জানালেন, ‘আরণ্যক’ নামটি দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। মামুনুর রশীদ বললেন, ‘টেলিভিশনে বসে আবদুল্লাহ আল–মামুনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, বলেছিলাম, “একটা নাটকের দল করব, কী নাম দেওয়া যায়?” আবদুল্লাহ আল মামুন বললেন, “নাগরিক তো আছেই, তোমরা আরণ্যক হয়ে যাও।” তারপরই নাম দিলাম আরণ্যক।’

কবর-এর পর ওই বছরই অভিনীত হয় ‘পশ্চিমে সিঁড়ি’। ১৯৭৬ সালে মঞ্চে আসা ‘ওরা কদম আলী’ নাটকের বক্তব্যে মানবিক মূল্যবোধ, শ্রেণিসংগ্রাম আর প্রতিরোধের চেতনা স্পষ্ট। ১৯৭৯ সালে আরণ্যকের প্রযোজনা ওরা আছে বলেই। গ্রাম থেকে ভেসে আসা মানুষের সংঘবদ্ধ টিকে থাকার চিত্র এই নাটক। আরণ্যকের জনপ্রিয় প্রযোজনা ‘ইবলিশ’ এসেছিল ১৯৮১ সালে। দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, মান ও বক্তব্যের বিচারে ‘ইবলিশ’ অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী নাটক। নাট্যচর্চার পালাবদল প্রথম ১০ বছরে ‘কবর’ থেকে ‘ইবলিশ’ পর্যন্ত আরণ্যক প্রযোজিত নাটক প্রদর্শনীর সংখ্যা ১৭৮।

এ প্রসঙ্গে নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘প্রথম ১০ বছরে নাট্যচর্চার অভিজ্ঞতায় আমরা বুঝতে পারি, মহিলা সমিতি বা অন্য কোনো মিলনায়তনের সীমিত আসনের মঞ্চে নাটককে কখনোই প্রচলিত বিনোদনের ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। অভিনেতা ও মধ্যবিত্ত দর্শকের মধ্যে একটা দূরত্ব থেকেই যাবে।’

এমন উপলব্ধি থেকে নাট্যচর্চায় পরিবর্তন আনে আরণ্যক। বেছে নেয় সহজতর ও জীবনঘনিষ্ঠ উপস্থাপনা। ১৯৮২ সালে মুক্তনাটকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরণ্যক মঞ্চে আনে আবদুল্লাহেল মাহমুদ রচিত ‘সাত পুরুষের ঋণ’। ১৯৮৬ সালে ‘নানকার পালা’ আরণ্যকের নাট্যচর্চার আরেকটি পালাবদল। মামুনুর রশীদ জানান, ‘নানকার পালা’ মঞ্চে আসার পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা আর স্বৈরাচারী নির্যাতনের কালে ব্যাহত হলো স্বাভাবিক নাট্যচর্চা। এ সময় মঞ্চ ছেড়ে পথে নেমে এল আরণ্যক। মিছিল, বিক্ষোভ আর পথনাটক এক হয়ে গেল।

১৯৯২ সালে আরণ্যক মঞ্চে আনে মামুনুর রশীদের পাথর। ধর্ম নিয়ে উপমহাদেশের বাস্তবতা—পাশাপাশি এ নাটকে মানুষের মহত্ত্বের সম্ভাবনা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র উঠে এসেছে। ১৯৯৪ সালে মান্নান হীরার ‘আগুনমুখা’ নাটকে উঠে এসেছে বিপ্লব আর বিপ্লবীদের কথা। বিতর্ক, দলাদলি, বিভক্তির নানা চিত্রের শৈল্পিক বিশ্লেষণ আগুনমুখা। পরের বছর ১৯৯৫ সালে মামুনুর রশীদ মঞ্চে নিয়ে আসেন তাঁর বহুল প্রশংসিত নাটক জয়জয়ন্তী। এ নাট্যাখ্যান মুক্তিযুদ্ধের, স্বাধীনতার, মুক্তির ও জাগরণের।

তারপর আবার মঞ্চে এল ভিন্ন রং। ১৯৯৭ সালে প্রাকৃতজন কথা নাটকে হাজার বছর আগের ইতিহাসের এক বিশেষ ক্রান্তিকালকে তুলে আনলেন আবদুল্লাহেল মাহমুদ। ১৯৯৯ সালে মঞ্চে আসে মান্নান হীরা রচিত ‘ময়ূর সিংহাসন’। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে একটি মফস্‌সল শহরে স্বাধীনতাকামী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরোধ, এ নাটকের বিষয়। ২০০০ সালে ‘সঙক্রান্তি’ নাটকে উঠে আসে গ্রামের লোকনাট্য ‘সঙ’-এর সঙ্গে কৃষিজীবী মানুষের জীবন ও শিল্পের বিরোধ এবং উচ্চবিত্ত মানুষের কাছে তাদের অবহেলার চিত্র।

সাঁওতালদের ভূমি লুণ্ঠনসহ নানা নির্যাতনের কাব্যিক প্রযোজনা ‘রাঢ়াঙ’। এটি আসে ২০০৪ সালে। ২০১৪ সালে আরণ্যক মঞ্চে আনে মামুনুর রশীদের ভঙ্গবঙ্গ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে আজকের সময়কে সমন্বয় করে রূপকধর্মী নাটক ভঙ্গবঙ্গ।
২০১৬ সালে মঞ্চে আসে মান্নান হীরা রচিত দি জুবলী হোটেল। নাটকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, নির্যাতন—সর্বোপরি জঙ্গিবাদের উত্থানের নানা গল্প উঠে এসেছে। ২০২০ সালে আসে ৬২তম প্রযোজনা কহে ফেসবুক।

মামুনুর রশীদের রচনা ও নির্দেশনায় ‘কহে ফেসবুক’ প্রযুক্তির প্রতি মানুষের মোহগ্রস্ততা এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক সম্পর্কের সংকটের প্রামাণ্য দলিল। এখন পর্যন্ত আরণ্যকের সর্বশেষ প্রযোজনা রাজনেত্র। ক্ষমতাসীনেরা কখনো কিছু স্বাভাবিক চোখে দেখে না, সবার চোখে থাকে একই ‘রাজনেত্র’। ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু এই বিশেষ দৃষ্টি বদলায় না, এই হলো এ নাটকের বিষয়। এভাবে ৫০ বছরের পথচলায় ৪০টি মঞ্চনাটক ও ২৪টি পথনাটকের শত শত প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে আরণ্যক। বিচিত্র তাদের পথচলা।

আগেই বলা হয়েছে, এবারের উৎসবে ৯টি নাটক দেখানো হবে। সব কটি নাটকই নিজেদের। একটি দলের মৌলিক ৯টি নাটক নিয়ে উৎসবের আয়োজন অনন্য ঘটনা। সব বিবেচনায় বলা যায়, ৫০ বছরেও আরণ্যকের টগবগে তারুণ্য প্রবহমান। মঞ্চনাটক, পথনাটক ও মুক্তনাটক করে নাট্যচর্চাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে দলটি। দলের কান্ডারি মামুনুর রশীদ বলেন, ‘শোষণহীন মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে আরণ্যক এই নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে।’

(তথ্য: আরণ্যকের প্রকাশনা থেকে)