সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুদান নিয়ে প্রশ্ন

অনুদানের তালিকায় যেমন পরিচিত নাট্যদল রয়েছে, তেমনি বেশ কয়েকটি পরিচিত নাট্যদল আবেদন করেও অনুদান পায়নিকোলাজ

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার নাটক, সংগীত, নৃত্য ও সাহিত্য সংগঠনসহ ১৯৪টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ১ কোটি ৪৬ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ টাকা অনুদান বরাদ্দ রেখেছিল সরকার।

এর মধ্যে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা ১২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার ৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা পেয়েছে। অনুদানের তালিকায় যেমন পরিচিত নাট্যদল রয়েছে, তেমনি বেশ কয়েকটি পরিচিত নাট্যদল আবেদন করেও অনুদান পায়নি।

যেমন নির্ধারিত সময়ে আবেদন করেও অনুদান পায়নি প্রাঙ্গণেমোর থিয়েটার, থিয়েটার ফ্যাক্টরি, অনুস্বর, বর্ষা উৎসব উদ্‌যাপন পরিষদ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর মতো পরিচিত সংগঠন। আবার কেউ কেউ পেলেও পরিমাণে অপ্রতুল।

আবেদন করেও অনুদান মেলেনি

আবেদন করেও অনুদান না পাওয়া নাট্যদল থিয়েটার ফ্যাক্টরির প্রধান অলোক বসু এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যারা ভালো কাজ করে, নিয়মিত কাজ করে, তাদের বঞ্চিত করা কেন? এ ধরনের কর্মকাণ্ড কি সৃজনশীল সংস্কৃতি তথা নাট্যচর্চাকে নিরুৎসাহিত করার পাঁয়তারা না?’

তাঁর ভাষ্য, গত ১৩ মাসে নতুন একটি নাটক মঞ্চে এনেছে থিয়েটার ফ্যাক্টরি। নাটকটি ২০ বার মঞ্চায়ন করা হয়েছে। দুটি নতুন পথনাটক এনেছে, দুটি করে চারটি প্রদর্শনী হয়েছে। অন্য একটি নাটকের পাঁচটি প্রদর্শনী করেছে।

অনুদান না পাওয়া নাট্যদল প্রাঙ্গণেমোর থিয়েটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা নূনা আফরোজ ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান যে যে নাট‍্যদল পেল, তারা কী কী যোগ্যতায় পেল; আর যে যে দল পেল না, তারা কী কী অযোগ্যতার কারণে পেল না, সেটি জানার কৌতূহল হচ্ছে।’

অনুদান না পাওয়া বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কাজ করি। আমাদের বাদ দিয়েছে। কোন কারণে বাদ দিয়েছে, কেন বাদ দিয়েছে—এই ব্যাখ্যাও জানায়নি।’

বর্ষা উৎসব উদ্‌যাপন পরিষদ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীসহ বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের ১২টি সংগঠন অনুদান পায়নি।

মানজার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা চাই, যারা যোগ্য তারা পাক। যোগ্যরা যেন বাদ পড়ে না যায়। আমরা মনে করি, অনেক যোগ্য দল রয়েছে। তারা পাক। এটা ট্যাক্সের টাকা, কারও ব্যক্তিগত টাকা না। সমানভাবে পাওয়া উচিত।’

গত বছর অনুদান পেয়েছিল নাট্যদল ‘অনুস্বর’। এ বছর আবেদন করেও পায়নি। নাট্যদলটির প্রধান মোহাম্মদ বারী বলেন, ‘আমরা সব সময় বলে আসছি, যে প্রক্রিয়ায় অনুদান দেওয়া হয়, সেটা অস্বচ্ছ। কোনোভাবেই এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটার কোনো জবাবদিহি নেই।’

আগেও একই প্রক্রিয়ায় অনুদান দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে এর আগে কথা বলেছেন জানিয়ে মোহাম্মদ বারী বলেন, ‘আগেও এ রকম হয়েছে। আগেও নামসর্বস্ব দল অনুদান পেয়েছে। এবারও যাদের সারা বছর কাজ নেই, সে রকম বহু দলকে দেখছি। এর আগে অন্তত অধিকাংশ কার্যকর দলগুলোকে দেওয়া হয়। তারপর নামসর্বস্ব দলগুলো বরাদ্দ পেয়েছে। এবার সক্রিয় অনেকগুলো দল বাদ পড়েছে।’

বাদ পড়ার বিষয়ে অনুদানের জাতীয় কমিটির সদস্য কামাল বায়েজিদ বলেন, ‘অনেক দল বাদ পড়েছে। অনেক নতুন দল আবেদন করেছে। আবেদন করে অনেকে পেয়েছে, অনেকে পায়নি। নতুন সরকারের একটা কাঠামো আছে, বিভিন্ন কাঠামো আছে। মতাদর্শের বিষয় থাকে।’

আরও পড়ুন

‘টাকা খুবই সামান্য’

দেশনাটক, স্বপ্নদল, বাংলাদেশ থিয়েটার ও নাট্যতীর্থসহ ৯টি নাট্যদল ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা করে পেয়েছে।

অনুদান পাওয়া নাট্যদল নাট্যতীর্থের প্রধান তপন হাফিজ প্রথম আলোকে বলেন, মাসে মহড়াকক্ষের ভাড়াই ১৫ হাজার। এই নির্দেশক বলেন, ‘সরকার যতটুকু দেয়, ওতটুকুই সাশ্রয় হয়। এটুকুই সহযোগিতা হয় আরকি। আমাদের তো বছরে এর চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করতে হয়। প্রতি মাসেই নূ৵নতম একটি প্রদর্শনী থাকে। প্রতি প্রদর্শনীতে ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা লোকসান হয়। তাতে এই পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের সহযোগিতা হয়; কিন্তু সেটি বর্তমান থিয়েটার চর্চার যে আর্থিক সংকট, তার জন্য খুবই সামান্য।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনুদান পাওয়া একটি দলের নির্দেশক প্রথম আলোকে বলেন, একটি নাটক মঞ্চে আনতে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা খরচ হয়। সেখানে এই টাকা দিয়ে সেই অর্থে কিছুই হয় না।

পাঁচ দশকের পুরোনো নাট্যদল আরণ্যক পেয়েছে ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। নাট্যদলটি জানিয়েছে, তারা অনুদানের এই অর্থ নেবে না।

নাট্যদল ‘অনুস্বর’-এর প্রধান মোহাম্মদ বারী প্রথম আলোকে বলেন, আরণ্যকের মতো দলকে যে অঙ্কের বরাদ্দ দিয়েছে, তার দ্বিগুণ বরাদ্দ এমন কোনো সংগঠন পেয়েছে, যেই সংগঠনের কাজ তুলনামূলকভাবে কম।

বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অনুদানের জাতীয় কমিটির সদস্য কামাল বায়েজিদ প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর আরণ্যক আবেদন করেনি। এ বছর আবেদন করেছে। নিয়ম অনুযায়ী এক বছর বা তার বেশি সময় আবেদন না করলে সেটি নতুন হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আরণ্যক নতুন হিসেবে বরাদ্দ পেয়েছে।

স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য গঠিত অনুদানের জাতীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজিদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন নাট্যনির্দেশক মামুনুর রশীদ। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ, ‘বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, ঢাকা থিয়েটার, সেলিম আল দীন ফাউন্ডেশন, গ্রাম থিয়েটারকে অনুদান দেওয়ায় কামাল বায়েজিদের হাত রয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কামাল বায়েজিদ। তাঁর ভাষ্য—এসব সংগঠনের নাম শিল্পকলা একাডেমি থেকে অনুমোদন করা হয়েছে। তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না।’