বিশ্বমঞ্চে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সিনেমা

‘স্কারলেট ইকোস’–এর দৃশ্য। প্রযোজনা সংস্থার সৌজন্যে

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য এল নতুন সুখবর। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব ‘৫৬তম টেম্পেয়ার চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬’-এর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘স্কারলেট ইকোস’, যার বাংলা শিরোনাম ‘রক্তিম’। উৎসবের ৫৬তম আসরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে জমা পড়া মোট ৭ হাজার ১২৫টি চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে মাত্র ৬০টি চলচ্চিত্র অফিশিয়ালি নির্বাচিত হয়েছে। তরুণ নির্মাতা হেমন্ত সাদীকের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পটভূমিতে তৈরি। বিশ্বের ৪৪টি দেশের নির্বাচিত ৬০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘স্কারলেট ইকোস’।

অস্কার ও বাফটা কোয়ালিফাইং উৎসবে বাংলাদেশ
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এ চলচ্চিত্র উৎসবটি এফআইএপিএফ (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন) স্বীকৃত এবং একই সঙ্গে অস্কার, বাফটা ও ইউরোপিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস কোয়ালিফাইং ফেস্টিভ্যাল হিসেবে স্বীকৃত। এ ছাড়া এটি আইএসএফিসের সদস্য। বিশ্ব চলচ্চিত্রে টেম্পেয়ার এবং ফ্রান্সের ‘ক্লেরমন্ট ফেরাঁন্দ’—এ দুটি উৎসবই কেবল এই সব কটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অধিকারী। ফলে এই উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় স্থান পাওয়াকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ‘এলিট ক্লাব’-এ প্রবেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আরও পড়ুন

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান ও সিনেমার গল্প
‘স্কারলেট ইকোস’ একটি ডকু-ফিকশনধর্মী চলচ্চিত্র। এতে ২০২৪ সালের উত্তাল জুলাই আন্দোলনের বাস্তব ফুটেজের সঙ্গে ফিকশনাল দৃশ্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে। সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে আদনান নামের এক আলোকচিত্রীর জীবনকে কেন্দ্র করে, যিনি একজন একক বাবা (সিঙ্গেল ফাদার)। তাঁর ক্যামেরার লেন্সে দর্শক খুঁজে পাবেন আন্দোলনের সেই অস্থির দিনগুলোতে ঢাকা শহরের রূঢ় বাস্তবতা, অনিশ্চয়তা আর গণমানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে।

‘স্কারলেট ইকোস’–এর পোস্টার। প্রযোজনা সংস্থার সৌজন্যে

আলোকচিত্রী প্রিয়র স্মরণে
চলচ্চিত্রটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রয়াত আলোকচিত্রী তাহির জামান প্রিয়কে। আন্দোলনের সময় ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় গুলিতে নিহত হন তিনি। নির্মাতা হেমন্ত সাদীকের পূর্ববর্তী চলচ্চিত্র ‘আ লেটার টু গড’-এ দ্বিতীয় ইউনিট চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছিলেন প্রিয়। একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে রাজপথে প্রাণ হারানো এই সহকর্মীর স্মৃতির উদ্দেশে চলচ্চিত্রটি নিবেদন করেছেন পরিচালক।

পরিচালক হেমন্ত সাদীক তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘প্রিয়র মৃত্যুর খবরটি আমাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপরই সিদ্ধান্ত নিই একটা কিছু করার। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে দেশে, যেটার প্রায় শতভাগ ভিজ্যুয়াল উঠে আসছে টিভি নিউজের লেন্সে। একজন চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে সময়টাকে সিনেমার ভাষায় তুলে ধরা বা আর্কাইভ করা আমি দায়িত্ব মনে করেছি। নেমে পড়েছি রাজপথে, পকেটে থাকা স্মার্টফোনেই শুট করতে শুরু করেছি। অনেক দৃশ্য শুট করেছি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। কে ঠিক বা কে ভুল—সে বিচারে না গিয়ে নিরপেক্ষভাবে সময়ের সত্যটুকু তুলে ধরাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। দৃশ্যগতভাবে চলচ্চিত্রটি মূলত সাদাকালো রঙের, এর মধ্যে শুধু লাল রং ব্যবহার করেছি ত্যাগ, প্রতিরোধ ও আমাদের জাতীয় পতাকার প্রতীক হিসেবে।’

মুঠোফোনে দৃশ্যধারণ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা
চলচ্চিত্রটির প্রযোজক দিলরুবা হোসেন দোয়েল জানান, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ছাড়াই টিম মেম্বারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সিনেমার প্রায় ৮০ শতাংশ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে আন্দোলনের ভিড়ের ভেতর, একটিমাত্র মুঠোফোনে। এটির নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক কলাকুশলী সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছেন আর জীবনের ঝুঁকি তো ছিলই।

মার্চে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার
৪ থেকে ৮ মার্চ ফিনল্যান্ডের টেম্পেয়ার শহরে অনুষ্ঠিত হবে উৎসবটির ৫৬তম আসর। এর মূল প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ‘স্কারলেট ইকোস’–এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হবে উৎসবের অফিশিয়াল প্রেক্ষাগৃহে। উৎসব কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে চলচ্চিত্রের কলাকুশলীদের প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

নির্মাতা হেমন্ত সাদীক। প্রযোজনা সংস্থার সৌজন্যে