অভিনয়ে সপ্তাহে পেতেন ৬০–৬৫ টাকা, স্ত্রীসহ থাকতেন উপোসও, একদিন হয়ে ওঠেন ঢালিউডের মহানায়ক

নায়করাজ রাজ্জাকছবি : প্রথম আলো

একসময় সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতেন। টেলিভিশনে অভিনয় করে সপ্তাহে পেতেন ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। মাসের খরচ ছিল প্রায় ৬০০ টাকা। সন্তানদের দুধ জোগাড় করতেই সামান্য আয় শেষ হয়ে যেত। কখনো স্ত্রীকে নিয়ে উপোসও করতে হয়েছে। টাকাপয়সার অভাবে ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টেলিভিশন কেন্দ্রে হেঁটে যেতেন। সেই মানুষটিই একদিন হয়ে উঠলেন ঢালিউডের মহানায়ক—নায়করাজ রাজ্জাক। শূন্য হাতে ঢাকায় এসে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসা সেই তরুণের জীবন যেন সত্যিই কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

উত্তরার রাজলক্ষ্মী বিপণিবিতানের সুবিশাল ভবনের দিকে তাকালে সবার আগে চোখে পড়ে নামফলক। নামফলকের নান্দনিক লোগোটিও সহজেই নজর কাড়ে। ল্যাম্পপোস্টের নিচে একজন মানুষ বসে আছেন, পাশে একটি ডাস্টবিন। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি দৃশ্য। কিন্তু এর ভেতর লুকিয়ে আছে নায়করাজ রাজ্জাকের জীবনসংগ্রামের এক অসাধারণ গল্প।

নায়করাজ রাজ্জাক।
ছবি : প্রথম আলো

ঢালিউডের মহানায়কের বড় সন্তান বাপ্পারাজ জানিয়েছেন তাঁদের প্রতিষ্ঠানের এই বিশেষ লোগোর গল্প। এটি প্রতীকী। ১৯৬৪ সালে শূন্য হাতে ঢাকায় এসে যে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসেছিলেন রাজ্জাক, সেই স্মৃতিকেই লোগোতে তুলে ধরা হয়েছে।
বাপ্পারাজ বলেন, ‘১৯৬৪ সালে শূন্য থেকে বাবা জীবন শুরু করেছিলেন। তখন আমার বয়স আট মাস মাত্র। নিজের মনে নেই প্রথম দিককার কথা। বাবার কাছে শুনেছি। ১৯৬৪ সালের আগে বাবা কখনো ঢাকায় আসেননি। কারও বাসায় উঠবেন, এমন পরিচিতজনও ছিলেন না। শূন্য হাতে ঢাকায় এসে আমাদের নিয়ে স্টেডিয়াম এলাকার একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসেছিলেন। এই ল্যাম্পপোস্টের নিচ থেকেই ঢাকায়, বাংলাদেশে বাবার নতুন জীবন শুরু। বিষয়টি প্রতীকী অর্থে বোঝানো হয়েছে লোগোটিতে।’

রাজ্জাক যখন রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের যাত্রা শুরু করেন, তখনই তৈরি হয় এই লোগো। বাপ্পারাজের মতে, ‘আব্বা যখন প্রথম রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের যাত্রা করেন, তখনই লোগোটা করা হয়। বাবার পরিকল্পনামতো এটার নকশা করেছিলেন সুভাষ দত্ত। আমাদের সব কটি প্রতিষ্ঠানে, সাইনবোর্ডে, প্যাডে এই লোগো ব্যবহার করা হয়েছে।’
কাগজে-কলমে জায়গাটির নাম রাজলক্ষ্মী না হলেও রাজ্জাকের তৈরি সেই বিপণিবিতানই ঢাকার উত্তরার এই জায়গাটিকে মানুষের কাছে ‘রাজলক্ষ্মী’ নামে পরিচিত করে তুলেছে। আর সেই নামের সঙ্গে মিশে আছে এক মানুষের শূন্য থেকে উঠে আসার গল্প।

নায়করাজ রাজ্জাক
ছবি : প্রথম আলো

চেয়েছিলেন খেলোয়াড় হতে

রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে। বেড়ে ওঠাও সেখানে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল খেলোয়াড় হওয়ার। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক মঞ্চনাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য তাঁকে বেছে নেন স্কুলের স্পোর্টস শিক্ষক। সেখান থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। মেজ ভাইয়ের কাছ থেকেও অভিনয়জগতে আসার ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছিলেন তিনি।

এসএসসি পাস করার পর অভিনয় শুরু করেন রাজ্জাক। ধীরে ধীরে টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কলকাতায় অভিনয় করতে গিয়ে দেখা হয় উত্তমকুমারের সঙ্গে। তপন সিনহা ও পরিচালক পীযূষ বোসের সান্নিধ্যেও আসেন। পীযূষ বোসের পরামর্শেই পরে ঢাকায় আসেন রাজ্জাক। তবে নায়ক হওয়ার স্বপ্ন তখনো তাঁর ভেতরে প্রবল।

নায়করাজ রাজ্জাক
ছবি : প্রথম আলো

কলেজে পড়ার সময় চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ আসে ১৯৫৮ সালে। অজিত ব্যানার্জির ‘রতন লাল বাঙালি’ ছবিতে ‘পকেটমার’-এর ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি, ছবির মূল চরিত্রে ছিলেন আশিস কুমার ও সন্ধ্যা রায়। এরপর ‘শিলালিপি’ ছবিতে একটি গানের দৃশ্যে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অংশ নেন। সম্মানী পান ২০ টাকা। সেই সামান্য টাকাই তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে টালিগঞ্জে টুকটাক অভিনয় করে তিনি বুঝেছিলেন, সেখানে হয়তো ‘এক্সট্রা’ হয়েই থাকতে হবে।

তাই নায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৫৯ সালে মুম্বাইয়ে যান। ভর্তি হন অভিনয়শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফিল্মালয়ে। সেখানে দিলীপ কুমার, শশধর মুখার্জির মতো ব্যক্তিত্বরা ক্লাস নিতেন। কিন্তু চঞ্চলতা ও অস্থিরতার কারণে এক বছরের কোর্সের তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত শিক্ষায় ধৈর্য ধরে থাকতে পারেননি। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতেও জায়গা করে নেওয়া হয়ে ওঠেনি। ব্যবসা, চাকরি—কোনো কিছুতেই থিতু হতে পারেননি। কারণ, তাঁর স্বপ্ন একটাই—নায়ক হবেন।

স্ত্রী খায়রুন্নেসা লক্ষীর সঙ্গে নায়করাজ রাজ্জাক।
ছবি : সংগৃহীত।

জীবনে এলেন ‘লক্ষ্মী’

১৯৬২ সালের কোনো একদিন কলকাতার বাঁশদ্রোণী এলাকায় খায়রুন্নেসার সঙ্গে দেখা হয় আবদুর রাজ্জাকের। বাড়ির সামনের রাস্তায় প্রথম দেখা। প্রথম দেখাতেই তাঁকে ভালো লেগে যায়। পরে নাকতলার বাড়িতে গিয়ে ভাবিকে নিজের ভালো লাগার কথা জানান। পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয় তাঁদের। তখন মাত্র ২০ বছরের যুবক রাজ্জাক। বছর না ঘুরতেই জন্ম হয় তাঁদের প্রথম সন্তান বাপ্পার। ১৯৬৪ সালে যখন রাজ্জাক স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় আসেন, তখন বাপ্পার বয়স মাত্র আট মাস।

রাজ্জাকের জীবনে খায়রুন্নেসা পরে ‘লক্ষ্মী’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। অভিনয়ের টানে স্বামী কলকাতা-মুম্বাই ঘুরেছেন, কিন্তু সংসারের কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন খায়রুন্নেসাই। ঢাকায় এসে থিতু হওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ ছিল বড়। প্রথম আলোর এই প্রতিবেদককে খায়রুন্নেসা বলেন, ‘ঢাকায় আমার এক খালা ও মামা থাকতেন। খালার বাড়িতে এক সপ্তাহ ছিলাম। এরপর আমরা কমলাপুরে বাসা নিই। এখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তবে ও (রাজ্জাক) কয়েকবার বলেছে, চলে যাবে। আমি বলেছি, থাকি না এখানে। আমার তো এখানে ভালো লেগে গেছে। তারপর আমাকে রেখে কলকাতায় গেল। আমাদের জমি ছিল, বিক্রি করে চলে আসে।’

সপরিবারে রাজ্জাক
ছবি : রাজ্জাকের পরিবারের সৌজন্যে

কলকাতার জায়গাজমি বিক্রি করেই স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন রাজ্জাক। অভিনয়ের টানেই স্ত্রী খায়রুন্নেসা ও শিশুপুত্র বাপ্পারাজকে নিয়ে ১৯৬৪ সালে ঢাকায় আসেন তিনি।

ল্যাম্পপোস্টের নিচ থেকে নতুন জীবন

১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকায় পৌঁছান রাজ্জাক। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে প্রথমে ওঠেন কমলাপুরের একটি বাসায়। মাসিক ভাড়া ছিল ৮০ টাকা। ঢাকায় তাঁর পরিচিতজন তেমন কেউ ছিলেন না। একসময় পরিবার নিয়ে স্টেডিয়াম এলাকার একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচেও বসতে হয়েছে তাঁকে। সেই ল্যাম্পপোস্টই পরে তাঁর জীবনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঢাকায় রাজ্জাকের ঠিকানা বদলেছে একাধিকবার। কমলাপুর থেকে দিলু রোড, সেখান থেকে ফার্মগেট। এরপর গুলশান-২ নম্বর রোডের লক্ষ্মীকুঞ্জে থিতু হন। প্রায় ৯ বছর ধরে বদলেছে বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তির ঠিকানা। কিন্তু যে শহরে একদিন আশ্রয়ের নিশ্চয়তা ছিল না, সেই ঢাকাতেই পরে গড়ে ওঠে তাঁর নিজের সাম্রাজ্য।

নায়করাজ রাজ্জাক
ছবি : সংগৃহীত

সপ্তাহে আয় ৬০-৬৫ টাকা, মাসে খরচ ৬০০

ঢাকায় এসে টেলিভিশনে অভিনয় করে জীবিকা নির্বাহ করতেন রাজ্জাক। একটা সময় স্ত্রী লক্ষ্মী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ফার্মগেট এলাকায় থাকতেন। অভিনয় করে সপ্তাহে পেতেন ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অথচ মাসের সংসার খরচ ছিল প্রায় ৬০০ টাকা।

বেঁচে থাকতে ২০১৬ সালে একবার রাজ্জাক তাঁর জীবনের গল্পটা শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘সবার ভালোবাসা পেয়ে আজ আমি পরিপূর্ণ। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনেক সময় অর্ধাহারে দিন কেটেছে আমার। সপ্তাহে ৬৫ টাকা পেতাম টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান করে, সেই ৬৫ টাকা দিয়ে আমার সংসার চলেছে। একটা সময় পর আমি “বেহুলা”র নায়ক হলাম। ৫০০ টাকা সাইনিং মানি নিয়ে খুশিতে বাড়ি এলাম। তার পরের কাহিনিটা অনেকেই জানেন।’

কথা প্রসঙ্গে সেদিন রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘অল্প আয়ে সংসারের খরচ চলে না। বাচ্চাদের দুধ জোগাড় করতেই সব টাকা ব্যয় হয়ে যেত। ওই সময় স্বামী-স্ত্রী দুজন মাঝেমধ্যে উপোসও করতাম। টাকাপয়সার অভাবে ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টিভি কেন্দ্রে হেঁটে যাতায়াত করতাম।’

ববিতার সঙ্গে অসংখ্য হিট রোমান্টিক সিনেমা উপহার দিয়েছেন নায়করাজ রাজ্জাক। মজার বিষয় হলো, এ নায়িকার বাবা ও মামা চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা

ছোট চরিত্র থেকে ‘বেহুলা’র নায়ক

ঢাকার চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের প্রথম অভিনয় ১৯৬৫ সালের ‘আখেরি স্টেশন’ ছবিতে। সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এরপর একে একে ছোট ছোট চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। ‘কার বউ’ ছবিতে অটোরিকশাচালক বা বেবিট্যাক্সি ড্রাইভার, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ পাড়ার ছেলে মিন্টু, ‘ডাকবাবু’তে আদালতের কর্মচারী, ‘কাগজের নৌকা’য় বাইজিবাড়ির মাতাল—এমন নানা চরিত্র করেছেন।

অভিনয়জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন সিনেমার পর্দার আড়ালের মানুষ। তবে এক্সট্রা কিংবা ছোট চরিত্র তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। একসময় পরিচয় হয় জহির রায়হানের সঙ্গে। ‘বেহুলা’ ছবিতে রাজ্জাককে নায়ক করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

নায়করাজ রাজ্জাক (২৩ জানুয়ারি ১৯৪২—২১ আগস্ট ২০১৭)
ছবি: সংগৃহীত

সাইনিং মানি হিসেবে রাজ্জাক পেলেন ৫০০ টাকা নগদ। সেই টাকার কিছু অংশ সংসারের কাজে খরচ করলেন। বাকি টাকা বন্ধুবান্ধবকে মিষ্টি খাইয়ে আনন্দে শেষ করে ফেললেন। মুক্তির পর ‘বেহুলা’ দারুণ ব্যবসা করল। পূর্ব পাকিস্তানের দর্শক গ্রহণ করে নিল নতুন নায়ক রাজ্জাককে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক্সট্রা থেকে নায়ক—এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন তিনি।

নায়ক থেকে নায়করাজ

‘বেহুলা’র পর রাজ্জাক একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় করতে থাকেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘নায়করাজ’ উপাধি। নিজের জীবনের এই বাঁকবদল নিয়ে রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘একটা সময় পর আমি “বেহুলা”র নায়ক হলাম। ৫০০ টাকা সাইনিং মানি নিয়ে খুশিতে বাড়ি এলাম। তার পরের কাহিনিটা অনেকেই জানেন।’ কিন্তু রাজ্জাক নিজের সাফল্যকে কখনো একার অর্জন মনে করতেন না।

২০১৬ সালে নিজের জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেছিলেন রাজ্জাক। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সেদিন বলেছিলেন, ‘আজ আমি এই যে নায়করাজ, এটা আমার একার পক্ষে সম্ভব হয়নি।...আমার যাঁরা শ্রদ্ধেয় পরিচালক ছিলেন, তাঁরা আমাকে এবং তিনজন নায়িকা নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সেই যুদ্ধে আমি একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করেছি তাঁদের সঙ্গে।’ সেদিন কথা প্রসঙ্গে আরও বলেছিলেন, ‘শুধু রোববার দিন বাড়ি যেতাম আমি, অন্য দিনগুলোয় মেকআপ রুমের ফ্লোরে শুয়ে থাকতাম।’ তাঁর কথা শুনে সেদিন মিলনায়তনে উপস্থিত অনেকের চোখেও পানি চলে এসেছিল।

নায়করাজ রাজ্জাক ও চিত্রনায়িকা কবরী।
ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীকুঞ্জের সেই সব আড্ডা

রাজ্জাক মহাতারকা হয়ে উঠলেও তাঁর স্ত্রী খায়রুন্নেসা ছিলেন অনেকটাই আড়ালে। স্বামীর সাফল্যে পাশে থেকে সংসার সামলেছেন, জুগিয়েছেন অনুপ্রেরণা। রাজ্জাকের জীবনে তিনি যেন সত্যিই লক্ষ্মী হয়ে এসেছিলেন। তাই স্ত্রীর নামেই গুলশান-২ নম্বরে নিজের বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’। একসময় লক্ষ্মীকুঞ্জ ছিল তারকাদের আনাগোনায় মুখর। সমসাময়িক ও অনুজ শিল্পীদের আপন করে ভালোবাসায় আগলে রাখতেন রাজ্জাক। আড্ডা, গল্প আর হইহুল্লোড়ে জমজমাট থাকত বাড়িটি। সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়েও তাঁর সময় কাটত।

বাপ্পারাজের সন্তানদের জন্মের সময় রাজ্জাক ছিলেন ব্যস্ত অভিনেতা। পরে সম্রাটের বড় সন্তান আরিশা যখন জন্ম নেয়, তখন অভিনয় থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন তিনি। অভিনয় কমিয়ে দেওয়ায় নাতনির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেতেন বেশি। আরিশার ছোট বোন আরিবাও দাদার সঙ্গে খেলাধুলা করত। দুই নাতনি পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখত। এখন সেই হইহুল্লোড় নেই। দাদাকে হারিয়ে তারাও যেন বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। একসময় হাসি-আনন্দে মুখর লক্ষ্মীকুঞ্জ এখন অনেকটাই নিষ্প্রাণ।

একই রয়ে গেছে রাজ্জাকের ঘর

রাজ্জাকের মৃত্যুর পরও লক্ষ্মীকুঞ্জে তাঁর শোবার ঘরটি সাজানো আছে আগের মতোই। যেভাবে তিনি পছন্দ করতেন, সেভাবেই রাখা হয়েছে সবকিছু। ঘরে রয়ে গেছে তাঁর কাপড়চোপড়, পারফিউম। এমনকি বাথরুমে তাঁর গোসলের সাবানটিও আছে—যেভাবে তিনি রেখে গিয়েছিলেন, সেভাবেই। হাসপাতালে যাওয়ার সময় মানুষটি আর জানতেন না, হয়তো আর ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জিনিসগুলো যেন এখনো অপেক্ষা করে আছে।

দুই সন্তান সম্রাট ও বাপ্পারাজকে নিয়ে নায়করাজ রাজ্জাক।
ছবি : সংগৃহীত

যে চেয়ারে আর বসেন না রাজ্জাক

২০১৭ সালের ২১ আগস্ট রাজ্জাকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল চলচ্চিত্র অঙ্গন। তাঁর চলে যাওয়ার পর লক্ষ্মীকুঞ্জের সেই ব্যস্ততাও থেমে যায়। বাড়ির ব্যালকনিতে একটি চেয়ারে বসতেন রাজ্জাক। নাতি ও পরিবারের প্রিয় কুকুরটির সঙ্গে খেলতেন। এখন সেই চেয়ার খালি। রাজ্জাকের স্ত্রী খায়রুন্নেসাও স্বামীর চলে যাওয়ার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তবে সন্তান, নাতি-নাতনিরা মিলে তাঁকে প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করেন। মায়ের একাকিত্ব ঘোচাতে ছেলেরাও আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

বাবাকে হারানোর পর চিত্রনায়ক ছেলে সম্রাটের কাছে মনে হয়, রাজ্জাক যেন কোথাও যাননি। তিনি বলেন, ‘বাবাকে ছাড়া এই কয় বছর কীভাবে পার হয়ে গেল, ভাবতেই কেমন যেন লাগে। মনে হয়, আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে যাননি। তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। সব সময় আমরা এটাই অনুভব করি।’

বাবার ফোনের অপেক্ষা আর নেই

বাড়ি থেকে বের হওয়া কিংবা ঘরে ফেরার সময় বাবা রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলে যাওয়ার অভ্যাস ছিল চিত্রনায়ক দুই ভাই বাপ্পারাজ ও সম্রাটের। রাজ্জাক চলে যাওয়ার পর সেই অভ্যাসই সবচেয়ে বেশি মিস করেন তাঁরা। লক্ষ্মীকুঞ্জে একসঙ্গে সকালের নাশতা ও রাতের খাবার খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখনো সবাই একসঙ্গে বসেন, গল্প করেন, আড্ডা দেন। কিন্তু হঠাৎ বাবার চেয়ারটিতে চোখ পড়লেই শূন্যতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সম্রাট বলেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে খাচ্ছি, গল্প করছি, আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ আব্বার চেয়ারটায় চোখ পড়লে খুব কষ্ট হয়।’

যশোরের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমানঘাঁটির একটি পুকুরে মাছ ধরার এক মুহূর্তে ‘নায়করাজ’ রাজ্জাক
ছবি: রাজ্জাকের ছেলে সম্রাটের ফেসবুক থেকে নেওয়া।

বেলা দুইটা বাজলেই সন্তানকে ফোন করে খবর নিতেন রাজ্জাক। সম্রাটের স্মৃতিতে সেই ফোনের কথাগুলো এখনো স্পষ্ট, ‘বাবা বলতেন, “এই তুই কই? অফিসে? আসবি কখন? আমি বসে আছি, একসঙ্গে খাব।”’ রাত ১০টা বাজলে শুটিংয়ে থাকা ছেলেকে ফোন করতেন, ‘কী রে, রাত ১০টা বাজে, শুটিং এখনো প্যাকআপ হয়নি। খাবি না? আমি কি খেয়ে নেব? ১১টা বাজবে? আমি ওয়েট করছি, আয় একসঙ্গে খাব।’ সম্রাট বলতেন, ‘আপনার ওষুধ আছে, আপনি খেয়ে নিন।’

এখন সেই ফোন আর আসে না। সম্রাট বলেন, ‘বাবার টাইম টু টাইম ফোন করে খবর নেওয়া, বিভিন্ন কাজে পরামর্শ দেওয়াটা খুব মিস করি। তিনি ছাড়া একেবারে শূন্য মনে হয়।’

নায়করাজ রাজ্জাক
ছবি : প্রথম আলো

লক্ষ্মীকুঞ্জে আজ শুধুই স্মৃতি

রাজ্জাককে হারানোর এই দিনে গুলশান-২-এর লক্ষ্মীকুঞ্জে রাজ্জাক পরিবার আয়োজন করেছে মিলাদ মাহফিল, এতিমদের খাওয়ানোসহ নানা কর্মসূচি। মেজ ছেলে বাপ্পী এখন কানাডায়। তিনি ছাড়া বাপ্পারাজ, সম্রাটসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা মায়ের সঙ্গে লক্ষ্মীকুঞ্জে আছেন। সম্রাট জানান, সকালে ফজরের নামাজের পর বাবার জন্য মিলাদ পড়ানো হয়েছে। এরপর আশপাশের কয়েকটি এতিমখানার শিশুদের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা মিলে কোরআন খতম করবেন।

বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ৩৬৬৯/১ নম্বর ঠিকানায় এখন চিরনিদ্রায় আছেন রাজ্জাক। আর কোনো দিন ‘নীল আকাশের নিচে’ হাঁটবেন না তিনি। কোনো অভিমানী গান গাইতেও দেখা যাবে না তাঁকে। তবু উত্তরার রাজলক্ষ্মীর লোগোতে আজও সেই মানুষটি বসে আছেন ল্যাম্পপোস্টের নিচে। আর লক্ষ্মীকুঞ্জের একটি চেয়ারে যেন তাঁর অনুপস্থিতি প্রতিদিন পরিবারের সবার চোখে পড়ে।