৫০ পেরোলেই কেন হারিয়ে যাওয়া

ঢাকাই সিনেমা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল, আমিন খানের মতো অভিনেতারা। কোলাজ

ঢাকাই সিনেমায় শিল্পী–সংকট পুরোনো সমস্যা। তবে দিন দিন এ সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। অথচ জনপ্রিয় অনেক তারকা সুযোগ ও মূল্যায়নের অভাবে ঢালিউড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ তারকাদের মধ্যে রয়েছেন সোহেল রানা, আলমগীর, উজ্জ্বল, ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল, ওমর সানী, আমিন খান, বাপ্পারাজ, অমিত হাসান, রিয়াজ, শাকিল খানসহ আরও অনেকে। তাঁরা একসময় একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন। এখন সেই ব্যস্ততা আর নেই। অভিনয়ে দক্ষ এই তারকারা ইন্ডাস্ট্রির কাছে দিন দিন যেন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছেন। এর পেছনে কারণ কী?

আরও পড়ুন

ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তারকারা বয়স ৫০ পেরোনোর পরও প্রধান চরিত্রে দাপিয়ে অভিনয় করেন। এসব তারকার সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করেন দর্শকেরা। তাঁদের সিনেমা আয়ের রেকর্ড গড়ে। বয়স তাঁদের জন্য কোনো বাধা নয়। ভারতীয় তারকাদের মধ্যে বলা যায় অমিতাভ বচ্চন, কমল হাসান, মামুত্তি, রজনীকান্ত, সানি দেওল, আমির খান, শাহরুখ খান, সালমান, প্রসেনজিৎসহ অনেকের কথা।

চিত্রনায়ক আলমগীর। ছবি: প্রথম আলো

হলিউডের সিলভেস্টার স্ট্যালন, ডোয়াইন জনসন, ভিন ডিজেল, টম হ্যাংকস, টম ক্রুজ, জনি ডেপসহ অনেক তারকা দাপটের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। কোরীয় তারকাদের মধ্যে আছেন সং কাং-হো, চোই মিন-সিকসহ একাধিক তারকা। কিন্তু ঢালিউডের তারকাদের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো।

‘ভণ্ড’, ‘বিশ্ব প্রেমিক’, ‘লড়াকু’সহ অনেক ব্যবসাসফল সিনেমার নায়ক রুবেল। তিনি নায়ক বা প্রধান চরিত্রের বাইরে অভিনয় করতে চান না। যে কারণে তাঁর কাজের সংখ্যা কম। তিনি জানান, তাঁকে প্রায় সময় বড় ভাই, বাবা ও চাচার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি হিরো ইমেজ ভেঙে প্রধান চরিত্র ছাড়া অভিনয় করবেন না।

চিত্রনায়ক রুবেল
ছবি : সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘ভারতের প্রযোজক–পরিচালকেরা অনেক কিছু চিন্তা করেন। আমাদের এখানে কেউ তো শিল্পীদের নিয়ে চিন্তা করে না। এখানে ফিল্মের প্রতি ভালোবাসার অভাব প্রকট। যে কারণে তাঁদের রজনীকান্তকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার লোক আছে। সেখানে আমাদের জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে তৈরি হওয়া তারকাদের ঝরে পড়া বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ট্র্যাজেডি।’

নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় নায়ক আমিন খান। অভিমান নিয়ে এখন আর অভিনয় করেন না। বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। চাকরির সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে তাঁর যাওয়ার সুযোগ হয়। কয়েক মাস আগে পার্বত্য অঞ্চলে গিয়েছিলেন। দুর্গম এলাকায় গিয়ে দেখেন, অনেক ভক্ত তাঁকে দেখতে এসেছেন। এক ভক্ত তাঁকে একনজর দেখার জন্য অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসেছেন। এই তারকা বলেন, ‘যেখানে যাই সেখানেই ভক্তরা ভালোবাসার কথা জানান। কিন্তু যে সিনেমার জন্য এই ভালোবাসা, সেই সিনেমা থেকে আজ দূরে; এটাই কষ্ট। আমরা কি এতটাই অযোগ্য? রক্তে মিশে আছে অভিনয়। কিন্তু আমাদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই। নির্দিষ্ট একটা বয়স পার হলে আমাদের এখানে বেকার হতে হবে, এটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।’

আমিন খান
ছবি: ফেসবুক

কেন্দ্রীয় চরিত্রে কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ অভিনেতার কথা কখনো কি ভেবেছেন ঢাকার কোনো পরিচালক? কেন্দ্রীয় চরিত্রে বেশির ভাগ সময় দেখা যায় তরুণ মুখ। এ প্রসঙ্গে পরিচালক মতিন রহমান বলেন, ‘গল্প যাঁরা রচনা করেন বা নির্বাচন করেন, তাঁদের চরিত্রকে টার্গেট করে গল্প রচনা করতে হবে। তখন বয়স ফ্যাক্ট হবে না। তা না হয়ে দু–চারজন স্টারকে নিয়ে আমাদের গল্প ঘুরছে। বঞ্চিত হচ্ছেন অভিজ্ঞরা। এখানে শিল্পীর কোনো দোষ নেই। তাঁদের নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢালিউডের এক প্রযোজক ও পরিচালক বলেন, ‘ভারতের কোনো প্রযোজক সরাসরি শাহরুখ খানের কোনো সিনেমায় ইনভেস্ট করেন না। তারকারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে নানা রকম গল্প লেখান। পরিচালক নির্বাচন করে কখনো সহপ্রযোজক নেন। এ কৌশলে তাঁরা নায়ক হিসেবে টিকে থাকেন। আমির, সালমান, শাহরুখ খানসহ সবার নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা আছে। কিন্তু এ দেশের কোনো তারকা কি আছেন, যিনি নিজেই নিজেকে নিয়ে ভেবেছেন? সে রকম একজন পরিচালক, গল্প খুঁজেছেন? সে উৎসাহ কারও মধ্যে নেই।’

জ্যেষ্ঠ পরিচালক কাজী হায়াৎ মনে করেন, দেশের জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের কাজ না পাওয়ার অন্যতম কারণ বাজেট স্বল্পতা। তিনিও একসময় আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, ববিতাকে ভেবে গল্প লিখেছিলেন। কিন্তু সেগুলো পড়ে আছে। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিনেমা যা হচ্ছে, বাজেট এত কম যে বড়দের কাছে যেতেও পারছেন না কেউ। একজন পরিচালক তো সিনেমা বানালেন ২০ লাখ টাকায়। তিনি কীভাবে বড় শিল্পীদের কাছে যাবেন? তাঁরা তো যেনতেন করে সিনেমা গুলিয়ে ফেলেন। সিনিয়র শিল্পীরা তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে চাইবেন কেন?’