এফডিসি থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে সিনেমার শুটিং

ঝিমিয়ে পড়েছে এফডিসি
ফাইল ছবি

ঝরনা স্পট, ক্যানটিন চত্বর, গার্ডেন, মান্না ডিজিটাল কমপ্লেক্স চত্বর কিংবা কড়ইতলা—এফডিসির কোথায় না হতো শুটিং। সব ফ্লোরে চলত আলো-আঁধারির খেলা। এমনও দিন গেছে, পাঁচ-ছয়টি ছবির শুটিং একসঙ্গে চলেছে। শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক আর কলাকুশলীতে গমগম করত এফডিসি। প্রিয় তারকার শুটিং দেখতে আসা উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে মূল ফটকে নিরাপত্তাকর্মীরা হিমশিম খেতেন। সেসব এখন অতীত। ঝিমিয়ে পড়েছে এফডিসি।
কিন্তু কেন? চলচ্চিত্রের লোকজন বলছেন, এফডিসিতে শুটিং করাটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফ্লোর ভাড়া থেকে শুরু করে ক্যামেরা, লাইট, সম্পাদনা, কালার গ্রেডিংয়ে যে খরচ, বাইরে তা অনেক কম, সুযোগ-সুবিধাও অনেক বেশি। সিনেমার এমনিতেই এখন মন্দাবস্থা। খরচ কমাতে প্রযোজকেরা তাই এফডিসির বাইরে কাজ করতেই আগ্রহী বেশি।

শুধু ক্যামেরা ভাড়ার কথাই ধরা যাক। এফডিসির রেড ড্রাগন নিয়ে কাজ করতে গেলে আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতিদিন দুই শিফটে খরচ প্রায় ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু বাইরে থেকে একই ক্যামেরা নিয়ে দুই শিফট কাজ করতে লাগে ১৫-১৬ হাজার টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএফডিসির বিভিন্ন ফ্লোরের ভাড়াও বাইরের চেয়ে বেশি। দুই শিফটে প্রতি ফ্লোরের সর্বনিম্ন ভাড়া ১৩ হাজার টাকা, এর মধ্যে ২ নম্বর ফ্লোরের ভাড়া আবার ৪০ হাজার টাকা। যেখানে উত্তরা কিংবা ঢাকা শহরের অন্য সব শুটিং বাড়ির দুই শিফটের ভাড়া পড়ে ১০ থেকে ১৩ হাজার টাকা। একজন তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, দেখা যায়, এসি নষ্ট থাকলেও মেকআপরুমের পুরো ভাড়াই নেয় তারা।

‘গলুই’ ছবিতে শাকিবের বিপরীতে অভিনয় করেছেন পূজা চেরি
সংগৃহীত

এসব কারণে এফডিসিতে দিন দিন কমে যাচ্ছে শুটিং। বিএফডিসি সূত্র জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে কোনো কোনো মাসে মাত্র এক–দুটি ছবির অংশবিশেষের শুটিং হয়েছে। ফলে মাসের ১৫ দিনই ফাঁকা থাকে এই আঙিনা। তবে সিনেমার বাইরে মাঝেমধ্যে কিছু বিজ্ঞাপন ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের শুটিং হয়। জানা গেছে, গত মাসে এফডিসিতে লিডার: আমিই বাংলাদেশ ও বুবুজান নামে মাত্র দুটি ছবির শুটিং হয়েছে। তা–ও পাঁচ-ছয় দিন মাত্র। এরপর ভাঙন নামে একটি ছবির শুটিংও হয়। অথচ এই একই সময়ে এফডিসির বাইরে গ্যাংস্টার, নরসুন্দরী, প্রিয়া রে, সোনার চর, প্রেম প্রীতির বন্ধন, নূর, গলুইসহ বেশ কয়েকটি ছবির শুটিং হয়েছে।

প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম জানান, এফডিসিতে শুটিং করতে গেলে বাড়তি অনেক খরচ গুনতে হয়। ফ্লোরের বাইরে এফডিসির ফাঁকা জায়গায় সেট বানাতে, রাস্তা, বাগানে শুটিং করতেও বাড়তি তিন হাজার টাকা প্রতি শিফটে ভাড়া লাগে। ফ্লোরের সঙ্গে থাকা গ্রিনরুমে আলাদা করে প্রতি শিফটে ২ হাজার ৩০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু বাইরে হাউস ভাড়া নিলে গ্রিনরুমের ভাড়া গুনতে হয় না। এমনকি শুটিং করতে করতে কোনো লাইট নষ্ট হলে নতুন লাইট কেনার খরচও প্রযোজককে বহন করতে হবে। শুধু তা–ই নয়, শুটিংয়ের সময় রাত ১১টা পার হলে আরেক শিফটের ভাড়া আদায় করে তারা। তাই এসব থেকে রেহাই পেতে প্রযোজকেরা এফডিসির বাইরে গিয়ে শুটিং করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। খোরশেদ আলম বলেন, ‘প্রযোজকদের এমন সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা সমিতিগুলো প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছি। লাভ হয়নি। আমি বলব, সিনেমার এই দুঃসময়ে বিএফডিসির উচিত হবে, শুটিং–সংশ্লিষ্ট সবকিছুর খরচ কমিয়ে বেশি বেশি ছবি নির্মাণে প্রযোজকদের উৎসাহ বাড়ানো।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব শাহিন সুমন তাঁর গ্যাংস্টার সিনেমার পরের ধাপের শুটিং ঢাকার বাইরে ফিল্ম ভ্যালিতে করবেন। জানালেন, এফডিসিতে সেট বানিয়ে শুটিং করা যেত। কিন্তু সেখানে শুটিং করতে গেলে নানা ধরনের বাড়তি খরচ। আগে সিনেমার ব্যবসা ছিল, প্রযোজকদের গায়ে লাগেনি। এখন সিনেমায় ব্যবসা নেই। অনেকেই তাই বাধ্য হয়ে বাইরে শুটিং করছেন। যেসব সিস্টেমে বিএফডিসি কাজ করে, তা পরিবর্তন করতে হবে। নাহলে ঝিমিয়ে পড়া এই আঙিনা আরও ঝিমিয়ে পড়বে।

সিনেমার কাজই তো এখন কম। এ কারণেই এফডিসিতে আগের চেয়ে শুটিং কমেছে।

শুটিং কমে যাওয়ার বিষয়টি বিএফডিসির অতিরিক্ত পরিচালক (বিক্রয়) রফিকুল ইসলামও স্বীকার করলেন। তিনি বলেন, ‘সিনেমার কাজই তো এখন কম। এ কারণেই এফডিসিতে আগের চেয়ে শুটিং কমেছে।’ তবে অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি নিয়ে প্রযোজক ও পরিচালকের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন তিনি। রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চার-পাঁচ বছরের পুরোনো লাইট শুটিংয়ে নষ্ট হলে বাড়তি বিল ধরা হয় না। তবে ছয় মাস বা এক বছর মেয়াদি লাইট নষ্ট হলে শুটিংয়ের খরচের সঙ্গে এর মূল্য ধরা হয়। প্রযোজক, পরিচালকেরা শুটিংয়ের খরচের হিসাব নিয়ে যা বলছেন, তা তো এক দিনের নয়। অনেক আগে থেকেই এভাবে শুটিং হয়ে আসছে।’ এই কর্মকর্তা জানালেন, মাসখানেক আগে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্রের কয়েকটি সংগঠন এ বিষয়ে আলোচনা করে। মন্ত্রণালয়ও খুবই আন্তরিকভাবে বিষয়টি দেখবে বলেছে।