দেশের প্রেক্ষাগৃহে এ বছর প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে মুক্তি পায় ‘ছিটমহল’। ছিটমহল ইস্যু নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রটি অনেক আশা নিয়ে মুক্তি পেলেও প্রেক্ষাগৃহমালিকেরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একইভাবে চলতি বছরের গেল তিন মাসে দেশের প্রেক্ষাগৃহে আরও আটটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এর মধ্যে বেশ কিছু ছবি প্রশংসিত হলেও সিনেমা হলে কোনোটিই বড় আকারে ব্যবসায়িক সফলতা পায়নি। প্রযোজকদেরও কেউ হতাশ, আবার কেউ করোনার সময়টাকেও প্রেক্ষাগৃহে দর্শকবিমুখতার কারণ মনে করছেন। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহমালিকদের কথা, বাণিজ্যিক বিবেচনায় এসব ছবি সময়োপযোগী গল্পের অভাব ও নির্মাণের দুর্বলতার কারণে ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
তিন মাসে মুক্তি পাওয়া বেশির ভাগ চলচ্চিত্র নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। পক্ষে–বিপক্ষে নানা মত তৈরির চেষ্টা করেছেন অনেকে। দর্শক টানতে তারকারাও বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ছুটেছেন। কিন্তু ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এসব কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে বড় বাজেটের চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল মিশন এক্সট্রিম। গত বছরের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রও দেশের প্রেক্ষাগৃহে আশানুরূপ ব্যবসা করতে পারেনি। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা ছিল, করোনাকালে ছবিটি কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাবে। কিন্তু হলমালিকদের মতে, বড় বাজেট, বড় তারকা ও কয়েকটা মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেই করোনায় স্থবির হয়ে থাকা চলচ্চিত্র অঙ্গন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
করোনাকাল এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিকের পথে। গত তিন মাসে মুক্তি পেয়েছে মাত্র নয়টি চলচ্চিত্র। ছবিগুলো হচ্ছে ‘ছিটমহল’, ‘তোর মাঝেই আমার প্রেম’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ-২’, ‘মাফিয়া-১’, ‘মুখোশ’, ‘শিমু’, ‘গুণিন’, ‘লকডাউন লাভ স্টোরি’ ও ‘জাল ছেঁড়ার সময়’।
স্টার সিনেপ্লেক্স তাদের ধানমন্ডি, বসুন্ধরা সিটি, মহাখালি, মিরপুর শাখায় ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ–২’, ‘মুখোশ’, ‘শিমু’, চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শন করেছে। একই সময়ে দেশের বাইরের চলচ্চিত্রও তারা মুক্তি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানালেন, সিনেমার দর্শক কিন্তু আছে।
দেশের বাইরের অনেক সিনেমার তো চার–পাঁচ দিন আগেও টিকিট বিক্রি হয়েছে। কিন্তু দেশের চলচ্চিত্র সেভাবে ব্যবসা করতে পারছে না। গড়পড়তা ব্যবসা করছে। করোনা মহামারির এই সময়েও যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রগুলো দেখার জন্য দর্শক হলমুখী হচ্ছেন, এটাও আশার কথা। ধারণা করা যাচ্ছে, বড় বাজেট ও বড় তারকার ধামাকা কিছু দিতে পারলেই আবার প্রেক্ষাগৃহে ছুটবেন দর্শক।
তিন মাসে মুক্তি পাওয়া বেশির ভাগ চলচ্চিত্র নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। পক্ষে–বিপক্ষে নানা মত তৈরির চেষ্টা করেছেন অনেকে। দর্শক টানতে তারকারাও বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ছুটেছেন। কিন্তু ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এসব কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরেণ্য একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ফেসবুকে আওয়াজ তুলে হয়তো একবার সিনেমা হলে দর্শকদের নেওয়া যাবে কিন্তু দর্শকেরা ফিরে এসে যদি অন্যদের ছবিটি দেখতে না বলেন, তাহলে কোনো লাভ নেই। তাই মন দিয়ে সবাইকে ছবিটা বানাতে হবে। এখন আর গোঁজামিল দিয়ে কিছু করে দেওয়ার সেই সময় কিন্তু নেই। প্রপার সিনেমা বানাতে পারলেই, দর্শক এমনিতেই প্রেক্ষাগৃহে ছুটবেন। আমরা তো বাংলাদেশেও প্রায়ই শুনি, সিনেপ্লেক্সে অমুক সিনেমার টিকিট পেতে মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও এমনটা ছিল। কারণ, ছবিগুলো দর্শকের হৃদয় ছুঁতে পেরেছিল। তাই দর্শকমন ছুঁতে পারে, তেমন সিনেমা বানানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে।’
ঢাকার প্রাচীন প্রেক্ষাগৃহগুলোর মধ্যে এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মধুমিতা। কিন্তু এই প্রেক্ষাগৃহের স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ তাঁদের প্রেক্ষাগৃহের বর্তমান ব্যবসা নিয়ে আতঙ্কিত। এমনও বললেন, যেকোনো সময় মধুমিতা বন্ধ করে দিতে হয় কি না, সেটাও বুঝতে পারছেন না। নওশাদ জানালেন, যেখানে তাঁদের প্রেক্ষাগৃহ মধুমিতা থেকে একটি প্রদর্শনীতে ৫০–৫৫ হাজার টাকা উঠত, সেখানে এসব ছবি চালিয়ে সপ্তাহেই আসছে ৫০ হাজার টাকার কম! তিনি জানালেন, গত ৩ মাসে ইভনিং ও স্পেশাল শো মিলিয়ে ১৪০টি প্রদর্শনী করাই সম্ভব হয়নি। অথচ কোনো খরচের খাতই কিন্তু থেমে নেই।’
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ তাঁদের প্রেক্ষাগৃহের বর্তমান ব্যবসা নিয়ে আতঙ্কিত। এমনও বললেন, যেকোনো সময় মধুমিতা বন্ধ করে দিতে হয় কি না, সেটাও বুঝতে পারছেন না।
কেন এসব চলচ্চিত্র ফ্লপ করছে, জানতে চাইলে নওশাদ বলেন, ‘সত্যি কথা বললে বলতে হয়, প্রযোজকের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন ঠিকই পরিচালকেরা, কিন্তু সততা নিয়ে তাঁরা সিনেমা বানাচ্ছেন না। এতে করে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেকে পরে আর প্রযোজনাই করতে চাইছেন না। প্রযোজকদেরও মানসম্মত পরিচালক খুঁজে বের করে চলচ্চিত্র বানাতে হবে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত যে কয়টি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে, কোনোটিরই গল্প, নির্মাণ হলের দর্শকদের মুগ্ধ করার মতো ছিল না।’
ব্যবসার ব্যাপারটা দর্শক ও হলমালিকেরা প্রকৃত অর্থে বিচার করতে পারবেন। হলমালিকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। কোন ছবি কেন চলে, এটা তাঁরা ভালো বলতে পারেন। আবার কোন সিনেমা কেমন হলে ভালো চলত, তা–ও বলে দিতে পারেন। তাঁরা যদি বলে থাকেন যে গল্প নেই, নির্মাণ ঠিক নেই, তাহলে আমিও তা–ই ভেবে নেব। কারণ, আমজাদ হোসেন, আজিজুর রহমান এবং আমাদের সময়েও হলমালিকেরা সমালোচনা করতে কোনো দ্বিধা করতেন না।
জ্যেষ্ঠ পরিচালক মতিন রহমান প্রেক্ষাগৃহমালিকদের মতামতের প্রতি পুরোপুরি সমর্থন জানালেন। তিনি বলেন, ‘ব্যবসার ব্যাপারটা দর্শক ও হলমালিকেরা প্রকৃত অর্থে বিচার করতে পারবেন। হলমালিকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। কোন ছবি কেন চলে, এটা তাঁরা ভালো বলতে পারেন। আবার কোন সিনেমা কেমন হলে ভালো চলত, তা–ও বলে দিতে পারেন। তাঁরা যদি বলে থাকেন যে গল্প নেই, নির্মাণ ঠিক নেই, তাহলে আমিও তা–ই ভেবে নেব। কারণ, আমজাদ হোসেন, আজিজুর রহমান এবং আমাদের সময়েও হলমালিকেরা সমালোচনা করতে কোনো দ্বিধা করতেন না। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা বলে দিতেন, আপনার সিনেমার এই সিন ভালো হয়নি, এই সিনেমা চলবে না। আমার ‘লাল কাজল’ চলচ্চিত্রেও এমনটা বলেছিলেন, সেটাই পরে সত্যি হয়েছিল। বলাকা হলের মালিক ১৯৮২ সালেই বলেছিলেন, “আপনি লাস্ট সিনে কেন ম্যাডাম শাবানাকে মেরে ফেলেছেন, এই ছবি চলবে না।” প্রথম শো হাউসফুল হলেও পরে আর দর্শক পায়নি। হলমালিকেরাই দর্শকদের সেন্টিমেন্ট বোঝেন।’
মানুষ তো সারা জীবন অফট্র্যাক জীবনের মধ্যে কাটায়। মানুষ নানা ঝুটঝামেলা শেষে যখন একটি চলচ্চিত্র দেখতে যান, তখন সত্যিকার অর্থে বিনোদন পেতে চান। ফ্যান্টাসির জগতে থাকতে চান। স্বপ্ন দেখতে চান। দেখা যাচ্ছে, গল্প ভালো হচ্ছে, আবার অভিনয়ও হচ্ছে কিন্তু কী যেন নেই।
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত যে কয়টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে, সব কটি সেন্সর বোর্ড সদস্য হওয়ার কারণে দেখার সুযোগ পেয়েছেন অভিনয়শিল্পী ও পরিচালক অরুণা বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রের একটা আলাদা ভাষা আছে, এখনকার বেশির ভাগ চলচ্চিত্রে তা পাওয়া যায় না। অনেকে আবার অফট্র্যাক চলচ্চিত্র বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি বলতে চাই, মানুষ তো সারা জীবন অফট্র্যাক জীবনের মধ্যে কাটায়। মানুষ নানা ঝুটঝামেলা শেষে যখন একটি চলচ্চিত্র দেখতে যান, তখন সত্যিকার অর্থে বিনোদন পেতে চান। ফ্যান্টাসির জগতে থাকতে চান। স্বপ্ন দেখতে চান। দেখা যাচ্ছে, গল্প ভালো হচ্ছে, আবার অভিনয়ও হচ্ছে কিন্তু কী যেন নেই।’