জীবনে প্রথমবার আমাকে মানুষ গালি দিতে দেখবে

৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ঘুরে এলেন আশনা হাবিব ভাবনা। সেখানে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’। ২৩ এপ্রিল আইস্ক্রিনে মুক্তি পেয়েছে এই অভিনয়শিল্পীর ওয়েব সিরিজ ‘পাপ কাহিনী ২’–এর প্রথম পর্ব। মুক্তির অপেক্ষায় আছে একাধিক চলচ্চিত্র। গতকাল সোমবার তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন মনজুর কাদের

প্রথম আলো:

প্রথমবার সিনেমা নিয়ে বাইরের কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে গেলেন।

আশনা হাবিব ভাবনা : দারুণ অভিজ্ঞতা। বিশ্বের নামকরা সব চলচ্চিত্র সমালোচক, তারকা, প্রযোজক, পরিচালক ও কলাকুশলীদের সঙ্গে নিজের সিনেমা দেখাটা তো অন্য রকম আনন্দের। একজন শিল্পী কিন্তু সব সময় সীমানার বাইরে নিজেকে দেখে। বরাবরই শিল্পীর ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষাটা এ রকম। এই উৎসবে আমি আমার দেশকে নিয়ে গেছি, এটা অনেক বড় পাওয়া ছিল। কারণ, মস্কোতে এবার বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছি।

আশনা হাবিব ভাবনা
ছবি : শিল্পীর ফেসবুক থেকে
প্রথম আলো:

আপনাদের সিনেমাটা যাত্রাশিল্প নিয়ে, চরিত্রটির জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন?

আশনা হাবিব ভাবনা : আমার চরিত্রের নাম প্রিন্সেস রোজি, যার সঙ্গে ভাবনার কোনো মিল নেই—না শারীরিক গঠনে, না মানসিকভাবে। ওই জায়গা থেকে মানসিক লড়াই তো একটা ছিলই, কী করে আমি এই চরিত্রের মনস্তত্ত্বে ঢুকব। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আমাকে ৯ কেজি ওজন বাড়াতে হয়েছে। সেটা আমার জন্য ভয়ংকর শারীরিক চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, ওজন কমানো যেমন কষ্ট, বাড়ানোও ভয়ংকর কষ্ট। যাত্রাপালায় যেসব প্রিন্সেস দেখি, আমার কাছে যে ধারণা বা ইমেজ ছিল, যে চরিত্রের মতো আমি হতে চেয়েছিলাম, তাদের শারীরিক গঠন, আচরণ, অভিব্যক্তি রপ্ত করার জন্য চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। হয়তো মানুষ ভাবছে, ভাবনা মোটা হয়ে যাচ্ছে কেন? আমি কাউকে তা বোঝাতেও পারছিলাম না। অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমাকে জিরো ফিগার হতে হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে, শরীরকে তৈরি করতে চাই। আমি ক্ল্যাসিক্যাল ড্যান্সার। কিন্তু প্রিন্সেসদের নাচ একেবারেই আলাদা। সেসব নাচের ইউটিউব ভিডিও দেখেছি। যাত্রাপালাও দেখেছি। যাত্রাশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলেছি। এভাবেই নিজেকে তৈরি করি।

প্রথম আলো:

উৎসবে আর কোনো সিনেমা দেখলেন?

আশনা হাবিব ভাবনা : নিজের সিনেমা ছাড়া কারোরটাই দেখতে পারিনি। কানে যখন গিয়েছিলাম, তখন দেখার সুযোগ হয়েছিল। কারণ, সেখানে আমার সিনেমা ছিল না—অবসর ছিল, সিনেমা দেখতাম শুধু। এবারের উৎসবে আমার ছবি ছিল—তাই নানা ধরনের ব্যস্ততা ছিল। সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলন, সিনেমার প্রিমিয়ার—তাই অন্য সিনেমা দেখতে পারিনি। সব অনুষ্ঠানে নিজেকে তৈরি করার বিষয়ও ছিল। দেশে তো একটা অনুষ্ঠানে গেলে তৈরির পেছনে কয়েকজন থাকে। একজন সহকারীও থাকে; কিন্তু মস্কোতে আমি একা।

‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ সিনেমার উৎসবের পোস্টারে আশনা হাবিব ভাবনা
প্রথম আলো:

এখন কেবল উৎসবকেন্দ্রিক সিনেমাই করবেন নাকি মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমাও করবেন?

আশনা হাবিব ভাবনা : উৎসবকেন্দ্রিক সিনেমা আমি একদমই করতে চাই না। সিনেমা বলতে বুঝি গুড ফিল্ম অ্যান্ড ব্যাড ফিল্ম—বিশ্বব্যাপী এটাই প্রচলিত। এমন সিনেমা করতে চাই, যেটা আমার দেশের প্রান্তিক মানুষেরা তাদের কষ্টের টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আমাকে দেখার জন্য আসবে। আমার নাচ দেখবে, যখন তারা নিজেরাও নাচবে। আমার নাচ দেখে তারাও পাগল হয়ে যাবে। অবশ্যই আমি মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় কাজ করতে চাই। কারণ, সেখানে অনেক দর্শক। সমালোচকদের জন্যও কাজ করতে চাই। নিজেকে একটা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চাই না। মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমাতে দায়িত্বও অনেক বেশি। আমার প্রথম সিনেমা তা–ই। নাচ, গান সবই ছিল। আমি তাই নাচে–গানে ভরপুর সিনেমাও করতে চাই।

প্রথম আলো:

আপনার অভিনীত সিরিজ ‘পাপ কাহিনী ২’–এর দুটি পর্ব মুক্তি পেয়েছে। সিরিজটির প্রথম মৌসুম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনা ছিল। এটাতে কেন যুক্ত হলেন?

আশনা হাবিব ভাবনা : ‘পাপ কাহিনী’ প্রথম সিরিজ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না, সমালোচনা হয়েছে এখন জানতে পারলাম। আমি প্রথমে (শাহরিয়ার নাজিম) জয় ভাইকে বলে দিয়েছিলাম, আমি পর্দায় এটা এটা করব, এটা এটা করব না। আমার নিজের কিছু এথিকস ছিল, এটার সঙ্গে জয় ভাই একমত ছিলেন। আমার পর্বটা সবাই দেখলে বুঝতে পারবেন। আমার পর্বের নাম প্রতিশোধ। সম্পর্কে প্রতারিত হয়ে মেয়েদের আত্মহত্যার বিষয় আছে। গত রোববারও দেখলাম আমাদের একজন থিয়েটারকর্মী আত্মহত্যা করেছেন! আমার গল্পটাও অনেকটা এ রকম, তবে একটা মেয়ে যাতে কোনোভাবেই আত্মহত্যা না করে—এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই সিরিজের মধ্য দিয়ে আমি আমার সমাজের মেয়েদের এই বার্তাটা দিতে চাই। হয়তো ট্রেলারে মানুষের আগ্রহ তৈরির জন্য চমকপ্রদ সংলাপ বা এমন কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। তবে অন্য পর্বের সঙ্গে আমার পর্বের কোনো মিল নেই। এই পর্বটা দেখলে বুঝতে পারবে, এখানে অশ্লীলতা বলতে কিছু নেই। প্রতিশোধ কীভাবে নিতে পারব, সেটাই এখানে দেখানো হয়েছে।

‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ সিনেমার পোস্টারে আশনা হাবিব ভাবনা
প্রথম আলো:

এই সিরিজে তো অনেক অভিনয়শিল্পী, আপনার অভিনীত চরিত্রটির চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

আশনা হাবিব ভাবনা : চ্যালেঞ্জিং বলতে, জীবনে প্রথমবার আমাকে মানুষ গালি দিতে দেখবে। কখনো পর্দায় আমি কাউকে গালি দিয়ে কথা বলিনি। কিন্তু এই চরিত্রের জন্য কাজটা করতে হয়েছে। কারণ, দরকারও ছিল। পর্বটা দেখলে সবাই বুঝতে পারবে, কেন এই চরিত্রটা গালি দিয়ে কথা বলছে। এ রকম একটা মেয়ের চরিত্র করা, যে কিনা একজন সুপারস্টারের স্ত্রী, যার স্বামী পরকীয়া সম্পর্কে জড়ায়। সিরিজে আমি একজন গৃহিণী। ব্যক্তিগত জীবনে তো আমি একজন সুপারস্টার, তাই না। (হাসি) একজন সাধারণ গৃহিণী কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটা তো আমার জন্য অবশ্যই ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল।

প্রথম আলো :

বেশ কয়েকটি সিনেমা করেছেন। কোনোটি মুক্তি পায়নি। কোনো সিনেমা মুক্তির খবর আছে?

আশনা হাবিব ভাবনা : আমি কয়েকটায় কাজ করেছি; কিন্তু সিনেমা মুক্তির বিষয়টি আমার হাতে নেই, তাই বলতে পারছি না।