রতারকের তকমা পায়।

অন্যদিকে, জাভেদ (পৌষাল চৌধুরী) ক্লাসে নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ে। প্রতারক তকমা নিয়ে সে-ও নেমে আসে বন্ধুর কাতারে। একপর্যায়ে জাভেদ যখন পরীক্ষায় ‘চিট’ করে অনুতপ্ত, তখন হাসান তাঁকে সাহস দিয়ে বলে, ‘হিরো হইতে হইতে হইব হিরো, সাকিব ভাইয়ের মতো।’ জাভেদ তখন পাল্টা দেয়, ‘তোর সাকিব ভাইও চিট করছে।’ যা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের মাঠ ও মাঠের বাইরে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডই মনে করিয়ে দেয়।

হাসান ও জাভেদ দেয়ালের ফুটো গলিয়ে বারিধারায় প্রবেশের পর আকস্মিকভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কাঁঠাল পেয়ে যায়। বুদ্ধিমান হাসানের মাথায় জব্বর বুদ্ধি খুলতেও দেরি হয় না—এই কাঁঠাল বেঁচেই তো নিজে নিজের স্বপ্নের জার্সিটা কিনতে পারে। কিন্তু বড়লোকের এলাকায় কাঁঠাল বেচা কি সোজা? যেখানে ডান্ডা হাতে উর্দি পরা নিরাপত্তারক্ষী মজুত করে রাখা হয়েছে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ’ ঠেকানোর জন্য।
এর মধ্যে গল্পে হাজির হয় হাসান ও জাভেদের বয়সী এক মেয়ে, যার বাড়ির গাছ থেকে কাঁঠাল চুরি করেছে জাভেদ ও হাসান। দাদির লাগানো গাছের কাঁঠাল ওর কাছে বেশি আবেগের। ফল, মেয়েটির বাবার নির্দেশে কাঁঠালচোর ধরতে মাঠে নামে বারিধারা নিরাপত্তারক্ষীরা।

এদিকে হাসান ও জাভেদ হেন জায়গা নেই কাঁঠাল বিক্রির চেষ্টা করেনি। কিন্তু বড়লোকদের কেউই তাদের কাঁঠাল কিনতে চায় না। বরং সুযোগ পেয়ে তাদের নানাভাবে অপদস্থ করে, আর উগরে দেয় সেই চিরাচরিত সংলাপ—ভিক্ষা না করে কিছু করে খাওয়ার চেষ্টা করো। যদি ওরা কিছু একটা বিক্রির চেষ্টা করেছিল; সেটি চুরির কাঁঠাল হলেও।

শ্রেণিবিভাজন মাথায় না রেখেও ৪৫ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের সিনেমাটি এককথায় দারুণ উপভোগ্য। কেবল শ্রেণিবৈষম্যই নয়, সিনেমাটি দিয়ে পরিবেশ, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন চরিত্রের মানুষকে দেখিয়েছেন। প্রধান দুই চরিত্রে তূর্য ও পৌষাল দুর্দান্ত। বিশেষ করে তূর্ষ বলেকয়ে ছক্কা হাঁকিয়েছে। সিনেমাটির প্রায় প্রতিটি ফ্রেমেই ওর উপস্থিতি। এত সাবলীল, প্রাণবন্ত অভিনয় দেখতে পারাটাও দারুণ অভিজ্ঞতা। শুরুর কয়েকটি দৃশ্যে পৌষালকে একটা জড়সড় মনে হলেও দ্রুতই সেটি কাটিয়ে ওঠে। তবে জাভেদের তুলনায় হাসানকে একটু কম ‘বস্তির ছেলে’ মনে হয়। কিন্তু ওর অভিনয় অবশ্য সেটি মনে রাখার সুযোগ দেয় না। ছোট একটি দৃশ্যে প্রয়াত অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদ ঠিকই নিজের ঝলক দেখিয়েছেন

হাসান ও জাভেদ বস্তির ছেলে। কিন্তু কাঁঠাল তাদের বস্তির জীবনের দুঃখ-দুর্দশার গল্প নয়; বরং দেখানো হয়েছে জীবনকে তাদের মতো উপভোগ করার চেষ্টা। এটি শিশুতোষ কমেডি সিনেমা, যার পরতে পরতে মিশে আছে অ্যাডভেঞ্চার। সপ্তাহান্তে পরিবারের সবাই মিলে উপভোগ্য সিনেমা বলতে যা বোঝায় তা–ই। বাংলাদেশে শিশুতোষ সিনেমার সংখ্যা হাতে গোনা। ‘কাঁঠাল’ নিঃসন্দেহে দেশের শিশুদের সিনেমা হিসেবে প্রথম দিকেই থাকবে।

সিনেমা শুরু হয় হয়েছিল খেলার মাঠের দৃশ্য দিয়ে, শেষটাও তা–ই। তবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শেষ দৃশ্যে দেখা যায় ঝোলানো পোস্টারে লেখা—‘কাঁঠাল মার্কায় ভোট দিন’, যা পড়ে চাইলে অন্য মানেও বের করে নেওয়া যায়।

কাঁঠাল

পরিচালক: অমিত আশরাফ

দৈর্ঘ্য: ৪৫ মিনিট

ধরন: শিশুতোষ কমেডি

অভিনয়: ইশরাক তূর্য, পৌষাল চৌধুরী

স্ট্রিমিং: বায়োস্কোপ