রীনা খান ‘দজ্জাল শাশুড়ি’? ছেলের বউয়ের উত্তর…
‘বউ শাশুড়ির যুদ্ধ’, ‘দজ্জাল শাশুড়ি’, ‘বাংলার বউ’সহ অসংখ্য সিনেমা—যেখানে পর্দায় ছেলের বউয়ের জীবন দুর্বিষহ করার জন্য ছিলেন এক ভয়ংকর শাশুড়ি। খলচরিত্রে তাঁর সেই প্রতাপ, কণ্ঠের দৃঢ়তা, চোখের চাউনি আর রাগ–অভিমান মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য নাম—রীনা খান। আশি–নব্বইয়ের দশকে বাংলা সিনেমায় খলনায়িকা বলতে যাঁর মুখটাই প্রথম মনে পড়ত, তিনিই রীনা খান। এমনও সময় ছিল, একটু ‘কঠিন’ কোনো নারীকে দেখলেই কৌতুক করে বলা হতো—‘তুমি নাকি রীনা খান?’
মানুষের কাছে রীনা খান নামেই তিনি জনপ্রিয়। তবে তাঁর প্রকৃত নাম সেলিমা সুলতানা। ১৯৮২ সালে ‘সোহাগ মিলন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর একের পর এক সিনেমায় খলচরিত্রে অভিনয় করে হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘খলনায়িকার মহারানি’। ক্যারিয়ারের প্রায় চার দশকে তিনি অভিনয় করেছেন আট শতাধিক সিনেমায়। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই যেন ছিল শীতল আতঙ্ক, যা দেখে একসময় বাংলাদেশের লাখো দর্শক রীতিমতো বিস্মিত–আতঙ্কিত হয়েছেন।
খলচরিত্রই রীনা খানকে এনে দেয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠার সুযোগ। রুক্ষ গলা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, নিপীড়নের দৃশ্যগুলোয় তাঁর অভিনয় ছিল বিশ্বাসযোগ্যতার সীমানা ছাপানো। তবে কেবল নেতিবাচক চরিত্রেই নয়, ইতিবাচক চরিত্রেও ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। সেসব চরিত্রেও তিনি নজর কেড়েছিলেন দর্শকের।
কিন্তু সময় বদলেছে। একসময় বছরে ডজনখানেক সিনেমা করলেও এখন আর পর্দায় রীনা খানকে নিয়মিত দেখা যায় না। কিছুদিন আগে দেশ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপের সুরেই বলেছিলেন তিনি—‘এখন তো আগের মতো সিনেমা হয় না। লাভ না উঠলে, সিনেমা না চললে সিনেমা হবে কীভাবে?’ তাঁর মতে, এখনো যেহেতু শাকিব খানের সিনেমাই বেশি চলে, তাই সিনেমা নির্মাণেও সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা উচিত।
এর মধ্যেও থেমে যাননি রীনা খান। অভিনয়ের প্রতি টান থেকেই খুলেছেন নিজের ইউটিউব চ্যানেল। প্রায় এক বছর হলো চলছে সেই চ্যানেল। সেখানে নিয়মিত নাটক বানাচ্ছেন, অভিনয়ও করছেন নিজেই। দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক—অর্থাৎ পর্দা বদলালেও দর্শকের ভালোবাসা কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর প্রতি। তবে খলচরিত্র তাঁকে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি ব্যক্তিজীবনে এনেছে নানা ভুল ধারণা, কষ্টের মুহূর্তও। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে রীনা খান বলেন, ‘অনেকে আমাকে বলেছে, আমার ঘরে যদি ছেলে–বউ আসে, তাকে নাকি থাকতে দেব না। আমাকে বলেছে, আমি নাকি খারাপ মহিলা, খারাপ শাশুড়ি। এমনও শুনেছি—রিকশাওয়ালার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে, তবু রীনা খানের ছেলের সঙ্গে নয়!’
এমন কথা রীনা খান শুনেছেন নিজের ছোট ছেলের বিয়ের সময়ও। বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর দুই ছেলেই প্রেম করে বিয়ে করেছেন এবং তিনি কখনোই বাধা দেননি। তিনি বলেন, ‘ওরা শুধু আমাকে বলেছে ওরা পছন্দ করেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়েছি। বলেছি, তোমরাই তো সংসার করবে। তবে ভবিষ্যতে কিছু হলে আমাকে বলে লাভ নেই। কারণ, তোমরাই বেছে নিয়েছ।’ ছোট ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকেও তাঁকে নিয়ে ছিল ভুল ধারণা। তবে সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ। এখন সেই বউ–বাড়িই তাঁর ভক্ত। হাসিমুখে রীনা খান বলেন, ‘ওই বউকে আগে আমি সব করে দিতাম, এখন সে-ই আমাকে সবকিছু করে দেয়।’
পর্দার রীনা খান আর বাস্তবের সেলিমা সুলতানা যে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ—এ কথা জানাতে তাঁর পুত্রবধূও মুখ খোলেন এক সাক্ষাৎকারে। ক্যামেরার সামনে তিনি বলেন, ‘যদি বাস্তবেও পর্দার মতো হতেন, তাহলে এত দিন টিকে থাকা যেত না। অনেক আগেই সম্পর্ক ভেঙে যেত।’ বরং তিনি স্বীকার করেন, রীনা খানকে তিনি খুব ভালোবাসেন, যা বলতে তাঁর কোনো দ্বিধাই ছিল না।
বাংলা সিনেমার এক যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী খলনায়িকাদের একজন রীনা খান। পর্দায় তিনি ছিলেন নির্মম, দৃঢ়, তীক্ষ্ণ, ভয়ংকর। কিন্তু বাস্তবের জীবনে তিনি একজন মা, বন্ধু, আপনজন—যিনি ভালোবাসা দিতে জানেন, নিতে জানেন। চরিত্র তাঁকে তুমুল জনপ্রিয় করেছে, ভুল–বোঝাবুঝিও দিয়েছে কম নয়। তবু তিনি অভিনয়কে ভালোবেসেই এগিয়ে চলেছেন নিজের মতো করে। ওটিটির যুগে সময় বদলায়, পর্দা বদলায়, প্রেক্ষাগৃহ বদলায়—তবু একসময়ের সেই খলনায়িকার নামটি রয়ে যায় বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমার স্মৃতির অ্যালবামে—‘রীনা খান’ নামে।