কী গল্প, কী সংলাপ বা অভিনয়—চার প্রধান কুশীলবই যেন জীবন্ত চরিত্র হয়ে এলেন মঞ্চে।
কী গল্প, কী সংলাপ বা অভিনয়—চার প্রধান কুশীলবই যেন জীবন্ত চরিত্র হয়ে এলেন মঞ্চে।ছবি:ফেসবুক থেকে।

নাটকের দৈর্ঘ্য এক ঘণ্টার থেকে একটু বেশি। হলরুমে পিনপতন নীরবতা। এর মধ্যে এক খুদে দর্শক তার বাবার কাছে জানতে চাইল, এরপর কী হবে? যেন এই একই প্রশ্ন বুকে নিয়ে অপেক্ষা করতে করতেই লাইট নিভে আসে। দর্শকেরা বসে থাকেন, চুপচাপ। নাটক কি তবে শেষ? একজনের করতালি শুরু হতেই ঘোর ভাঙে। তালির আওয়াজ হলের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তার মানে নাটক শেষ! নাটক দিয়ে দর্শককে আটকে রাখা রাত, ফিরে এল আবার।

default-image

শীত আসি আসি করছে। শিল্পকলার সেই চিরচেনা ভিড় নেই। করোনায় সব স্থবির। তবে জাতীয় নাট্যশালা লাগোয়া চায়ের দোকানগুলোতে নাট্যকর্মীদের ছোট ছোট জটলা সাহস জোগায়, নাটপাড়া জেগে আছে। মাস্ক পরে থাকায় কাউকে চেনা যায়, কাউকে যায় না। এই নতুন স্বাভাবিকে পরীক্ষণ থিয়েটারে আর্থার মিলারের নাটক ‘দ্য প্রাইস’ নিয়ে হাজির নতুন দল অনুস্বর। ১৯৬৭ সালের এই নাটক ‘যে মূল্য অমূল্য’ নামে ২০২০ সালে রূপান্তরিত হয়েছে, তা টের পাওয়া গেল নাটকের এক গ্রন্থিকের সংলাপেই। খোদাবক্স মঞ্চে প্রবেশ করেন কাশতে কাশতে। অন্য কুশীলবের ভ্রু কুঁচকে যাওয়ার আগেই, পুরোনো ফার্নিচার কেনাবেচার এই কারবারি জানিয়ে দেন, ‘ভয় নেই। করোনার টেস্ট করিয়েছি আগেই। ফলাফল নেগেটিভ।’

বিজ্ঞাপন

দর্শকের ভেতর থেকে একপশলা হাসির গমক ওঠে। নাটকের শুরুতেই আমরা বুঝতে পারি, বিশ শতকের নাটকটি এই সময়ের সঙ্গে ভালোই মিলিয়েছেন ভাবানুবাদকারী অসিত মুখোপাধ্যায় ও রূপান্তরকারী মোহাম্মদ বারী।

default-image

নতুন স্বাভাবিক, তাই বসার আসনবিন্যাসেও পাওয়া গেল নতুনত্ব। দাবার ছকের মতো, একটি চেয়ারের জায়গা খালি রেখে আরেকটি চেয়ারে ছিল আসন। ঢোকার মুখে হাত স্যানিটাইজ করা হলো। সবার মুখে ছিল মাস্ক।
কী গল্প, কী সংলাপ বা অভিনয়—চার প্রধান কুশীলবই যেন জীবন্ত চরিত্র হয়ে এলেন মঞ্চে। মোহাম্মদ বারী, প্রশান্ত হালদার, সাইফ সুমন কিংবা ফরিদা লিমা, একজন ছাপিয়ে গেলেন আরেকজনকে। ১৯৩০-এর অর্থনৈতিক মহামন্দার অভিজ্ঞতা আর্থার মিলারের মনে ভালোই গাঁথা। বিশ শতকের মানবিক সংকট আর এর পেছনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যকরণ কতটা গভীর, তা মিলারের রচনায় স্পষ্ট। সেই মানবিক টানাপোড়েন, দারিদ্র্য-হতাশা-লোভ, ব্যক্তিসত্তার মূল্যবোধ, পরিবারে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্পর্ক কি এখনো ঠিক হয়েছে? নাকি ২০২০ সালে এসেও আগ্রাসী মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবে মন্দ থেকে মন্দতর হয়েছে। তারই বয়ান দেখা গেল নাটকের দৃশ্যে, গল্পের বাঁকে বাঁকে।

default-image

যদিও মূল্য অমূল্য-এর গায়ে প্রশংসার পালক, কিন্তু একেবারে সবকিছুই কি প্রশংসনীয়! নাটকের শুরুর দিকে খোদাবক্সের মুখে গাড়ির ইঞ্জিনের সঙ্গে নারীকে মিলিয়ে যে উদাহরণগুলো টানা হলো, তাতে পুরুষতান্ত্রিক মানস একটুখানি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কি? প্রশ্ন ওঠে মনে।

নাটকের কোথাও কোথাও দৃশ্যগুলো খুব সাদামাটা লাগে, দৃশ্যের গ্রাফের একটু ওঠানামা থাকলে ভালো লাগত।

default-image

করোনায় নাট্যাঙ্গন বিপর্যস্ত ছিল। নতুন স্বাভাবিকে একটা নতুন নাটক কতটুকু ভালো হবে, তা নিয়ে ছিল বিস্তর আশঙ্কা। সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে অনুস্বর যা করে দেখাল, তা এককথায় অসাধারণ! নাটক শেষে তাই অতিথি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের কণ্ঠ ভরে যায় প্রশংসা বাক্যে, ‘নাটকটি এমনভাবে সবাইকে ধরে রাখল যে ভালো নাটক না বলে থাকার আর উপায় নেই।’
শেষ করার আগে একটা কথা না বলে পারছি না। সম্প্রতি রাজধানীর নাটকগুলো কোরিওগ্রাফির চাপে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল যেন। ভালো অভিনয় খুঁজে পেতে আতশ কাচ লাগাতে হয়। অনুস্বর সেখানে হাজির হলো একদম অভিনয় নিয়েই। মঞ্চনাটকে এ বড় ভালো খবর। শেষ করব এই নাটক নিয়ে ফেসবুকের একটি পোস্টে নাট্যকার ও নির্দেশক অনন্ত হিরার একটি মন্তব্য দিয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘নাট্যবন্ধু ও দর্শকবন্ধুরা একটি ভালো গল্প, ভালো সংলাপ আর ভালো অভিনয়ের নাটক এল ঢাকার মঞ্চে। দেখতে ভুল করবেন না। গল্পের দিন ফিরুক।’
হ্যাঁ, গল্পের দিন ফিরুক।

default-image
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0