দুইবার আত্মহত্যা থেকে ফিরে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
মানসিক চাপে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর মাথায় ঘুরতে থাকে আত্মহত্যার চিন্তা। এর মাঝেই হঠাৎ একটা সিনেমায় কাজের সুযোগ পান। সেই সিনেমাই তাঁকে জীবনের পথে ফিরিয়ে আনে। বলছি তরুণ অভিনেতা ও চিত্রগ্রাহক নাঈম তুষারের কথা। আর সিনেমাটির নাম ‘অতল’। যুবরাজ শামীম পরিচালিত সিনেমাটি ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়।
‘অতল’–এর প্রধান অভিনেতা নাঈম। বললেন, ‘হঠাৎ করে সিনেমাটির শুটিংয়ে যুক্ত না হলে হয়তো জীবনটা ভিন্ন দিকে প্রভাবিত হয়ে যেত। আমাকে সুইসাইড থেকে বাঁচিয়েছিল “অতল”, আমাকে জীবনের নতুন অর্থ দিয়েছে।’ এই অভিনেতার কাছে জানতে চাই কেন আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন? ‘পারিবারিক কিছু কারণ, আমার ব্যক্তিগত ঘটনা, অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়েই মানসিক চাপ থেকে জীবনের প্রতি মায়া একসময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সবকিছু অর্থহীন মনে হয়েছিল।’
নাঈমের কাছে সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গল্পটা শুনতে চাই। ২০২২ সালের কথা। করোনায় অনেকের মতো এলোমেলো হয়ে যায় নাঈমের জীবন। সেই সময়ে পরিচালক যুবরাজ শামীমের সঙ্গে দেখা। নাঈমের কথায়, ‘শামীম ভাইও তখন ডিপ্রেশনে ছিলেন। তাঁর বাবা মারা গেছেন। আরও কিছু সমস্যা ছিল। দুজনের জন্যই সময়টা মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তখন শামীম ভাই প্রস্তাব দেন আমাদের দুজনের যে অনুভূতি, সেটা সিনেমার মধ্যে তুলে ধরবেন।’
শামীমের একটি স্কুটি ছিল। সেটা নিয়েই গাজীপুরের প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে ছুটে যান দুজন। যেখানেই লোকেশন পছন্দ হয়, সেখানেই চলে শুটিং। তাঁর কথায়, ‘খারাপ সময়কে জয় করতে ফ্রেম বেছে নিই। সেই সময়ের অনুভূতির প্রকাশ ঘটে ফ্রেমে। একসময় গল্পের মধ্যে ঢুকে যাই। সময়ের সঙ্গে সৃজনশীল এই কাজে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যাই। ধীরে ধীরে একসময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি। অনুভূতি এটাই, শিল্পমাধ্যম যেকোনো কিছু থেকেই মুক্তি দিতে পারে। সিনেমাটি দ্বিতীয়বার আমার জীবন বাঁচাল।’
তবে আত্মহত্যা করার চিন্তা এবারই প্রথম নয়। ২০০০ সালের দিকে হঠাৎ মাদকে জড়িয়ে পড়েন নাঈম। টানা ছয় বছর চলে এই মাদকাসক্ত জীবন। বেঁচে থাকার কোনো কারণ তখনো পাননি। তারপরও তিনি ঘুরে দাঁড়ান। একসময় মাদকাসক্ত মানুষের জন্য কাজ করতে থাকেন। আস্তে আস্তে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
পড়াশোনায় মনোযোগ দেন।ব্যস্ত থাকতে নাঈম একসময় পেশা হিসেবে ফটোগ্রাফিকে বেছে নেন। পাশাপাশি গড়ে তোলেন মাদকাসক্তদের জন্য নিরাময় কেন্দ্র। তাঁর সেই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘আমার হোম’। ‘মাদকাসক্তি থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পরে মনে হচ্ছিল দ্বিতীয় জীবন ফিরে পেয়েছি, আমিও তো মাদকাসক্তদের দ্বিতীয় জীবন উপহার দিতে পারি। শুরু করে দিই কাজ।
কাউন্সেলিংসহ নানাভাবে সহায়তা করি। একসময় মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোটা আমাকে আনন্দ দিতে থাকে। এখনো সেটা নিয়েই আছি।’‘দুবার আত্মহত্যা করতে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেন, এসব থেকে জীবন নিয়ে অভিজ্ঞতা কী হলো?’ এমন প্রশ্নে নাঈম বলেন, ‘অভিজ্ঞতা হলো জীবনে চ্যালেঞ্জ আসবে। ঘুরে দাঁড়ানোটাই সারকথা। প্রতিবারই আত্মহত্যার মুখ থেকে ফিরে মনে হয়েছে, জীবন একটাই, আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এখন আমার কাছে মনে হয়, জীবনটা একটা স্পিরিচুয়াল জার্নি। এটা মানুষকে কখন কীভাবে কোথায় নিয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না। কারও জন্য কিছু করাটাই বেঁচে থাকার নাম। আমার আগের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
’সবশেষে নাঈম জানালেন, অভিনয় তাঁকে জীবন দিলেও অভিনয় তাঁকে টানে না। ক্যামেরা নিয়েই থাকতে চান। চিত্রগ্রহণের কাজ তাঁর ভালো লাগে। এখন ‘এক ঋতুর অনন্তকাল’ নামে একটি সিনেমা নিয়ে কাজ করছেন। এটিও পরিচালনা করছেন যুবরাজ শামীম।