চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে, ঢাকায় অনিশ্চিত
‘থিয়েটার খুইলাসে রে ভাই, থিয়েটার খুইলাসে’, শিল্পকলা একাডেমির ২ নম্বর মহড়ার কক্ষ থেকে ভেসে আসছে গান। পরিচিত একটি গানের সুরে কোরাসে গাইছেন নাট্যকর্মীরা। অন্য আরেকটি কক্ষ থেকে শোনা যাচ্ছে নাটকের মহড়ার সংলাপ। চিলেকোঠায় জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন কয়েকজন নাট্যকর্মী। পরীক্ষণ থিয়েটার ভবনের ৬ তলার সুপরিসর কক্ষেও চলছে আড্ডা, তবে এখানকার সদস্যরা সব সিনিয়র। সব মিলিয়ে যেন উৎসবমুখর একটা পরিবেশ।
‘উৎসবমুখর’ বলাটা হয়তো একটু বেশিই হয়ে গেল। কিন্তু মাসের পর মাস মঞ্চপাড়া যেখানে ছিল সুনসান, সেখানে মহড়া কক্ষের এই কর্মচঞ্চল্য নাট্যকর্মীদের আড্ডা ও উৎসবের কথাই মনে এনে দেয়। তা ছাড়া সেমিনার কক্ষের পাশের একটি ঘরে সত্যিকারের একটা উৎসব নিয়েও ব্যস্ততা আছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের নেতৃত্বে সেখানে চলছে গঙ্গা যমুনা সাংস্কৃতিক উৎসবের প্রস্তুতি। আছেন সময় নাট্যদলের আকতারুজ্জামান, সুবচন নাট্য সংসদের আহম্মেদ গিয়াস, চট্টগ্রামের শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্রের খোরশেদ আলমসহ আরও কয়েকজন। দেড় বছর পর নাট্যকর্মীদের মধ্যে নতুন একটা উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গঙ্গা যমুনা উৎসব ঘিরে সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে সাড়া পড়েছে। একে একে অনেকেই আসছেন। ধীরে ধীরে দলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ধীরে ধীরে আসার কারণটিও ব্যাখ্যা করলেন গোলাম কুদ্দুছ। অনেক দলের কর্মী গ্রামে বা ঢাকার বাইরে চলে গেছেন। ‘আমার দলেরও তিনজন কর্মী গ্রামে চলে গেছেন,’ গোলাম কুদ্দুছের আক্ষেপ।
শিল্পকলা একাডেমির মহড়ার কক্ষে নিয়মিত মহড়া করছে মহাকাল, পালাকার, গ্রন্থিক, সময়, বহ্নিশিখাসহ আরও বেশ কিছু দল। ক্রমেই বাড়ছে এই তালিকা। সোমবার সন্ধ্যায় যে দলের কর্মীদের কোরাস শুনে মহড়া কক্ষের দরজায় টোকা দিয়েছিলাম, সেটি মহাকাল। ঘুম নেই নাটকের মহড়া করছে তারা। দলের প্রধান মীর জাহিদ বলেন, ‘এভাবে দিনের পর দিন বসে থাকা যায় না। এটা থিয়েটারের কর্মীদের চরিত্রবিরোধী। আমরা যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনেই নিয়মিত মহড়া করছি। ২৫ তারিখে ঘুম নেই নাটকের ১০৮তম প্রদর্শনী করব আমরা, নাটকটি বহু বছর পর মঞ্চে ফিরবে।’
১৩ সেপ্টেম্বর হল বরাদ্দ কমিটির প্রথম সভা হয়েছে। সামনের এক মাস শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনগুলো কোন কোন দল বরাদ্দ পাচ্ছে, সেটিই ঠিক হলো। বরাদ্দ অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাট্যশালায় ঢাকা থিয়েটার একটি লৌকিক অথবা অলৌকিক স্টিমার এবং আরণ্যক ফেসবুক নাটকের প্রদর্শনী করবে। এই দুই নাটক দিয়েই এ যাত্রায় নাটকের প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা। তবে দুটি প্রদর্শনী নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আরণ্যকের প্রধান মামুনুর রশীদ বলেন, ‘এমনিতেই দীর্ঘদিন শো বন্ধ থাকায় দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে নাটকের প্রদর্শনীতে ৫০ শতাংশ টিকিটই বিক্রি করা যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে হলভাড়া, পত্রিকায় বিজ্ঞাপনসহ আনুষঙ্গিক খরচগুলো মিটিয়ে শো করা অসম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে শিল্পকলা একাডেমি এবং গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন বলেছিল, পত্রিকার বিজ্ঞাপনের টাকা অন্তত দিয়ে দেবে, সেটিও দিচ্ছে না। আমরা খবর নিয়েছি, ভারতসহ অন্য অনেক দেশ এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিচ্ছে। সরকার অন্য সবকিছুতে ভর্তুকি দিচ্ছে, নাটকে কেন দেবে না?’
একই মন্তব্য ঢাকা থিয়েটারের একটি লৌকিক অথবা অলৌকিক স্টিমার নাটকের নির্দেশক শহীদুজ্জামান সেলিমের। তিনিও বলেন, হলভাড়া মওকুফ করা না হলে তাঁরা শো করবেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি চলতি অর্থবছরের পুরোটা সময় ভর্তুকি দেবে। বিনা মূল্যে হল বরাদ্দের পাশাপাশি অন্তত ৫ হাজার টাকা করে শো খরচ দেবে সরকার।’ বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ জানালেন, ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবি–সংবলিত একটি চিঠি সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বরাবর দিয়েছেন তাঁরা। এখনো কোনো সাড়া মেলেনি। ইতিবাচক সাড়ার অপেক্ষায় আছেন তাঁরা।
সংস্কৃতিকর্মীদের সমবেত দাবির মুখে মিলনায়তন খুলে দিলেও অনিশ্চয়তা কিন্তু কাটেনি। হলভাড়ার প্রশ্নে, ভর্তুকির দাবিতে এখনো দোলাচলে মঞ্চ অঙ্গন। যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর যেভাবে হল ভাড়ায় ছাড় দিয়েছি, এবারও ছাড় দেব। তবে প্রণোদনার বিষয়টি আমাদের ওপর নেই। তাই এ বিষয়ে বলতে পারছি না।’
তবে এত সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও খুশির খবরও কিন্তু আছে। ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে সারারাত্তির নাটকের উদ্বোধনী প্রদর্শনী করেছে প্রসেনিয়াম। বাদল সরকারের নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন মোকাদ্দেম মোরশেদ।
খবর নিয়ে জানা গেছে, নতুন নাটকটির প্রদর্শনীতে মিলনায়তন প্রায় ভরা ছিল দর্শকে। পরদিন দ্বিতীয় প্রদর্শনীতেও উল্লেখযোগ্য দর্শক ছিলেন। দলের সমন্বয়ক মিশফাক রাসেল টেলিফোনে জানালেন, ‘অনেক দিনের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, শো করব শো করব। বরাদ্দ পাচ্ছিলাম না। করোনার কারণে দীর্ঘদিন হলও বন্ধ ছিল। হল খুললে অনেকটা দর্শক–সংকটের ঝুঁকি নিয়েই আমরা শো করি। সে অর্থে প্রচার, প্রচারণাও তেমন চালাতে পারিনি। দর্শকের উপস্থিতি আমাদের অবাক করেছে। ভাবতেও পারিনি এত দর্শক হবে। আসলে মানুষ মুখিয়ে ছিল কখন হল খুলবে।’