ঈদের ছুটির শেষ বিকেলে ‘মাসুদ রানা’ দেখে কি পয়সা উসুল হলো
পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির শেষ দিন। ঢাকার বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের ভিড়। আমরা আর পিছিয়ে থাকব কেন!
বাড়তি কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই শুধু বিনোদনের আশায় আমরা তিন সহকর্মী ঠিক করলাম, রোববার (৩১ মে) শেষ বিকেলে একটা সিনেমা দেখলে মন্দ হয় না।
কী সিনেমা দেখা যায়, তা নিয়ে শুরু হলো আলোচনা। পরে ঠিক হলো, এত আলোচনার দরকার নেই। বিনোদনের জন্য যখন যাচ্ছি, থ্রিলিং কোনো সিনেমাই দেখতে হবে। আমরা দেখব—‘মাসুদ রানা’।
বলে রাখা ভালো, সৈকত নাসির পরিচালিত সিনেমাটি ঈদুল আজহায় মুক্তি পেয়েছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার যৌথ প্রযোজনার এই সিনেমা নিয়ে খুব বেশি হইচই শুনিনি। বরং ‘রকস্টার’ বা ‘রইদ’ নিয়েই যত আলোচনা।
ফাঁকা রাস্তায় নির্বিবাদে আমরা চলে গেলাম সামরিক জাদুঘরের সিনেপ্লেক্সে। টিকিট কেটে পপকর্ন হাতে নিয়ে ঢুকে গেলাম হলে।
জাতীয় সংগীত শেষে আসনে বসে পপকর্ন মুখে দিতে না দিতেই শুরু হয়ে গেল শো। থ্রিলারধর্মী শব্দ, নাটকীয়তা। সেনা অভিযান। আমাদের চোখ আটকে যায় পর্দায়।
আমাদের সামনে হাজির হন এক তরুণ সেনা কর্মকর্তা—মাসুদ রানা (রাসেল রানা)। একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এক ভয়ংকর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। দেশের মারাত্মক ক্ষতি করাই এ নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য।
আসন্ন এই বিপর্যয় ঠেকাতে দেশপ্রেমিক, সাহসী সেনা কর্মকর্তা মাসুদ রানাকে বাছাই করা হয়। তাঁকে গুরুদায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে।
থাইল্যান্ডে দেখা গেল আরেক নাটকীয়তা। ইউরেনিয়ামের চোরাচালান চলছে। এই চালান নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব সোহানার (পূজা চেরী)।
অর্থ দিয়ে ইউরেনিয়াম বুঝে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় বাধার মুখে পড়েন সোহানা। তাঁর দিকে ‘চোখ’ পড়ে চোরাচালান চক্রের সদস্যদের।
এমন পরিস্থিতিতে ‘করণীয়’ সোহানার খুব ভালো করেই জানা। তাঁর তুমুল মারে চোরাচালান চক্রের সদস্যরা একদম সোজা। আমরা পরিচিত হই এক অ্যাকশন নায়িকা পূজা চেরীর সঙ্গে।
ইউরেনিয়ামের এই চালান শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে নিতে সক্ষম হন মাসুদ রানা। যদিও তা করতে গিয়ে তাঁকে রীতিমতো মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়েছিল।
মাসুদ রানা তাঁর এই সফল মিশন থেকে আরও ভয়ংকর সব তথ্য জানতে পারেন। পরে আরও জানতে পারেন, দেশে ইউরেনিয়ামের ডজনখানেক চালান এনে চালানো হবে বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড। এর লক্ষ্য দেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর। এগুলো উড়িয়ে দেওয়া হবে। ধ্বংস করে দেওয়া হবে দেশের অর্থনৈতিক শক্তি।
সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কটির কোনো অফিস নেই। ঠিকানা নেই। সব কাজ চলে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। যাকেই ধরা হয়, সে আর বলতে পারে না, এই নেটওয়ার্কের মূলে কে। খোঁজ চলে। মাসুদ রানা ছুটতে থাকেন।
মাসুদ রানারই এক সাবেক সহকর্মীর মাধ্যমে শেষে জানা যায়, এই নেটওয়ার্কের মূলে থাকা অন্যতম ব্যক্তি সোহানারই ভাই। তিনি ব্যবসায়ী। তবে অর্থের লোভে এই চক্রে জড়িয়ে দেশের বড় ক্ষতি করতে যাচ্ছেন। মিয়ানমারের এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের হয়ে যে তিনি কাজ করছেন, তা সোহানাও জানতেন না। বরং সোহানাকে তাঁর ভাই ব্ল্যাকমেল করে ব্যবহার করছিলেন।
সন্ত্রাসীদের হাত থেকে তিনটি সমুদ্রবন্দর রক্ষায় শুরু হয় অভিযান। এই অভিযানে মাসুদ রানার সাবেক সহকর্মীর পাশাপাশি সোহানাও যোগ দেন। দেশের স্বার্থ রক্ষার এই মিশনে সোহানার প্রতিপক্ষ তাঁর আপন ভাই। কী করবেন তিনি?
বিস্ফোরণের সময় ‘সেট’ করে স্পিডবোটে করে সটকে পড়েন মিয়ানমারের চক্রটির অন্যতম এক হোতা। তাঁর কাছে রিমোট কন্ট্রোল। তাই তাঁর পেছনে ছুটতে থাকেন মাসুদ রানা। তিনি কি পারবেন বিস্ফোরণ ঠেকিয়ে দিতে, বন্দর ধ্বংসের মতো বড় বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করতে?
ওদিকে বিস্ফোরণের সময় এগিয়ে আসতে থাকায় নাচতে শুরু করেন আরেক ভিলেন (গাজী রাকায়েত)। তাঁর সেই নাচের দৃশ্য যেন এক ‘পৈশাচিক উল্লাস’। শেষ পর্যন্ত এই উল্লাস থাকবে কি না, তা জানতে হলে যেতে হবে সিনেমা হলে।
ভরপুর মারপিটের পাশাপাশি এই সিনেমায় আছে উপভোগ করার মতো জমকালো নাচ–গান। সিনেমাটি বাংলাদেশি হলেও এতে আছে বিদেশি জনপ্রিয় স্পাই থ্রিলারের ভাইব।
আমরা তো বিনোদনের আশাতেই সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। সিনেমা দেখে ফিরতে ফিরতে নিজেরা বলাবলি করছিলাম, পয়সা কি উসুল হলো?
দাঁড়ান, দাঁড়ান। একটা কথা। আমরা ‘সুদক্ষ চলচ্চিত্র সমালোচক’ নই। সেটা যাঁদের কাজ, তাঁরা ব্যবচ্ছেদ করতে বসলে যেকোনো সিনেমারই বিস্তর দোষত্রুটি ধরে দিস্তা দিস্তা লিখে ফেলতে পারেন।
আমরা তো ঈদের ছুটিতে স্রেফ বিনোদনের আশায় গিয়েছিলাম। সিনেমাজুড়ে থ্রিলারধর্মী শব্দ (সাউন্ড), আচ্ছা মারপিটের পাশাপাশি নাচাগানা দেখে মাথাটা হালকা হালকা লাগল।
আর বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিদেশি স্পাই থ্রিলারের ভাইব কোনো দেশি সিনেমায় এই প্রথম ‘ফিল’ করতে পারার ব্যাপারটা ছিল অনেকটা ‘একটার সঙ্গে আরেকটা ফ্রি’ পাওয়ার মতো।
দর্শকভেদে অনুভূতি ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কী জানি, আপনার কেমন লাগবে। তবে আমাদের কাছে ঈদের ছুটির শেষ বিকেলের বিনোদনের হিসাবটা মিলে গেছে। কারণ, আমরা মজার মুড নিয়ে গেছি। আর মজাটা আদায় করে নিয়েছি।