সামির, মেহরীন আর ফাহাদের সঙ্গে আড্ডা

‘এটা আমাদেরই গল্প’–এর শেষ পর্ব প্রচারিত হবে আগামী শুক্রবার। আলোচিত ধারাবাহিকের গল্প ও চরিত্রকে ছয় মাসেই আপন করে নিয়েছেন দর্শক। শেষ পর্ব প্রচারের আগেই গত রোববার আড্ডায় বসেছিলেন নাটকের ফাহাদ (ইরফান সাজ্জাদ), সামির (খায়রুল বাসার), মেহরীন (কেয়া পায়েল), আর ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছিলেন পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ। মাঝেমধ্যে সূত্র ধরিয়ে দিয়েছেন মনজুরুল আলম

আড্ডার ফাঁকে এটা আমাদেরই গল্পর তিন অভিনয়শিল্পী খায়রুল বাসার, কেয়া পায়েল ও ইরফান সাজ্জাদ। ছবি: প্রথম আলো

ঢাকার তেজগাঁওয়ের একটি শুটিং বাড়ি। সেখানেই ‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের অভিনয়শিল্পী ইরফান সাজ্জাদ, খায়রুল বাসার ও কেয়া পায়েলকে একসঙ্গে পাওয়া গেল। অন্য একটি নাটকের শুটিংয়ে ব্যস্ত তাঁরা। মাঝেমধ্যেই তাঁদের ফাহাদ, সামির ও মেহরীন নামে ডাকছিলেন পরিচালক বাপ্পী খানসহ টিমের অন্যরা। সাজ্জাদ, বাসার ও পায়েল জানালেন, এখন বেশির ভাগ শুটিংয়ে কিংবা বাইরে গেলেই চরিত্রের নামে সবাই ডাকেন!

শুটিংয়ের ফাঁকেই জমে উঠল আড্ডা। শুরুতেই কেয়া পায়েলের কাছে জানতে চাই, প্রথম চরিত্রের নাম ধরে ডাকার সময়ে কী মনে হতো? ‘দুই–তিন পর্ব সবে প্রচার হয়েছে তখন। বন্ধুদের নিয়ে একদিন মার্কেটে শপিংয়ে গিয়েছি। সচরাচর লোকে আমাকে পায়েল বা কেয়া পায়েল নামে ডাকেন। কিন্তু হুট করে দেখি একজন বলছেন, “ওই যে মেহরীন।”আমি ঘুরে তাকাই। বন্ধুরা বলে, “আরে, তোকে ডাকে না।” কিন্তু আমি বলি, না, আমাকে ডাকছে, আমার নাটকের চরিত্রের নাম ধরে। মেহরীন বলে সবাই ঘিরে ধরলেন। আমি সব সময়ই চেয়েছি এভাবে চরিত্রের নাম ধরে কেউ ডাকুক। সেই চাওয়া এবার পূরণ হয়েছে।’

পাশ থেকে ইরফান সাজ্জাদ বলতে থাকেন, ‘দেশের বাইরে গিয়েছি, সেখানে দেখি প্রবাসী দর্শকেরা ফাহাদ নামে ডাকছেন। অতটা গুরুত্ব দিইনি। পরে দেশে এসেছি। মেডিসিন কিনতে যাব। পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে বের হয়েছি। একজন জিজ্ঞাসা করছেন, “গাড়ি কি নিজের টাকায় নাকি শ্বশুরের টাকায় কিনেছেন?” বাসায় রোগী। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। লোকটিকে একরকম ধমকই দিলাম, “এসব কী বলছেন!” আবার সে একই কথা। আবার আমার রাগ হয়ে গেছে। পরে বুঝতে পারছি, লোকটি আসলে আমার ফাহাদ চরিত্রের কথা বলছেন। বুঝতে পেরে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছি। বলেছি, ভাই আমার টাকায় গাড়ি কিনেছি।’

আড্ডার ফাঁকে এটা আমাদেরই গল্পর তিন অভিনয়শিল্পী খায়রুল বাসার, কেয়া পায়েল ও ইরফান সাজ্জাদ। ছবি: প্রথম আলো

শুরু থেকেই পরিবারের ছোট ছেলের চরিত্রটি খায়রুল বাসারের পছন্দ ছিল। কয়েক পর্ব প্রচারের পর কক্সবাজারে শুটিংয়ে ছিলেন এই অভিনেতা। এর মধ্যেই দর্শক তাঁকে ঘিরে ধরেন। সবাই বলতে থাকেন সামিরের সঙ্গে ছবি তুলব। টিমের সদস্যরা নাকি বিরক্ত হয়ে সরিয়ে দিচ্ছিলেন। বাসার নিজেও মনে করেছিলেন, অন্য কেউ ভেবে তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে এসেছেন। কারণ, এখানে সামির নামে কেউ নেই। বাসার বলেন, ‘আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। কারণ, এভাবে তো কখনোই ডাকা হয় না। কানেক্ট করার পরে ভালো লাগল। পরে রাস্তাঘাটে যেখানেই শুটিং করেছি, রিকশাচালক থেকে শুরু করে সবাই সামির নামে ঘিরে ধরতেন। বলতেন, “এটা আমাদের সামির ভাই।” শুটিংয়ে পুরো রাস্তায় জ্যাম লেগে যেত।’
পাশ থেকে কেয়া পায়েল বলেন, ‘যেখানেই যাই, জিজ্ঞেস করে মেহরীন আপু, সামির কেমন আছে।’

তাঁদের চোখে জনপ্রিয়তার কারণ
পরিবারের ছোট ছেলে হিসেবে নাকি দর্শকদের কাছে বেশি খাতির পান খায়রুল বাসার। ‘আমি যদি এখন নিচের ফ্ল্যাটে যাই, তাহলে বলবে সামির আসছে। খুব একটা আয়োজন থাকবে না। মনে করবে ঘরের ছেলে, এর মধ্যে মায়া থাকে। আসলে চরিত্র এতটা পপুলারিটি পাবে, ভাবিনি। গল্প ভালো লেগেছে বলেই নাম লেখানো। মনে হয়েছে, বহুদিন পরে মা–বাবা, ভাই–বোন, ফুফু সবার মধ্য দিয়ে দর্শক পরিবারের গল্পটি রিলেট করতে পেরেছেন। তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে এটা আমাদেরই পরিবারের গল্প।’
বাসারের কথা শেষে হতে না হতেই কেয়া শুরু করলেন, ‘আমি ও সামির এতটাই পপুলার যে, সবাই এখন মেহরীনের স্বামীর মতো জামাই চায়। আর এত মানুষ আমার প্রেমে পড়তেছে, আমি অবাক হয়ে যাই। তোমরা কিছু বলো না কেন?’
ইরফান সাজ্জাদ বলতে থাকেন, ‘আমাদের নাটকে সবকিছুই ছিল। এখানে ফ্যামিলি কালচার প্রাধান্য পেয়েছে। আমরা ঘরে যেটা প্র্যাকটিস করি, সেগুলো গল্পের মধ্যে উঠে এসেছে। পরিবারের মধ্যে ম্যানারিজম রয়েছে। একটি পরিবারের মা–বাবাকে নিয়ে যাঁরা থাকেন, তাঁদের কিন্তু ম্যানারিজমটা মেইনটেইন করা লাগে। সেটা অনেক দিন পরে পারিবারিক এ গল্পে এসেছে।’

‘সঙ্গে আরেকটি কথা যোগ করতে চাই’ উল্লেখ করে বাসার বলেন, ‘আমরা নাগরিক জীবনে এতই ব্যস্ত যে এক টেবিলে বসে পরিবারের সঙ্গে খেতে পারি না। হয়তো ঈদ ছাড়া খুব একটা হয় না। এগুলো গল্পে দর্শকদের নস্টালজিক করেছে। যেগুলো হয়তো আমাদের কালচার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ঘনিষ্ঠভাবে পরিবারের আবেগ থাকায় দর্শক পছন্দ করেছেন।’

‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের পোস্টার। নির্মাতার ফেসবুক থেকে

ওরা পায় ভালোবাসা, আর আমি গালাগাল
বেশির ভাগ দর্শক প্রশংসা করলেও নাটকের চরিত্র নিয়ে অনেক সময় বিরূপ অভিজ্ঞতার মধ্যেও পড়তে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে খায়রুল বাসার বলেন, ‘মাঝখানে ভাইরাল হয়েছিল পুরুষ কী চায়, নারী কিসে আটকায়। এই পুরো সময় শুনতে হয়েছে ফাহাদ কিসে আটকাবে, ফাহাদ কী চায়।’

শুনে হাসছিলেন পায়েল ও সাজ্জাদ। কেয়া পায়েল যোগ করলেন, ‘ফাহাদ নারী, টাকা নাকি সুখ, কী চায় এগুলো নিয়মিত শুনতে হয়েছে।’

হাসতে হাসতে সাজ্জাদ বলেন, ‘ফাহাদ চরিত্রটি কিন্তু তুলে ধরা আমার কাছে সহজ মনে হয়নি। তাঁর এত মুড সুইং হয় (হাসি)। মেহরীন, সায়েরার (সুনেরাহ্ বিনতে কামাল) প্রেমে, এর ওর প্রেমে পড়ছে। তার ভালোবাসাটা বেশি (হাসি)। তবে তার মধ্যে নৈতিকতা আছে। বিষয়টা এমন, ছেলেটা ৯৯ ভাগ ভালো, কিন্তু ১ পারসেন্ট একটু থাকে আরকি। যে কারণে আমি বাইরে বের হলেই গালাগাল সহ্য করেছি।’
পাশ থেকে বাসার যোগ করলেন, ‘বাপের বাসা বিক্রি করে দেওয়ার পরে গালির শেষ নেই।’ আমাকে পর্যন্ত শুনতে হয়েছে, ‘আপনার ভাই ফাহাদ খারাপ কেন। আপনি জানেন সে বাসা বিক্রি করে দিছে।’
হাসতে হাসতে আরেকটি অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করলেন সাজ্জাদ, ‘কয়েক দিন আগে রাস্তায় গাড়িতে বসে আছি। একজন কাছে এসে বললেন, “ভাই কাজটা আপনি ঠিক করলেন না, এটা কী করলেন।” শুরু করলেন গালাগাল। ওরা বাইরে গেলে ভালোবাসা পায়, আর আমি গালাগাল শুনি।’

পরিচালক মোস্তফা কামাল। ছবি: প্রথম আলো

কার কোন দৃশ্য পছন্দ
ক্যারিয়ারের সেরা অভিনীত দৃশ্যটি যেন পেয়ে গেছেন ইরফান সাজ্জাদ। তিনি মনে করেন, এই দৃশ্যকে হয়তো আর কখনোই ছাড়িয়ে যেতে পারবেন না। তিনি বলেন, ‘গল্পে আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমার যে রিঅ্যাকশন, এখন পর্যন্ত সেটা আমার সেরা দৃশ্য। কান্নার দৃশ্যটা তুমুল আলোচনায় এসেছিল। এই দৃশ্যে অটো কান্না চলে আসছিল। এ জন্য আমার বেশ প্রস্তুতি ছিল। রাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথাও হয়েছিল। পটভূমি আমাকে চরিত্রের মধ্যে নিয়ে যায়। ইমোশন এমনিতেই চলে আসে। কোনো গ্লিসারিন বা কিছু ব্যবহার করিনি।’

গল্পের শুরুতে বাসারকে দেখা গেছে ছন্নছাড়া। একটা দৃশ্য ছিল ‘আমি গান গাইতে গাইতে আসতেছি। বাবা (নাদের চৌধুরী) দেখে বলছেন, এই যে নচিকেতা আসছেন। আমার টো টো করে ঘুরে বেড়ানো ছেলেটা। দৃশ্যের আন্তরিকতাটা আমার ভালো লেগেছিল। আবার বিভিন্ন দৃশ্যে মায়ের (মনিরা মিঠু) শাসন খুবই মিষ্টি ছিল। আরেকটা ছিল, পায়েল একটা কিছু ভেঙে ফেলে। তখন মা কে ভেঙেছে জানতে চায়...’
‘এই দৃশ্য কিন্তু আমারও সবচেয়ে পছন্দের,’ বলেন কেয়া পায়েল। ‘দৃশ্যটি ছিল রোমান্টিক। আমার হাত থেকে পড়ে কিছু একটা ভেঙেছে। মা এসে বলেন, এটা কে ভাঙছে, কে ভাঙছে, চিল্লাতে থাকেন। তখন সামির পেছন থেকে এসে বলে, “এটা আমি ভাঙছি, আমি কিনে দিব।”’
সবশেষে বাসার জানান, সবাই খুশি থাকলে নাচতেন। সেই দৃশ্যগুলোও পছন্দ।

আরও পড়ুন

‘এই পরিবারকে আমি ভীষণ মিস করছি’
কিছুদিন শুটিং করছেন না তাতেই টিম ও নাটকটিকে ভীষণ মিস করছেন শিল্পীরা। ‘আমি কিন্তু সায়েরাকে মিস করছি,’ বলেন সাজ্জাদ। বাসার বলেন, ‘নাদের ভাই, মিঠু আপার সঙ্গে দেখা হয় না অনেক দিন। পায়েল, সাজ্জাদের সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলো। প্রায়ই শুটিংয়ের কথা মনে পড়ে। মনে হচ্ছে কী যেন নেই। এটাকে বাস্তবের একটি পরিবার মনে হতো। এই পরিবারকে আমি মিস করব। তাঁদের ভীষণ মিস করছি।’
বাসারের কথা শেষ না হতেই কেয়া পায়েল বলেন, ‘ক্যামেরার বাইরে অফ স্ক্রিনে অনেক সময় সহকর্মীর মধ্যেই কিছুটা হলেও দ্বন্দ্ব ও মনোমালিন্য থাকে। কিন্তু আমাদের কারও সঙ্গে কারও বিন্দুমাত্র দ্বন্দ্ব নেই। নাটকে যেটা দেখানো হয়েছে, সেটাই ছিল। এর বাইরে আমি কাজটি উপভোগ করেছি। এই পরিবেশ দিয়েছেন রাজ ভাই। আর শুটিংয়ের পরে বাইরে বের হলে সবাই জানতে চাইতেন, “এরপরে কী ঘটবে।” এটা মিস করব।’

‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাসার, ইরফান সাজ্জাদ, সুনেরাহ্ বিনতে কামাল ও কেয়া পায়েল
ছবি : নির্মাতার সৌজন্যে

বাসার যোগ করলেন, ‘টানা সাত দিন শুটিং করলেও কোনো ক্লান্তি ছিল না। মনটা এখনো শুটিংয়ে পড়ে থাকে।’
ইরফান সাজ্জাদ বলেন, ‘আমি খুবই মিস করব শুটিং। শেষ দিনে অনেকটা কেঁদেই ফেলেছিলাম।’

মন খারাপ করে বাসার জানালেন, অনেক সময় এমন খুদে বার্তা পেয়েছেন, যেখানে ভক্তরা লিখেছেন, নাটকের গান না শুনলে বাচ্চা খেতে চায় না, নতুন পর্ব না দেখলে খেতে চায় না। ‘অনেক বাচ্চা আমাদের দেখতে চেয়েছে। কয়েক দিন আগে একটা বাচ্চা বলছে, “তুমি সামির না? তোমার ওয়াইফের নাম কি মেহরীন? তোমার ভাইয়ের নাম ফাহাদ। আমাদের বাসায় আসো।” এই ভালোবাসা মিস করব।’

হোয়াটসঅ্যাপে আড্ডার ইতি টানলেন পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ, ‘দর্শকদের এই ভালোবাসা আমাকে ঋণী করেছে। মনে হচ্ছে, পরিবারকেন্দ্রিক গল্প আমাকে আরও নির্মাণ করতে হবে। কারণ, দিন শেষে মানুষ পরিবারের সঙ্গে থাকতে চায়, পরিবারকে দেখতে চায়। আমার সেসব গল্প দেখেও যেন দর্শক বলে ওঠেন, “এটা আমাদেরই গল্প।”’