‘ক্যাকটাস’–এর শুটার থেকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর ফয়সাল, এই তরুণ অভিনেতাকে কতটা চেনেন

ঈদে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সিনেমা-সিরিজ দেখে থাকলে আরেফিন জিলানীর কাজও দেখেছেন নিশ্চয়। নামটা অচেনা লাগছে? তাহলে বরং চরিত্রের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক। এই জিলানীই ‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর বোকাসোকা তরুণ, ‘চক্র ২’-এর সাংবাদিক! সময়ের আলোচিত এই তরুণ অভিনেতার চরিত্র হয়ে ওঠার গল্প জানাচ্ছেন লতিফুল হক

আরেফিন জিলানীই ‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর বোকাসোকা তরুণ, ‘চক্র ২’-এর সাংবাদিককোলাজ

গায়ে মোটা জ্যাকেট, পায়ে ভারী বুট, মাথা কালো টুপিতে ঢাকা, মুখে ক্রূর হাসি। কথা কম কিন্তু শীতল চাহনিই ভয় ধরানোর জন্য যথেষ্ট। স্নাইপার রাইফেল হাতে সমুদ্র থেকে পাহাড়ে ছুটে বেড়ায়। কান খোলা, সজাগ চোখে নিশানা নির্ভুল করার চেষ্টা।

ঈদে চরকিতে মুক্তি পাওয়া শিহাব শাহীনের সিরিজ ‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার চরিত্রে এভাবেই ভয় পাইয়ে দিয়েছেন আরেফিন জিলানী। দেশের সিনেমা-সিরিজে গুপ্তঘাতকের চরিত্র সেভাবে দেখা যায়নি।

কিন্তু আগের কোনো রেফারেন্স ছাড়াই অনেকখানি নিজের চেষ্টায় চরিত্রটিতে উতরে গেছেন এই তরুণ অভিনেতা। সেই সূত্রে এক দুপুরে ফোন করতেই খুলে বসলেন কথার ঝাঁপি, উঠে এল চরিত্র থেকে চরিত্রে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

আরেফিন জিলানী
খালেদ সরকার

চাকরি নাকি অভিনয়

স্কুল-কলেজ থেকেই সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জিলানী। কণ্ঠ ভালো তাই আবৃত্তি, নাটক, বই পড়া—সবকিছুতেই নাম দিতেন শিক্ষকেরা। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় জানতে পারেন, একটি এফএম রেডিওতে আরজে নেওয়া হবে। এভাবে সিটি এফএমে যুক্ত হন, এরপর যান রেডিও দিনরাতে।

সময়টা ২০১৫-১৬। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ে আগ্রহ ছিল। রেডিওতে কাজ করতে অভিনয়ের টানটা আরও ভেতর থেকে টের পান। দেরি না করে প্র্যাচ্যনাট অ্যাক্টিং স্কুলের ৩৩তম ব্যাচে ভর্তি হয়ে গেলেন।

‘ওখানে ভয়েস অ্যাক্টিংসহ অভিনয়ের বিভিন্ন প্রক্রিয়া শিখতে শিখতে মনে হয়, আমাকে অভিনয়টাই করতে হবে,’ বলছিলেন জিলানী।

২০১৯ সালে, গোলাম সোহরাব দোদুলের ‘সাপলুডু’ সিনেমায় সুযোগ এল। মাত্র তিন-চার মিনিটের উপস্থিতি। একটি দৃশ্যে ছবির নায়ক আরিফিন শুভর বিকল্প হিসেবে একজনকে দরকার। উচ্চতা, কাঠামো—সব জিলানীর সঙ্গে মিলে যায়। ছবিতে ওপর থেকে পানিতে লাফ দেওয়ার একটা স্টান্টও নিজেই করেছিলেন জিলানী। কিন্তু এমন ‘সাহসী’ শুরুর পরই আসে নতুন চ্যালেঞ্জ।

কোভিডকাল। কাজ নেই, কোনো চাকরিতেও যোগ দেননি। বাড়ির বড় ছেলে জিলানী। কেউ চাপ না দিলেও তিনি বোঝেন, মা-বাবা ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা অনেক। তাই ২০২১ সালে একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি নিলেন।

টুকটাক অভিনয়ের সুযোগ মিললে অফিস থেকে দু-এক দিনের ছুটি ম্যানেজ করেন। কিন্তু একবার বড় কাজ এল, ১২ দিন ছুটি লাগবে। অফিস কি আর তা মানে! বাসায় ফিরে স্ত্রীকে বললেন সব ঘটনা। অভিনয়ের প্রতি জিলানীর আগ্রহ আর মনমতো কাজ করতে না পারায় যে বিষণ্নতায় ভুগছিলেন, সেটা ভালোই জানতেন স্ত্রী। তাই বললেন, চাকরি ছাড়ো। তবে মা আপত্তি করলেন। কিন্তু জিলানী ঠিক করলেন, নিজের স্বপ্নের পথে ছুটবেন। চাকরি ছাড়লেন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের ২৯ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

তত দিনে ওজন বেড়ে হয়েছে ১১৮ কেজি। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকায় জিমে ভর্তি হলেন, শুরু হলো নিজেকে তৈরি করা। ‘আমি আসলে এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। আমার পরিবারের কেউ অভিনয়ে নেই, মিডিয়ায়ও পরিচিত কেউ নেই। আগে নিজেকে ফিট করেছি, সঠিক ডায়েট করেছি। ইন্টারনেট ঘেঁটে, বই পড়ে নিজেকে চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি করেছি। চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই ওজন ১১৮ থেকে ৮৯-এ নিয়ে এসেছিলাম,’ বলছিলেন জিলানী।

আরেফিন জিলানী
খালেদ সরকার

বাঁকবদলের গল্প

গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আরেফিন জিলানীর প্রথম বড় কাজ ‘শিউলিমালা’। অভিনেতা মনে করেন, দীপ্ত টিভির এই ধারাবাহিকে কাজ করতে করতে অনেক কিছু শিখেছেন।

জিলানীর ভাষ্যে, ‘অনেকে সিরিয়ালকে ছোট করে দেখেন। কিন্তু সিরিয়াল হচ্ছে সব মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে কষ্টের মাধ্যম। দিনে আপনার ১৪ থেকে ১৬টি দৃশ্য করতে হয়। আমি তো ২০টাও করেছি। ভুল করার সুযোগ নেই, নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাজ করতে হয়। এটা করতে গিয়েই আমার মনে হয়েছে, সঠিক পথে আছি।’

তরুণ এই অভিনেতা অবশ্য পরিচিতি পান গত বছর মুক্তি পাওয়া তানিম নূরের উৎসব সিনেমা দিয়ে। ছবিতে মোবারক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। জিলানী মনে করেন, বাণিজ্যিকভাবে সাফল্য পাওয়া এ সিনেমাই তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দিয়েছে।

স্নাইপার চরিত্রটার বিষয়ে জানতে চাইলাম। দেশে আগে এ ধরনের চরিত্র হয়নি, নিজেকে কীভাবে তৈরি করলেন? ‘বই পড়ে আর সিনেমা দেখে,’ দুই কথায় উত্তর দিলেন তরুণ অভিনেতা।

জানালেন, অভিনয়ে তিনি স্তানিস্লাভস্কির সিস্টেম (রুশ নাট্যব্যক্তিত্ব কনস্তান্তিন স্তানিস্লাভস্কির অভিনয়পদ্ধতি, যা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাস্তববাদী অভিনয়ের ভিত্তি স্থাপন করে) অনুসরণ করেন। এ ছাড়া নির্মাতার পরামর্শ নিয়েছেন, কয়েক দফায় চিত্রনাট্য পড়েছেন, প্রচুর ইন্টারনেট ঘেঁটেছেন।

‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার চরিত্রে জিলানী
ফেসবুক থেকে

ছোটবেলায় ‘সংঘর্ষ’ সিনেমায় আশুতোষ রানার অভিনয় তাঁকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, ‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার হতে সিনেমাটা আবার দেখেছেন। আশুতোষ রানা ছাড়াও ‘মার্ডার ২’ সিনেমার খলনায়ক প্রশান্ত নারায়ণনও প্রভাবিত করেছেন।

নেটফ্লিক্সে কয়েকটি সিনেমা দেখছেন। সব মিলিয়ে নিজের কল্পনার স্নাইপারকে দাঁড় করিয়েছেন। ‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার থেকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর ফয়সাল সম্পূর্ণ বিপরীত।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর ফয়সাল সম্পূর্ণ বিপরীত
ফেসবুক থেকে

বোকাসোকা চরিত্রটি হয়ে উঠতে সিনেমার চিত্রনাট্যের পাশাপাশি পড়েছেন মূল উপন্যাস কিছুক্ষণ। হুমায়ূন আহমেদের জগতে ঢুকতে তাঁর নাটকগুলোও দেখেছেন। চরিত্রটির জন্য তাঁর বিশেষ প্রেরণা প্রয়াত অভিনেতা আবদুল কাদের। ‘আমার কাছে মনে হয়েছিল, ফয়সালের সঙ্গে আবদুল কাদের স্যারের অভিনীত চরিত্রগুলোর একটু মিল আছে। সিরিয়াস মুহূর্তে পর্দায় উনি এমন সব কাণ্ডকীর্তি করতেন, পরিবেশটাই বদলে যেত,’ বলছিলেন জিলানী।

‘চক্র ২’-এ সাংবাদিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরেফিন জিলানী
ফেসবুক থেকে

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আর ‘চক্র ২’-এর শুটিং প্রায় একই সময়ে হয়েছে। তাই বোকাসোকা ফয়সাল থেকে সিরিয়াস সাংবাদিক রাহাত হওয়া সহজ ছিল না। এ সময় অভিনয় নিয়ে অনলাইনে কোর্সও করেন ভারতীয় অভিনেতা ও অ্যাক্টিং কোচ সৌরভ সচদেবের কাছে। জিলানীর ভাষ্যে, ‘আমি নিজের চরিত্র, তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের সঙ্গে প্রচুর কথা বলেছি। বলেছি, একদিন বোকা চরিত্র থেকে বেরিয়ে পরদিন কীভাবে সিরিয়াস চরিত্রে ঢুকব? তাঁরা অনেক পরামর্শ দিয়েছেন, কিছু ব্যায়াম, কিছু নিয়ম মানার কথা বলেছেন। এর মধ্যে একটা ছিল মজার—লম্বা সময় ধরে গোসল। মনকে বোঝানো, একটা চরিত্রকে আমি শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলছি।’

সামনে কী

অভিনয়ের জন্য চাকরি ছেড়েছিলেন, সাম্প্রতিক সাফল্যে জিলানী যে খুশি, বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘ফেল করতে পারতাম, সামনেও হয়তো করতে পারি, কিন্তু এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ,’ বললেন তিনি। পবিত্র ঈদুল আজহায় তাঁর নতুন সিরিজ ‘কালো বিড়াল’ আসবে, আরও কাজের কথা চলছে। আলাপের শেষে স্ত্রী সংগীতশিল্পী ফাতিমা তুয যাহরা ঐশীকে ধন্যবাদ দিতে ভুললেন না। চাকরি ছেড়ে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটা হোক আর নতুন কাজের প্রেরণা—সব সময়ই পাশে পেয়েছেন সঙ্গীকে।