যে নাটকে দর্শক-অভিনেতা একাকার
নাটক দেখতে চলেছি। এই শহরে নাটক দেখতে বেইলি রোড আর শিল্পকলা একাডেমি ছাড়া আর জায়গা কই? তবে আজকের গন্তব্য ভিন্ন, ধানমন্ডি। কোনো মিলনায়তন নয়, একটি বাড়ি।
দরজা খুললেন এক অপরিচিত তরুণী। চোখে চশমা। গায়ে ছাইরঙা জামার ওপরে নীল কটি। পরনে নীল সালোয়ার। পায়ে নীল জুতা। তাঁর পাশে অভ্যর্থনা জানাতে ছিলেন আরও একজন। পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা। আমরা জানতে পারি, এটি আসলে ভাবনাদেরই বাসা। মিলনায়তন ছেড়ে তাঁদের বসার ঘরেই চলে এসেছে নাটক। আমাদের হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দেওয়া হলো। তাতে লেখা, ‘৫৭৭: চায়ের সঙ্গে বাকরখানি। চট্টগ্রামের লোকেরা বলতে পারেন বেলা বিস্কুট।’ এটা আবার কী? নাটক শুরু হলে জানতে পারি। আসলে এটা পৃথিবীর বিস্ময়কর যে বিষয়গুলো আছে তার একটা। কারণ নাটকটি যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, সে একটা সাত বছরের মেয়ে, যে তার আত্মহত্যাপ্রবণ মাকে বাঁচাতে পৃথিবীর বিস্ময়কর সব জিনিসের তালিকা করে।
আমরা ভেতরে ঢুকি। আসবাব সরিয়ে বসার ঘরকেই করা হয়েছে মঞ্চ। চারকোনা ঘরের চারদিকে কালো কাপড়ে মোড়ানো চেয়ার পাতা। কোনো আড়ম্বর নেই। চারদিকে হ্যালোজেনের সাদা আলো। ওপরে টানানো রশি। তাতে টানানো বিভিন্ন রঙিন কাগজে লেখা, ‘হালকা রোদে এক পশলা বৃষ্টি’, ‘শর্ষে ফুলের ঘ্রাণ’, ‘কাশবন’, ‘শর্ষে ইলিশ,’ ‘একা পাখি’ ইত্যাদি। আন্দাজ করি, ওগুলোও বিস্ময়কর বস্তু।
ঘণ্টি বাজে। নাটক শুরু হয়। আরেকবার চমকে উঠি। অভ্যর্থনাকারী সেই চশমা পরা মেয়েটিই দেখি অভিনয়শিল্পী। নাটকের শুরুতে মেয়েটি হাজির হন তাঁর পোষ্য কুকুরছানা নিয়ে। ছানাটির ঊরুতে দিতে হবে ইনজেকশন। তিনি ডেকে আনেন এক পশুচিকিৎসককে। এবার ঘটল এক অদ্ভুত কাণ্ড। অভিনেত্রী মেয়েটি এক দর্শকের কাছে ছুটে যান। বিনয়সহকারে জানান, তিনি দেখতে নাকি তাঁর সেই পশুচিকিৎসকের মতো। তিনি কি মেয়েটির সঙ্গে পশুচিকিৎসক হিসেবে অভিনয় করবেন? আচমকা এমন প্রস্তাবে কিছুটা হকচকিয়ে যান দর্শক। পরে তিনিও হয়ে যান নাটকটির পশুর চিকিৎসক। তবে কুকুরছানা? আরেক দর্শকের ব্যাগ হয়ে যায় কুকুরছানা বোমকেশ বক্সী। আর কলম হয়ে যায় সিরিঞ্জ। এভাবেই নাটকে দর্শকের সঙ্গে থাকা আসবাব হয়ে যায় প্রপস আর দর্শকই হয়ে যান সহ–অভিনেতা। প্রসেনিয়াম (এক পাশে দর্শক ও এক পাশে অভিনেতা) মঞ্চের ধারণা ভেঙে দর্শক–অভিনেতা একাকার হয়ে যায়।
আগেই বলেছি, আত্মহত্যাপ্রবণ এক মাকে বাঁচাতে সাত বছরের এক মেয়ের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার গল্প এ নাটক। আর সে চেষ্টায় সে বেছে নেয় অভিনব এক পন্থা। মায়ের জন্য পৃথিবীর বিস্ময়কর সবকিছুর একটা তালিকা করে। কিন্তু মাকে সে বাঁচাতে পারে না। তবে এর মধ্য দিয়ে সে আবিষ্কার করে আত্মহত্যার প্রবণতা, বিষণ্নতা থেকে বাঁচবার মন্ত্র। বিষণ্ন, আত্মহত্যাপ্রবণ মায়ের সন্তানেরা কীভাবে বেড়ে ওঠে, তাদের মনোজগতে কী ঘটে, সেগুলোও উঠে আসে।
সৈয়দ জামিল আহমেদের অনুবাদ, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এবং মহসিনা আক্তারের অভিনয়ে আর ‘স্পর্ধা’র প্রযোজনায় ব্রিটিশ নাট্যকার ডানকান ম্যাকমিলানের ‘এভরি ব্রিলিয়ান্ট থিং’ বাংলায় হয়ে উঠেছে ‘বিস্ময়কর সবকিছু’। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে লেখা এ নাটক যেন হয়ে ওঠে এখনকার বাংলাদেশের গল্প, বিস্ময়কর সবকিছুর তালিকায় দেখা যায় ‘হাওয়াই মিঠাই’, ‘হাজির বিরিয়ানি’ কিংবা ‘বাকরখানি’র নাম। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গল্পটিকে টেনে আনতে গিয়ে কোথাও কোথাও সুর একটু কেটে গেছে! যেমন ইংরেজি গানে ঠোঁট মেলাতে পারলেন হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র দর্শক।
সে যা–ই হোক, দর্শক–অভিনেতার ভেদরেখা ঘুচে নতুন ধরনের থিয়েটার উপভোগ সবচেয়ে বড় কথা। পাশাপাশি বলতে চাই, এই শহরে জ্যাম ঠেলে, অফিস শেষে সেগুনবাগিচায় গিয়ে শিল্পকলায় নাটক দেখা এক ঝক্কি বটে। সে ঝামেলা আর থাকল না। আপনার পাশের বাসার বসার ঘরেই হয়তো হচ্ছে নাটক। শুধু একটু চোখ–কান খোলা চাই। গুলশানে শুরু হয়ে বারিধারা ও ধানমন্ডিতে নাটকটির প্রদর্শনী হয়েছে। সামনে হবে উত্তরায়।