নৃত্যকলায় এবারের একুশে পদক প্রসঙ্গে নৃত্যশিল্পীদের ৬ দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
নৃত্যশিল্পে একুশের পদকের জন্য এ বছর নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদের নাম ঘোষণা করা হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে একুশে পদকের জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণার পর থেকেই নৃত্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ এই বিভাগের পুরস্কার নিয়ে সমালোচনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে লেখালেখি হয়। আজ সোমবার ‘বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পীবৃন্দ’–এর ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনও করা হয়েছে। এদিন ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় একুশে পদকের মনোনয়নপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করা নিয়ে দাবিও জানিয়েছে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীবৃন্দ।
জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আজ সোমবার বিকেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পীবৃন্দ থেকে এ দাবি জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীদের পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি জানান নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য পরিচালক ফারহানা চৌধুরী বেবি। এ সময় তিনি একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ২০২৬ সালে নৃত্যকলা বিষয়ে একুশে পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। এটি বাংলাদেশের নৃত্যশিল্প ও নৃত্যশিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি এবং আমরা এই সম্মানকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করি। তবে নৃত্যকলায় কর্মক্ষেত্রে অবদানের জন্য যে নৃত্যশিল্পীকে একুশে পদক প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেই মনোনয়ন নিয়ে নৃত্যাঙ্গনে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।’
ফারহানা চৌধুরী বলেন, ‘একুশে পদক বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ভাষা ও মুক্তচিন্তার চেতনার প্রতীক—যা আজীবন সাধনা, সুদীর্ঘ অবদান এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনস্বীকার্য প্রভাবের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয়। বিশেষ করে নৃত্যকলার মতো একটি গভীর, ঐতিহ্যবাহী ও সাধনাভিত্তিক শিল্পক্ষেত্রে এই সম্মান প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রত্যাশিত। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় একুশে পদকের জন্য যে নামটি ঘোষিত হয়েছে, তার অভিজ্ঞতার পরিসর, বাংলাদেশে নৃত্যচর্চা ও নৃত্যশিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি অবদান—এই বিষয়গুলো নিয়ে নৃত্যাঙ্গনের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রশ্ন ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।’
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর একটা পক্ষের কাছ থেকে যেমন অর্থী আহমেদ শুভকামনা পাচ্ছিলেন, তেমনি নাচের সঙ্গে জড়িত একটা বিশাল অংশ তাঁর এই পদকপ্রাপ্তিতে অবাক হয়েছে। এ নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখিও হচ্ছে বলার পর অর্থী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘১০-১২ জন নৃত্যশিল্পী মন খারাপ করেছেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। আমার মনে হয়, সব বিষয়ে সমালোচনার প্রয়োজন আছে। গুরুজনেরা পাননি বলে আমারও মন খারাপ।’
এদিকে আজকের সংবাদ সম্মেলনে কথা প্রসঙ্গে ফারহানা চৌধুরী বেবি বলেন, ‘বাংলাদেশের নৃত্য ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে লোকনৃত্য, ধ্রুপদি নৃত্যের দেশীয় ধারার অভিযোজন, সমকালীন ও সৃজনশীল নৃত্যচর্চার ধারাবাহিক বিকাশের মাধ্যমে। অথচ উক্ত শিল্পীর নৃত্যচর্চা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের নৃত্যভূমিতে কী ধরনের মৌলিক, দীর্ঘস্থায়ী ও জাতীয়ভাবে প্রভাবশালী অবদান রাখা হয়েছে। যা একুশে পদকের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানের যোগ্যতা অর্জন করে, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে স্পষ্ট প্রশ্ন রয়েছে এবং আমাদের সংস্কৃতি উপদেষ্টা যে অবদানের কথা তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেছেন, তা সমাজসেবা বা সামাজিক কল্যাণমূলক—এটা নৃত্যশিল্পে উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান রাখে না। বাংলাদেশে এমন অসংখ্য সিনিয়র নৃত্যশিল্পী রয়েছেন, যাঁর কয়েক দশক ধরে নৃত্যচর্চা, নৃত্যশিক্ষা, গবেষণা, মঞ্চায়ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। তাঁদের আজীবন অবদান থাকা সত্ত্বেও উপেক্ষিত হওয়া নৃত্যাঙ্গনের জন্য গভীরভাবে বেদনাদায়ক এবং হতাশাজনক।’
লিখিত বক্তব্যের শেষে ফারহানা চৌধুরী একুশে পদকের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন, তা হচ্ছে একুশে পদক প্রদানের নীতিমালা অনুযায়ী ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় পদক প্রদান করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা। ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় একুশে পদকের মনোনয়ন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করা। নৃত্যাঙ্গনের অভিজ্ঞ, প্রবীণ ও স্বীকৃত ব্যক্তিত্বদের মতামত গ্রহণ করা। একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করা।
সংবাদ সম্মেলনে নৃত্যশিল্পী আমানুল হক, মাহফুজুল হক, শারমীন হুসেইন, বেলায়েত হোসেন, তামান্না রহমান, আনিসুল ইসলাম, সোহেল রহমান, মেহবুবা চাঁদনী, ওয়াসেক রহমান, মনিরা পারভীন, আমিরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।