কমবেশি সবাই প্রেশারে আছে; কিন্তু কিছুই মুখ ফুটে বলছে না
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণদিবস উপলক্ষে এটিএন বাংলায় রাত ১০টা ৫০ মিনিটে দেখানো হবে গানের অনুষ্ঠান ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’। গান ও গানের পেছনের গল্প নিয়ে তৈরি এই অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা ও সঞ্চালনা করেছেন নজরুলসংগীতশিল্পী তানভীর আলম সজীব। অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা হলো তাঁর সঙ্গে
প্রশ্ন :
কোথায় আছেন?
একটি স্টুডিওতে। গায়ক ও সংগীত পরিচালক পিন্টু ঘোষ নতুন একজন গায়কের গান কম্পোজ করছে, ওই গানের বেজ রেকর্ডের কাজ করছি।
প্রশ্ন :
অন্যের গান তৈরির কথা বললেন। নিজের গানের খবর বলুন।
(হাসি)...আমি একটা গানের কাজ করছি ছয় মাস ধরে। সেটার অডিও রেকর্ড হয়ে গেছে। এই খবর সবাইকে একটু বড় করে জানাতে চাই।
প্রশ্ন :
কেন?
এ ধরনের গান আগে কখনোই করিনি। শিরোনাম দিয়েছি ‘চাপ নাই’। গানের কথা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে করেছি।
প্রশ্ন :
হঠাৎ এমন কথার গান কেন করলেন?
আমার মনে হয়, কমবেশি সবাই প্রেশারে আছে; কিন্তু কিছুই মুখ ফুটে বলছে না। সবাই মেনে নিচ্ছে। নাথিং পলিটিক্যাল, এটা সবারই মনের কথা। গানের কথা ও সুর করা আমারই। আমি নিজেও অনেক চাপে আছি, তাই ‘চাপ নাই’ শিরোনামে গান করেছি।
প্রশ্ন :
কোন ধরনের চাপে আছেন?
সব ধরনের চাপে আছি। গানই যেহেতু আমার অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, তাই এখন যে ধরনের চাপ অনুভব করছি, আধুনিক উপায়ে লেখা ও সুরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। চিৎকার করতে না পারি, গানে গানে তো কিছু বলতে পারি। অনেক যে চাপে আছি, কাউকে বলার চেয়ে নিজে গানে গানে বলাটাই ভালো।
প্রশ্ন :
চাপমুক্ত ছিলেন কবে?
কখনোই চাপমুক্ত ছিলাম না। মনে হয়, যত দিন বোঝার মতো ক্ষমতা হয়নি, শুধু তত দিনই।
প্রশ্ন :
চাপমুক্ত হতে পারবেন কবে?
কবে যে হতে পারব, এটা বলা মুশকিল। তবে মরে গেলে হয়তো চাপমুক্ত হতে পারব।
প্রশ্ন :
‘চাপ নাই’ গানটি আসবে কবে?
দেখি, সুবিধাজনক সময় দেখে ছাড়ব। এই গানের ভিডিওর শুটিং করছি। গানের একটা অংশে র্যাপও করেছি। আমিই করেছি। অনেকের সঙ্গে গানের ভিডিও নিয়ে কথা হয়েছে, যাদের সঙ্গে ভিডিওর কনসেপ্ট নিয়ে কথা বলছি, তারা গানের দৈর্ঘ্য ছোট করার কথা বলেছে। আমার গানটা পাঁচ মিনিটের। তারা বলেছে, এত বড় গান কেউ শুনবে না। আমি বলেছি, যারা শোনার, তারা ঠিকই শুনবে। এটাও ঠিক, দেশের সবাই তো আর আমার গান শুনবে না। এটা সম্ভবও নয়। আমি মনে করি, যারাই রিলেট করতে পারবে, শুধু তারাই শুনবে। আমরা তিন ঘণ্টার সিনেমা দেখি না! আমি তো টিকটকারদের সঙ্গে কমপিটিশন করব না।
প্রশ্ন :
গানের দৈর্ঘ্য ছোট করার একটা প্রবণতা এখন অনেকেরই দেখা যায়?
মানুষের ধৈর্য নেই, সময় নেই। সবাই অস্থির, সবাই দৌড়াচ্ছে। আমরা বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখতে পাই, কনটেন্ট ওয়াইজ আমরা মানুষকে এক মিনিটের বেশি আটকে রাখতে পারি না। কিন্তু আমি মনে করি, ভালো গান হলে অবশ্যই মানুষ শুনবে। মানুষ যদি কথার সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারে, তাহলে গান শুনবেই। আমি যদি এখন সমানে নজরুলসংগীত নজরুলের স্টাইলে হারমোনিয়াম ও তবলা দিয়ে করতে থাকি, কেউ তা শুনবে না। এটাই বাস্তবতা।
প্রশ্ন :
কেন এমনটা মনে হলো আপনার?
এখন শ্রোতারা যেভাবে শুনে অভ্যস্ত, সেই সময়টার কথাও তো মনে রাখতে হবে। শুধু হারমোনিয়াম ও তবলা দিয়ে নজরুলের গান তো সবাইকে শোনানো যাচ্ছে না। তাই এটা আমাদের ব্যর্থতা। যাঁরা বলছেন, আধুনিকতার নামে নজরুলের গানের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছি আমরা, তাঁদের উচিত তাহলে আইন করে ঠিক করে দেওয়া। এটা তো ঠিক, মানুষকে নজরুলের গান শোনাতে হবে। ভারতে বিভিন্ন রকমের এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে, অথচ আমাদের এখানে সেভাবে করা যাচ্ছে না। আমি বলব, তাহলে আইন করে দিক, নজরুলের গান শুধু হারমোনিয়াম ও তবলা দিয়েই গাইতে হবে। হারমোনিয়াম ও তবলা দিয়ে যত ধরনের কনটেমপোরারি বিষয় দেখাতে পারো, দেখাও। অন্য কোনো ইনস্ট্রুমেন্টে নজরুলের গানে ব্যবহার করা যাবে না!
প্রশ্ন :
এই সময়ে নজরুলসংগীতের উপস্থাপন কী রকম করলে শ্রোতারা শুনতে আগ্রহী হবেন বলে আপনি মনে করেন?
কাজী নজরুল ইসলাম তো ভার্সেটাইল। আমি মনে করি, কথা ও সুর ঠিক রেখে যদি নজরুলসংগীতের সংগীতায়োজনের আধুনিক উপস্থাপন হতো, তিনি মাইন্ড করতেন না। কে কী কম্পোজিশন করছে, তাতে নজরুলের কিছুই আসত–যেত না। আমি যখন আধুনিক সংগীতায়োজনে ‘মন উচাটন’ অ্যালবাম করেছি, সবার ভালোও লেগেছে। কারণ, আমি সমসাময়িক স্টাইলে গানগুলো করেছি, শুধু হারমোনিয়াম ও তবলায় রাখিনি। এটার কারণে অবশ্য আমাকে অনেক সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল, এখনো হয়। এই কারণে এখনো আমার অনেক শত্রু। আমি মনে করতাম, সবাই আমাকে ভালোবাসে, আসলে তা নয়।
প্রশ্ন :
আপনি কি তবে দমে যাবেন?
টেলিভিশনেও নজরুলসংগীতের নতুন সংগীতায়োজনে কিছু গান করেছি। সবাই পছন্দ করেছে। তাই বলতে পারি, নতুন সংগীতায়োজনে নজরুলসংগীতের উপস্থাপনে কখনোই দমে থাকিনি, থাকবেও না। ট্র্যাডিশনাল বিষয়টা বজায় রেখে নতুন কিছুর সঙ্গে শ্রোতাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি, করবও। নতুন কিছু শিখে তবেই আমি তা প্রয়োগ করেছি। তবে এখনকার ছেলেমেয়ে, যারা গান করছে, তাদেরও আরেকটু শিক্ষিত হতে হবে। নজরুলের গান মানে সব জায়গায় কিন্তু লাফালাফি করা নয়। কথা ও সুরের মূল ভাবটা বজায় রেখে তবেই সংগীতায়োজন করতে হবে। পাঁচ–ছয় দিন লিড ও বেজ গিটার শিখলাম, চার দিন ড্রামস শিখলাম, তারপর মনে করলাম, আমি সবই পারি। তারপর আমি সব গানের সঙ্গে পিটাতে থাকলাম, তাহলে তো হবে না। সবকিছু শিখে তারপর সংগীতায়োজনে নামতে হবে।
প্রশ্ন :
আপনি তো নজরুলসংগীতের নতুন সংগীতায়োজনে কাজ করেছিলেন। কমিয়ে দিলেন কেন?
আমি কমিয়ে দিইনি, কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা আমাকে থ্রেট মনে করেছে, তারা আমার এসব অনুষ্ঠান কমিয়ে দিয়েছে। কানাডা থেকে আমি তো কারও থ্রেট হতে বাংলাদেশে আসিনি। সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে চেয়েছি। এখন আমাকে যদি পৃষ্ঠপোষকেরা থ্রেট মনে করে বা আমার বিরুদ্ধে যদি অনেকের কান ভারী করা হয়, তাতে আসলে কোনো লাভ নেই। আমি নজরুলসংগীত নিয়ে আবার নামতে চাই, নিজের গানও নিয়ে কাজ শুরু করতে চাই। কারণ, আমার নিজের লেখা আড়াই শ গান জমে আছে।
প্রশ্ন :
দেশে নজরুলসংগীতের চর্চা কেমন হচ্ছে?
ভালোই হচ্ছে। সবই ইতিবাচক। শুধু উপস্থাপনের বিষয়টা যখন আসে, কেন জানি একই রকমভাবে উপস্থাপন করতে চাই। নজরুল সংগীত নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। নজরুলগীতির ধারক ও বাহক কিন্তু কেউ নয়। যাঁরাই শিল্পী, তাঁরা নজরুলের গানের ধারক ও বাহক। এখানে কেউ কাউকে কর্তৃত্ব করতে আসেনি কিন্তু। গানবাজনায় কর্তৃত্ব করাটা বাঞ্ছনীয়ও নয়। গানবাজনা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, উপলব্ধির বিষয়। তাই আমি বলতে চাই, নজরুলসংগীতকে অন্যভাবেও উপস্থাপন করা যায়, মনকে প্রসারিত করে একবার শুনে দেখুন না প্লিজ। সেভাবে করতে দেওয়ার সুযোগটা যেভাবে হওয়া দরকার, হচ্ছে না।
প্রশ্ন :
‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলুন।
৪০ মিনিটের এই অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে ছিল প্রিয়াংকা গোপ ও সুকন্যা। সঞ্চালনার পাশাপাশি আমাকে গাইতেও হয়েছে। তিনজন মিলে প্রচলিত ও অপ্রলিত নয়টি গান করেছি। ফাঁকে ফাঁকে গান তৈরির পেছনের গল্প নিয়েও কথা বলেছি। এটিএন বাংলা অনুষ্ঠানটির ক্ষেত্রে আমাকে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছে, আমিও আনন্দ নিয়ে কাজ করেছি।