নজরুল সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা

জাতীয় নাট্যশালায় নজরুলজয়ন্তীতে ছিল সমবেত পরিবেশনা। ছবি: শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

বিভাজন নয়, সম্প্রীতি ও সাম্যের বাংলাদেশই ছিল নজরুলের স্বপ্ন—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা এমন অভিমত তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, মানবতা, ধর্মীয় সহনশীলতা ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে চেতনা নজরুল তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে ধারণ করেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে নজরুলের গান, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য ও তাঁর সাহিত্যভিত্তিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উঠে আসে নজরুলের বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির বহুমাত্রিক প্রকাশ।

গত শুক্রবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, ‘শৈশব-কৈশোরে নজরুলের কবিতা দ্বারা মনোজগতের গাঁথুনি তৈরি হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। যাঁরা কৈশোরে নজরুল পড়েন, তাঁদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগের চেতনা তৈরি হয়।’

জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ও সংগ্রামে নজরুলের চেতনা মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই ও আত্মত্যাগের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত। তিনি বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান, নজরুলের চেতনাকে ব্যক্তিগত চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় ও সমষ্টিগত চেতনায় রূপ দিতে। একই সঙ্গে আলোচকদের পক্ষ থেকে নজরুলজয়ন্তীকে ‘জাতীয় সম্প্রীতি দিবস’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাবকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, নজরুলের সমগ্র জীবন ও সৃষ্টিকর্মেই সম্প্রীতির চেতনা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রদূত মুশফিক ফজল আনসারী, কবি ও লেখক হাসান হাফিজ, নজরুল গবেষক খালেকুজ্জামান এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ। বক্তারা নজরুলের বহুমাত্রিক প্রতিভা, বিশেষ করে ফারসি ও আরবি সাহিত্য থেকে তাঁর অনুবাদকর্মের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলবে যত দিন, তত দিন নজরুল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। একই সঙ্গে কবির হারিয়ে যাওয়া গান, পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

জাতীয় নাট্যশালায় নজরুলজয়ন্তীতে ছিল সমবেত পরিবেশনা
ছবি: শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

তিন দিনের এ আয়োজনে সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে নজরুলের কালজয়ী সৃষ্টি। উদ্বোধনী দিনে ৫০ জন নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে সমবেত নৃত্য সৃষ্টি সুখের উল্লাসে পরিবেশিত হয়। নজরুলের দেশাত্মবোধক গান, কবিতা ও তাঁর নাটক অবলম্বনে নির্মিত নৃত্যনাট্যও পরিবেশিত হয় অনুষ্ঠানে।

নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন সুজিত মোস্তফা
ছবি: শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

শনিবার দ্বিতীয় দিনের আয়োজনেও ছিল কবির গান, কবিতা ও নৃত্যনাট্যের পরিবেশনা। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত এ পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল। মুখ্য আলোচক ছিলেন নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকীর হোসেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শিল্পকলা একাডেমির সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের পরিচালক মেহজাবীন রহমান।

আরও পড়ুন

সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও সৃজনীর শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন দাও শৌর্য, দাও ধৈর্য ও দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু। এরপর সাজু আহমেদের পরিচালনায় কত্থক নৃত্য সম্প্রদায় পরিবেশন করে সমবেত নৃত্য ‘চোখ গেলো চোখ-গেলো’। একক সংগীত পরিবেশন করেন শহীদ কবির পলাশ ও অগ্নিতা শিকদার মুগ্ধ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পরিবেশন করেন সমবেত সংগীত।

সংগীত পরিবেশন করেন নাশিদ কামাল
ছবি: শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

আইরিন পারভিনের পরিচালনায় ‘তুমি কি দখিনা পবন’ গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নাচঘর। পরে নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন সুজিত মোস্তফা, সেলিনা রহমান, পুষ্পিতা বণিক ও প্রিয়াংকা গোপ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন নজরুলসংগীত। ‘তোমার বিনা-তারের গীতি’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে আরাধনা। কবির বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করেন ইকবাল আহমেদ। এ ছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন মৃদুলা সমদ্দার ও নাশিদ কামাল। ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতা আবৃত্তি করেন ফারহানা তৃণা। সবশেষে দীপা খন্দকারের পরিচালনায় দীব্য সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিবেশন করে সমবেত নৃত্য ‘এসো হে সজল শ্যাম’।

সমবেত পরিবেশনা
ছবি: শিল্পকলা একাডেমির সৌজন্যে

আজ সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর। এদিনও নজরুলের সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যের সমন্বয়ে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব জেলা শিল্পকলা একাডেমিতেও জাতীয় কবিকে স্মরণ করে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।