সিনেমা বেশি, হল কম
অনেক হিসাব–নিকাশ, জল্পনা–কল্পনা আর শেষ মুহূর্তের অনিশ্চয়তার পর অবশেষে কোরবানির ঈদে মুক্তি পাচ্ছে আটটি সিনেমা। শাকিব খানের ‘রকস্টার থেকে শুরু করে নাজিফা তুষি ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের রইদ, আলোচিত ‘মাসুদ রানা, আরিফিন শুভ–বিদ্যা সিনহা মিমের ‘মালিক’, ববি হকের ‘তছনছ’, ডি এ তায়েব–মাহির ‘অফিসার’, আদর আজাদ–বুবলীর ‘পিনিক’ এবং খায়রুল বাসার, আর মাসুমা রহমান নাবিলার ‘বনলতা সেন’—বৈচিত্র্যময় এই সিনেমাগুলো আজ বৃহস্পতিবার দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক–পরিবেশক সমিতির অফিস সচিব সৌমেন রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদে আটটি সিনেমার মুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।’
বহু বছর ধরেই ঈদ দেশের চলচ্চিত্র ব্যবসার সবচেয়ে বড় মৌসুম। সারা বছর ব্যবসায় মন্দা থাকলেও ঈদ এলেই চাঙা হয়ে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ। তবে এবার আলোচনার কেন্দ্রে শুধু উৎসব নয়, বরং সিনেমার সংখ্যা। কারণ, দেশে নিয়মিত চালু প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা যেখানে ৬০ থেকে ৭০টির বেশি নয়, সেখানে একসঙ্গে ৮টি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। ফলে হল, শো ও দর্শক ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘তীব্র প্রতিযোগিতা’। অনেকের মতে, দর্শকের চাহিদার চেয়ে প্রযোজকদের ঈদকেন্দ্রিক ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাই এবার বেশি চোখে পড়ছে।
ঈদের আগে আরও কয়েকটি সিনেমার নাম আলোচনায় ছিল। ‘নাকফুলের কাব্য’ ও ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ নিয়েও জোর আলোচনা চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি পিছিয়ে গেছে, আরেকটি মুক্তির তালিকায় জায়গা পায়নি। এ কারণে শেষ পর্যন্ত আটটি সিনেমার ‘লড়াই’ দেখতে হবে দর্শকদের। তবে চলচ্চিত্র–বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, দেশের বর্তমান হলসংখ্যা ও বাজার বাস্তবতায় একসঙ্গে এত সিনেমা মুক্তি পাওয়া অযৌক্তিক। তাঁদের মতে, এ প্রতিযোগিতায় কিছু সিনেমা শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়বে। এমনকি কয়েকটি সিনেমার ক্ষেত্রে ব্যবসার চেয়ে ‘ঈদে মুক্তি পেয়েছে’—এ পরিচয়ই যেন বড় হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, পর্যাপ্ত হল ও শো না পেয়ে অনেক সিনেমাই হয়তো দর্শকের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছাতেই পারবে না। ফলে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি নির্মাতাদের মধ্যে চাপা দুশ্চিন্তাও কাজ করছে।
ঈদ সামনে রেখে কয়েক দিন ধরেই সরগরম এফডিসি থেকে শুরু করে পুরো দেশের সিনেমাপাড়া। শেষ মুহূর্তের প্রচারণা, পোস্টার লাগানো, ট্রেলার প্রকাশ, অগ্রিম টিকিট বিক্রি আর হল বুকিং নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রযোজক–পরিবেশকেরা। তবে প্রচারণা এখন আর শুধু গুলিস্তান, কাকরাইল কিংবা মগবাজারের পোস্টার–ব্যানারেই সীমাবদ্ধ নেই; সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে প্রচারের ধরনও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই এখন সবচেয়ে বড় প্রচারণাযুদ্ধ। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে সিনেমাগুলোর গান, সংলাপ, টিজার ও তারকাদের ভিডিও ছড়িয়ে দিতে নানা কৌশল নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এবার প্রচারণায় দেখা গেছে অভিনবত্বও। ‘রইদ’–এর নির্মাতা ও শিল্পীদের দেখা গেছে সিনেমার স্মারক হিসেবে ব্যাগসহ নানা উপহার দর্শকদের হাতে তুলে দিতে। অন্য সিনেমাগুলোর তারকারাও নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন হল ভিজিট, গণমাধ্যম সাক্ষাৎকার ও লাইভ অনুষ্ঠানে। কোথাও কোথাও আবার সিনেমার গানের সঙ্গে নাচ কিংবা দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি আড্ডার আয়োজনও করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহগুলোতেও এখন পুরোদমে চলছে ঈদের প্রস্তুতি। গতকাল রাজধানীর বেশ কয়েকটি সিনেমা হল ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও চলছে ধোয়ামোছা, কোথাও নতুন করে রং করা হচ্ছে দেয়াল, আবার কোথাও বসানো হচ্ছে আলোকসজ্জা, ব্যানার ও বিশালাকৃতির কাটআউট। অনেক হলেই সংস্কার করা হয়েছে আসন ও সাউন্ড সিস্টেম। হলের মালিকেরা বলছেন, ঈদে দর্শকের বাড়তি চাপ সামলাতে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, জেলা শহরের বন্ধ কিংবা অনিয়মিতভাবে চালু থাকা সিনেমা হলও আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ঈদকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে এত সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় হল–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেও ফিরেছে বাড়তি আশা। তাঁদের প্রত্যাশা, ঈদের ছুটিতে পরিবার–পরিজন নিয়ে আবারও প্রেক্ষাগৃহমুখী হবেন দর্শকেরা; আর সেই ভিড়েই হয়তো মিলবে দেশের সিনেমাবাজারে নতুন প্রাণের ইঙ্গিত। অন্তত দুটি ছবি সুপারহিট হলেও হল–বাণিজ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন মনে করেন, বড় রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবারের ঈদে ব্যবসা জমবে। তবে সংখ্যায় বেশি সিনেমা মুক্তি দেওয়া বিষয়টি প্রযোজকদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তিনি মনে করেন, ভালো বাণিজ্যিক সিনেমাগুলো যদি সারা বছর ভাগ হয়ে মুক্তি পেত, তাহলে হল ব্যবসাও নিয়মিত হতো, টিকে থাকত। তিনি জানান, এবার এবার সমিতির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে সব কটি সিনেমা ভাগ করে চালানো হচ্ছে। সর্বোচ্চসংখ্যক হলে চলবে শাকিব খানের রকস্টার।
এ বিষয়ে চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্ট অনেকেই একমত, এবারের ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে ধরা হচ্ছে শাকিব খানের রকস্টারকে। আজমান রুশো পরিচালিত সিনেমাটিতে শাকিবকে দেখা যাবে এক রকস্টারের চরিত্রে। তাঁর ভিন্ন লুক, মিউজিক্যাল আবহ ও সাবিলা নূরের সঙ্গে জুটি ইতিমধ্যে দর্শকের কৌতূহল বাড়িয়েছে। যদিও ছবির গানগুলো প্রত্যাশামতো আলোচনায় আসেনি, তবু হলের মালিকদের ধারণা, ঈদের বাজারে সবচেয়ে বেশি শো পেতে পারে এই সিনেমাই। অন্যদিকে মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের বড় আগ্রহ মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ ঘিরে। হাওয়ার পর দীর্ঘ বিরতি ভেঙে আসা এই সিনেমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা পেয়েছে। নাজিফা তুষি, মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, গাজী রাকায়েত অভিনীত সিনেমাটির ট্রেলার ও গান ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচিত।
শেষ মুহূর্তে আলোচনায় উঠে এসেছে ‘মাসুদ রানা’। কাজী আনোয়ার হোসনের জনপ্রিয় গুপ্তচর চরিত্র নিয়ে নির্মিত এই সিনেমায় নবাগত রাসেল রানাকে দেখা যাবে নাম ভূমিকায়। সঙ্গে আছেন পূজা চেরী। ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিম প্রায় সাত বছর পর একসঙ্গে ফিরছেন ‘মালিক’ সিনেমায়। সাইফ চন্দন পরিচালিত অ্যাকশনধর্মী এ ছবিতে ক্ষমতা, প্রতিশোধ ও আবেগের গল্প উঠে এসেছে। ঈদের বড় বাজেটের সিনেমাগুলোর মধ্যে এটিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন হলের মালিকেরা।
বিগত কয়েক বছর দফায় দফায় পিছিয়ে অবশেষে মুক্তি পাচ্ছে ‘বনলতা সেন’।
জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত এ সিনেমা পরিচালনা করেছেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। এতে জীবনানন্দের চরিত্রে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাসার আর বনলতা সেন চরিত্রে আছেন মাসুমা রহমান নাবিলা। ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই ছবিটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। খুব বেশি আলোচনায় না থাকলেও বাণিজ্যিক ধারার দর্শকদের টার্গেট করে ‘অফিসার ও ‘তছনছ’ মুক্তি পাবে। ‘অফিসার’–এ অভিনয় করেছেন ডি এ তায়েব, মাহিয়া মাহি ও মিশা সওদাগর। অন্যদিকে তছনছ–এ জুটি বেঁধেছেন মুন্না খান ও ববি হক। এ ছাড়া ঈদে মুক্তি পাচ্ছে আদর আজাদ ও শবনম বুবলীর ‘পিনিক’। জাহিদ জুয়েল পরিচালিত এই অ্যাকশন–থ্রিলার সিনেমার আইটেম গান ইতিমধ্যে দর্শকের নজর কেড়েছে।
চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে—এখনকার সংকট শুধু সিনেমার সংখ্যায় নয়, মুক্তির কাঠামোতেও। মাল্টিপ্লেক্সগুলো বড় তারকা ও বড় বাজেটের সিনেমাকে বেশি শো দেওয়ায় মাঝারি বাজেটের ছবিগুলো তুলনামূলক কম হল পাচ্ছে। এ কারণে ঈদের এই প্রতিযোগিতায় শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন অনেক নির্মাতা। তাই প্রযোজক, পরিবেশক ও হলের মালিকদের সমন্বয়ে স্থায়ী রিলিজ নীতির দাবিও উঠছে নতুন করে। তবে আপাতত সব হিসাব–নিকাশের বাইরে গিয়ে আজ থেকে দর্শকের সামনে থাকছে নানা স্বাদের সিনেমা। এখন দেখার অপেক্ষা, শেষ পর্যন্ত কোন সিনেমা দর্শকের সবচেয়ে বেশি সমর্থন পায় আর কোনটি ঈদের বাজারে প্রকৃত বিজয়ী হয়ে ওঠে।