এতটা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি

মুক্তির চতুর্থ সপ্তাহেও দেশের প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আগ্রহ ধরে রেখেছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। দেশের বাইরেও ছবিটির দর্শক সাড়া বেশ ভালো। ছবিটি নিয়ে গত শুক্রবার প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন পরিচালক ও প্রযোজক তানিম নূর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের

প্রথম আলো:

‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর এই সাফল্য প্রত্যাশিত ছিল?

তানিম নূর : সত্যি বলতে, ‘উৎসব’–এর সাফল্যের পর বুকের কোণে একধরনের আশা তো ছিলই যে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-ও দর্শক গ্রহণ করবেন। কিন্তু সেই গ্রহণযোগ্যতার পরিসর এতই বিশাল হবে যে মুক্তির তৃতীয় সপ্তাহে এসেও মাল্টিপ্লেক্সের দর্শক টিকিট পাবেন না কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির প্রথম সপ্তাহে আমাদের সিনেমা ওখানকার বক্স অফিসে ১৬তম অবস্থানে পৌঁছে ইতিহাস সৃষ্টি করবে—এতটা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।

প্রথম আলো :

উপন্যাস থেকে সারা পৃথিবীতে সিনেমা নির্মাণের চল থাকলেও ইদানীং বাংলাদেশে সেভাবে দেখা যায় না। আপনার শেষ দুই সিনেমা সাহিত্যনির্ভর। ঝুঁকি মনে হয়নি?

তানিম নূর : একদমই না। সাহিত্যনির্ভর ‘দ্য গডফাদার’ কি ব্লকবাস্টার সিনেমা ছিল না? ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর মতো যুগান্তকারী চলচ্চিত্রও তো চেতন ভগতের বই অবলম্বনে নির্মিত, যা অন্য দেশের মানুষ ভালোবাসেন, তা আমাদের দেশের মানুষ গ্রহণ করবেন না কেন? সাহিত্যনির্ভর গল্পে সিনেমা নির্মাণ চলচ্চিত্র আবিষ্কারের শুরু থেকেই হয়ে আসছে। ফলে এ ক্ষেত্রে আমি একদমই ঝুঁকি নিচ্ছি বলে মনে হয়নি। আমি কোনো কিছুর উদ্ভাবক নই। জনপ্রিয় ব্যান্ডের গান সিনেমায় ব্যবহার করা কিংবা সাহিত্য অবলম্বনে চিত্রনাট্য লেখা—এসব আমার চলচ্চিত্রের গুরুরা হামেশাই করে এসেছেন; তা আপনি মার্টিন স্করসেজির কথা বলেন কিংবা স্ট্যানলি কুব্রিকের। আমি তাঁদের অতি দুর্বল শিষ্য হিসেবে চেষ্টা করে যাচ্ছি মাত্র।

তানিম নূর। ছবি: পরিচালকের সৌজন্যে
প্রথম আলো:

‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর সঙ্গে মানুষ নিজেদের কেন সম্পৃক্ত করতে পেরেছে?

তানিম নূর : এটার সবচেয়ে ভালো উত্তর তো দর্শকেরাই দিতে পারবেন। তবে আমাদের ছবির ট্যাগলাইন ছিল, ১০০% খাঁটি বাংলাদেশি ছায়াছবি। আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটিই কাজ করেছে। এটি আপাদমস্তক একটি দেশি ছবি, এর গল্পটা আমাদের গল্প, এর চরিত্রগুলো পরিচিত। দর্শকেরাও তাই খুব সহজেই সিনেমাটি আপন করে নিতে পেরেছেন হয়তো।

প্রথম আলো :

দুই সিনেমায় আপনার নিজের বিনিয়োগ আছে। ভবিষ্যতে পরিচালনা করবেন না, এমন সিনেমাও কি প্রযোজনা করবেন?

তানিম নূর : অবশ্যই। নিজের বিনিয়োগে সিনেমা বানানোর দুঃসাহস তো এ কারণেই করেছিলাম, যাতে ভবিষ্যতে আমাদের নতুন ও সম্ভাবনাময় সব নির্মাতা এবং আমার সমসাময়িক যাঁরা সহকর্মী আছেন, তাঁদের সিনেমায় প্রযোজকের ভূমিকায় থাকতে পারি। উৎসব টিপিক্যাল বাণিজ্যিক ফর্মুলার বাইরের ছবি ছিল বলেই সহজে কেউ তাতে অর্থলগ্নি করতে চাইছিলেন না। এ রকম ফর্মুলার বাইরের কোনো গল্প, যেটার কিনা আবার বাণিজ্যিক সফলতার সম্ভাবনাও প্রবল, এমন সব চলচ্চিত্রের ঠিকানা হিসেবেই আমাদের প্রযোজনা সংস্থা ‘বুড়িগঙ্গা টকিজ’-এর জন্ম।দুই সিনেমায় আপনার নিজের বিনিয়োগ আছে। ভবিষ্যতে পরিচালনা করবেন না, এমন সিনেমাও কি প্রযোজনা করবেন?

প্রথম আলো:

আপনার দুই সিনেমাতেই অনেক তারকা। সবার জন্য যথোপযুক্ত চরিত্র নির্মাণ করা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

তানিম নূর : নির্মাণের প্রথম ধাপে সবার আগে চিত্রনাট্য ও চরিত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকি আমরা। এ ক্ষেত্রে আমার নিয়মিত দুই চিত্রনাট্যকার—আয়মান আসিব ও সামিউল ভূঁইয়া এবং আমার প্রধান সহকারী পরিচালক সুস্ময় সরকারের ওপর আমি পুরোপুরি আস্থা রাখি। ওরা নিশ্চিত করে, প্রত্যেকটি চরিত্রই যেন গল্পের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়। কাজেই পরবর্তী সময়ে সেসব চরিত্রে তারকা অভিনেতাদের প্রস্তাব দেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।

প্রথম আলো:

দুটি আলোচিত সিনেমাই পরিবারকেন্দ্রিক। সামনে কি অন্যান্য ঘরানার সিনেমা বানাবেন?

তানিম নূর : দিন শেষে সৃজনশীল কাজ করে যেতে হলে একজন শিল্পীর আত্মতৃপ্তির ব্যাপারেও নজর রাখা দরকারি। পরপর দুটি সামাজিক ঘরানার পরিবারকেন্দ্রিক সিনেমা সফল হয়েছে বলে কেবল সেই একই ঘরানার কাজ করে যাব, তা হতে পারে না। আমি মনে করি, সব ধরনের ছবিরই দর্শক আমাদের আছে। শুধু নিজের কাজের প্রতি সৎ থেকে সুনির্মাণের চেষ্টা করে গেলেই দর্শকদের হলে আনা সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে আমি থ্রিলার, ড্রামা, ক্রাইম, এমনকি হরর ঘরানার ছবিও বানাতে চাই।

প্রথম আলো :

পরপর দুই ঈদে আপনার দুই সিনেমা আলোচিত হলো। পরের কাজের জন্য এটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

তানিম নূর : আমি ওভাবে ভাবিই না। আমি নিজেও সাধারণ দর্শকদের কাতারে পড়ি। আমার যেটা সিনেমা হলে দেখতে ভালো লাগে, আমি তেমন সিনেমাই বানাতে চাই। দর্শকের প্রত্যাশা আর আমার নিজের প্রত্যাশা এ ক্ষেত্রে একই সমান্তরালে থাকে বলে আমার বিশ্বাস। আমি শুধু নিজের পছন্দের গল্পগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকব। আর আশা করে যাব, দর্শকও হয়তো সেসব পছন্দ করবেন।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

পরের সিনেমার পরিকল্পনা কি শুরু করেছেন?

তানিম নূর : এখনই কিছু বলতে চাইছি না। তবে হ্যাঁ, পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে। আমি খুব করে চাই, আগামী বছরেই বুড়িগঙ্গা টকিজের নতুন সিনেমা মুক্তি পাক। আর সেখানে আমার ভূমিকা পরিচালক হিসেবে না থাকলেও প্রযোজক হিসেবে থাকবে—এতটুকু নিশ্চিত।