শিশুশিল্পী টুনটুনিও পেল পূর্ণ সদস্যপদ! ববিতা বললেন, ‘সমিতির সদস্যপদ দয়া বা উপহার নয়’
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির (বাচশিস) নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ৪০ জনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর এমন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আগামী ৩ জুলাই শিল্পী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগেই সভাপতি মিশা সওদাগর ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আরমান স্বাক্ষরিত নতুন সদস্যদের তালিকা ঘিরে প্রশ্ন তুলছেন চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি অংশ।
শিল্পী সমিতির গঠনতন্ত্রের ৫ (ক) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, পূর্ণ সদস্য হতে হলে একজন শিল্পীকে কমপক্ষে পাঁচটি মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অবিতর্কিত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীকে পেশাগতভাবে চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পী হতে হবে। কার্যকরী পরিষদ আবেদন অনুমোদন করলে তিনি পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করবেন এবং ভোটাধিকারসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হবেন।
কিন্তু এবারের নতুন সদস্যদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনেকেই এই শর্ত পূরণ করেননি। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তুসমি তায়েফ টুনটুনিকে নিয়ে। অভিনয়শিল্পী ডি এ তায়েবের মেয়ে টুনটুনি এখনো শিশুশিল্পী হিসেবেই পরিচিত। তার মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র মাত্র দুটি—‘সোনাবন্ধু’ ও ‘আমার মা’। মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘কিশোরী’ ও ‘দোলন আমার দোলন’। গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত পাঁচটি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের শর্ত পূরণ করতে না পারলেও সে পূর্ণ সদস্যপদ পেয়েছে। এ বিষয়ে ডি এ তায়েব বলেন, ‘একটা সিনেমায় অভিনয় করেও শুধু টুনটুনি নয়, আরও অনেকেই সদস্য হয়েছে। এমন প্রমাণ আমার কাছে আছে। তবে আমার মেয়েকে সদস্য করাতে চাইনি।’
একইভাবে পূর্ণ সদস্যপদ পেয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস সানজানা। অথচ তাঁর অভিনীত কোনো চলচ্চিত্র এখনো মুক্তি পায়নি। কয়েকটি ছবিতে কাজ করছেন বলে জানা গেলেও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। চিত্রনায়িকা রোমানা নীড়ও নতুন সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন। তাঁর অভিনীত ‘ভালোবাসলে দোষ কী’ এবং ‘উতলা মন’ মুক্তি পেয়েছে। ‘আড়ং’ ও ‘ভালোবাসি কত বুঝাব কেমনে’ ছবির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পাঁচটি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শর্ত পূরণ করেননি। নীড় শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী জয় চৌধুরীর স্ত্রী।
চিত্রনায়িকা সুস্মি রহমান ২০১৮ সালে ‘আসমানী’ চলচ্চিত্র দিয়ে বড় পর্দায় আসেন। পরে মুক্তি পায় ‘দায়মুক্তি’ ও ‘ময়নার চর’। বর্তমানে তাঁর নতুন কোনো চলচ্চিত্রের শুটিং বা মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ছবির তথ্য পাওয়া যায়নি। তবু তিনি পূর্ণ সদস্য হয়েছেন। রুবিনা আলমগীরের একই অবস্থা, তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা হাতে গোনা। ‘আমার শেষ কথা’ মুক্তি পেয়েছে গত বছর। আরও কয়েকটি ছবি মুক্তির অপেক্ষায় থাকলেও গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত পাঁচটি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মোহাম্মদ বাবুল ওরফে মুন্না খানের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারও খুব বেশি দিনের নয়। দুই বছর আগে ঢালিউডে অভিষেক হওয়া মুন্না খানের মুক্তিপ্রাপ্ত কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ডার্ক ওয়ার্ল্ড’, ওয়েব ফিল্ম ‘দ্য পাওয়ার অব লাভ’ এবং সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘তছনছ’। আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণাধীন। কিন্তু গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে ‘মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র’ পাঁচটির কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে মনির হোসেন ওরফে যুবরাজ অভিনীত ‘হৃদয়ে ৭১’, ‘হৃদয় জুড়ে’ ও ‘আব্বাস’ মুক্তি পেয়েছে। তাঁর আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তির অপেক্ষায় থাকলেও মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা এখনো পাঁচ–এ পৌঁছায়নি। এর বাইরে আরও কয়েকজনের পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার ব্যাপারেও নিয়ম না মানার অভিযোগ রয়েছে।
শুধু এবার নয়, গত কয়েক বছরে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অনেককে সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিল্পী সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাঁদের মতে, ‘যাঁরা বছরের পর বছর অভিনয় করে দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে একই কাতারে এমন ব্যক্তিদের পূর্ণ সদস্য করা হচ্ছে, যাঁরা গঠনতন্ত্রের মৌলিক শর্তই পূরণ করেননি। এতে প্রকৃত শিল্পীরা বিব্রত হন।’
এ বিষয়ে গত বুধবার সন্ধ্যায় কথা হয় চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির বর্তমান সভাপতি মিশা সওদাগরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কার্যকরী পরিষেদের সিদ্ধান্ত, এখন তো সে অর্থে আগের মতো ছবি তৈরি হচ্ছে না। তাই কমপক্ষে দুইটা কিংবা তিনটা ছবি হলেও পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার বিবেচনা করা হয়েছে। কার্যকরী পরিষদ যা বলবে, তা–ই, সেটাকে কোনো চ্যালেঞ্জ করা যায় না। তবে দুটি কিংবা তিনটি ছবিতে অভিনয় করে সদস্যপদ পেয়েছে, এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়, এর আগে এ ধরনের অনিয়ম অনেক ঘটেছে। আমাদের কার্যকরী পরিষদের সভায় এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাই আমাদের কার্যকরী পরিষদ সবার সিদ্ধান্তে মৌখিকভাবে শর্ত শিথিল করে এসব পূর্ণ সদস্যপদ দিয়েছে।’ তাহলে সংগঠনের গঠনতন্ত্রে বদল আনতে পারলেন না—এমন প্রশ্নে মিশা বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে প্রস্তাব করেছিও।’
কথা হয় চলচ্চিত্রের জ্যেষ্ঠ শিল্পী ববিতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শিল্পী সমিতির সদস্যপদ কোনো দয়া বা উপহার নয়, মন চাইল দিয়ে দিলাম। কিংবা সদস্য বাড়াতে হবে বলে নিয়ম না মেনেই সদস্যপদ দিলাম! গঠনতন্ত্রে যে শর্তের কথা বলা আছে, তা সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য থাকা উচিত। নিয়মের বাইরে গিয়ে সদস্যপদ দেওয়াতে সমিতির মর্যাদা যেমন নষ্ট হয়, তেমনি প্রকৃত শিল্পীরাও বিব্রত হন। তাই সদস্যপদ প্রদানে স্বচ্ছতা ও গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা উচিত।’
এদিকে নির্বাচনের ঠিক আগে একসঙ্গে ৪০ জনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার ঘটনাকে কেবল সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই। তাঁদের মতে, পূর্ণ সদস্যপদ মানেই ভোটাধিকার। ফলে নতুন ভোটার যুক্ত করার মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যাঁদের সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাঁদের অন্তর্ভুক্তিকে অনেকেই ভোটের হিসাব-নিকাশের অংশ হিসেবে দেখছেন। তাই এই সদস্যপদ প্রদানে শিল্পী সমিতির নির্বাচনের ভোটের সমীকরণ বদলে দেওয়ার অভিযোগও জোরালো হচ্ছে।