‘ মৃত্যুকে জয় করা সেই সময়ের আবেগটা বোঝার চেষ্টা করেছি’

স্টার সিনেপ্লেক্সে সর্বোচ্চ শো পেয়েছে ‘দম’। সিনেমাটি নিয়ে গত সোমবার সন্ধ্যায় প্রথম আলো কার্যালয়ে আড্ডা দিলেন অভিনেতা আফরান নিশো, নির্মাতা রেদওয়ান রনি, প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল ও অভিনেত্রী পূজা চেরী। সূত্রধর ছিলেন মকফুল হোসেন

প্রথম আলো:

[আফরান নিশোকে উদ্দেশ করে] ‘দম’–এ আপনার অভিনয়কে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ বলেছেন চঞ্চল চৌধুরী।

আফরান নিশো: এটা আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। যিনি নিজে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’, তাঁর মুখ থেকে আউটস্ট্যান্ডিং শোনা আসলে সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমরা যারা খুবই গ্রাউন্ডেড থেকে চরিত্রগুলোকে ধারণ করার চেষ্টা করি, খুবই সাধারণ চরিত্রগুলোকে পোর্ট্রে (ফুটিয়ে তুলি) করার চেষ্টা করি, তারা কেন জানি ইনারলি কানেক্টেড (ভেতর থেকে যুক্ত)। প্রসেসটা হয়তো ইনডিভিজ্যুয়াল ওয়াইজ ডিফারেন্ট থাকে। কিন্তু চরিত্র ধারণ করার প্রসেসটা একই রকম। ওই জায়গা থেকে চঞ্চল ভাই খুব সাধারণ চরিত্রগুলো পোর্ট্রে করে অভ্যস্ত। তিনি খুব পাওয়ারফুল অভিনেতা। তিনি যখন আমার পারফরম্যান্সকে বা আমার চেষ্টাকে বা আমাদের টিমের চেষ্টাটাকে আউটস্ট্যান্ডিং বলেন, এটা অনেক বড় পাওয়া।

প্রথম আলো কার্যালয়ে আফরান নিশো
ছবি: মীর হোসেন
আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

পর্দায় আপনাকে নূর চরিত্রে দেখা গেছে। বাস্তবের নূর ইসলামের কাছ থেকে কী নিলেন?

আফরান নিশো: যদিও আমরা সত্য ঘটনা অবলম্বনে বলি, কিন্তু ইটস নট আ বায়োপিক। রিয়েল স্টোরিটাকে মাথায় নিয়ে ফিকশনালাইজ করা, আবার নন–ফিকশনালাইজ অ্যাঙ্গেল থেকেও ব্লেন্ডিং করা হয়েছে। আমি রিয়েল চরিত্রের ভেতরের অনুভূতিটা ধরার চেষ্টা করছি। মৃত্যুকে জয় করা সেই সময়ের আবেগটা বোঝার চেষ্টা করেছি। উনি একদমে গল্প বলে দিতে পারেন। একই সময় গল্প বলতে গিয়ে রাগে ফেটে পড়েন, ক্রোধ জন্মান। আবার বাচ্চাদের মতো ইমোশনাল হয়ে কেঁদেও ফেলেন। হিমসেলফ ভেরি ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। সেই ট্রমা হয়তোবা এখনো উতরাতে পারেননি। নূর ভাইয়ের বাহ্যিক গঠন কেমন বা কথা বলেন কীভাবে, সেটার চেয়ে আমার কাছে মূল লক্ষ্য ছিল, তাঁর ইনার সাইকোলজিটা ধারণ করা। ভেতরের অবস্থাটা যদি আমি বুঝতে না পারি, তাহলে চরিত্রটা করা কঠিন। আমার টার্গেটটা ছিল এখানে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে খুব দমদার মানুষ। তিনি পারসোনালি খুবই ইন্টারেস্টিং এবং হিপনটাইজিং ক্যারেক্টার মনে হয়।

যদিও আমরা সত্য ঘটনা অবলম্বনে বলি, কিন্তু ইটস নট আ বায়োপিক। রিয়েল স্টোরিটাকে মাথায় নিয়ে ফিকশনালাইজ করা, আবার নন–ফিকশনালাইজ অ্যাঙ্গেল থেকেও ব্লেন্ডিং করা হয়েছে। আমি রিয়েল চরিত্রের ভেতরের অনুভূতিটা ধরার চেষ্টা করছি। মৃত্যুকে জয় করা সেই সময়ের আবেগটা বোঝার চেষ্টা করেছি।
আফরান নিশো
আড্ডার ফাঁকে দম টিম—(বাঁ থেকে) আফরান নিশো, রেদওয়ান রনি, শাহরিয়ার শাকিল ও পূজা চেরী
ছবি: মীর হোসেন
প্রথম আলো:

এক দশক পর রেদওয়ান রনির ফেরা নিয়ে অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘হোয়াট আ কামব্যাক।’

রেদওয়ান রনি: প্রথমে যে জিনিসটা চিন্তায় ছিল, দর্শক কানেক্ট করতে পারছে কি না, ছোট ছোট ডিটেইলগুলো বুঝতে পারছে কি না, দেশাত্মবোধকে কানেক্ট করতে পারছে কি না, এটা যে সাধারণ বাংলাদেশির জয়ের গল্প—এটা বুঝতে পারছে কি না। দর্শকের সঙ্গে সিনেমাটি দেখে বুঝেছি, সবাই একটা সিঙ্গেল জিনিস কানেক্ট করছে, এটা বাংলাদেশের জয়ের গল্প। বাংলাদেশের জয়ের গল্পের সঙ্গে যদি আমার কামব্যাকটা হয়, এটাই হচ্ছে আমার জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। সময় বলে দেবে এই সিনেমা কত দিন সাস্টেইন (টিকবে) করবে। এই সিনেমা আদৌ কাল্ট হবে নাকি ঝরে পড়ে যাবে, এটা সময়ই নির্ধারণ করবে। কিন্তু আপাতত আমার ভালো লাগছে যে দর্শক ওটা বুঝতে পারছে।

দর্শকের সঙ্গে সিনেমাটি দেখে বুঝেছি, সবাই একটা সিঙ্গেল জিনিস কানেক্ট করছে, এটা বাংলাদেশের জয়ের গল্প। বাংলাদেশের জয়ের গল্পের সঙ্গে যদি আমার কামব্যাকটা হয়, এটাই হচ্ছে আমার জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়।
প্রথম আলো:

এক দশক পর ফেরার জন্য এই গল্পটাকে বাছলেন কেন?

রেদওয়ান রনি: প্রথম আলোর ঈদসংখ্যা আমার গ্রামের বাড়িতে বসে পড়ছিলাম। অদ্ভুতভাবে গল্পটা পড়তে পড়তে আমার চোখে পানি চলে আসে। তখন আমার মাথায় অন্য গল্প ছিল। আমি বাদ দিয়ে আসলে এই ক্যারেক্টারের (নূর) প্রতি খুব অবসেসড হই। তখন মনে হয়, এটাই হচ্ছে ওই গল্প, যে গল্পটা আসলে বলতে চাই। পরে ওনাকে (নূর ইসলাম) মিট করি। ওনার সঙ্গে অনেক কনভারসেশন হয়, ওখান থেকে পরের ধাপগুলো এগিয়ে নিই।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

স্টার সিনেপ্লেক্সে সর্বোচ্চ শো পেয়েছে ‘দম’।

শাহরিয়ার শাকিল: তিন–চার বছর আগে যে দর্শক পেয়েছিলাম, সেই দর্শক কিন্তু এখন অনেক পরিপক্ব। আমরা দেখেছি, যেকোনো সিনেমার যদি প্রোডাকশন ভ্যালু ঠিক না থাকে, গল্প ঠিক না থাকে, তাহলে দর্শক রিজেক্ট করে দেয়। এ গল্পটা একটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে সারভাইভাল স্টোরি। এটাকে সিনেমা বানাতে হলে কিন্তু এন্টারটেইনিং করে তৈরি করতে হবে, যাতে দর্শককে প্রথম সিন থেকে শেষ সিন পর্যন্ত বসিয়ে রাখতে পারি। রনি ভাই যখন প্রথম গল্পটা বলেন, ওইটাই একটা টেনশন ছিল, গল্পটা মানে একটা ফেজের পরে আরেকটা ফেজ যখন আসবে, দর্শককে কীভাবে সেটার সঙ্গে কানেক্ট করানো সম্ভব হবে। সেই জায়গাটা রনি ভাই সাকসেসফুলি করেছেন। কারণ, গত তিন দিনে যে দর্শক সাড়া পাচ্ছি, তাতে আমি একটা নেগেটিভ রিভিউ দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা, এটা দেশপ্রেমের গল্প হিসেবে তৈরি হয়ে এসেছে। ঈদ মার্চ মাসে পড়েছে এবং আমরা ঈদও পেলাম, স্বাধীনতার মাসটাও পেলাম। এ দুটি বিষয় এই সিনেমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

আমি সব সময় বলি, দম আমার জন্য একটা সিনেমা নয়; দম আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। কারণ, আমি চেয়েছিলাম, আমার লাইফে একটা ভালো কাজ অ্যাটলিস্ট আসুক। সিরিয়াসলি আই ওয়াজ সার্চিং ফর গুড মুভি। দম আমার পারসোনাল লাইফকে চেঞ্জ করে দিয়েছে। আমার পারসোনালিটিকে চেঞ্জ করে দিয়েছে, আমার ক্যারিয়ারটাও চেঞ্জ করে দিয়েছে।
পূজা চেরী
‘দম’ সিনেমায় রানি চরিত্রে অভিনয় করেছেন পূজা চেরী
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে
প্রথম আলো:

[পূজা চেরীকে উদ্দেশ করে] বলা হচ্ছে, রানি চরিত্রের মধ্য দিয়ে আপনার পুনর্জন্ম হলো। আপনি কি সেটা বিশ্বাস করেন?

পূজা চেরী: হ্যাঁ। অবশ্যই বিশ্বাস করি। আমি সব সময় বলি, দম আমার জন্য একটা সিনেমা নয়; দম আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। কারণ, আমি চেয়েছিলাম, আমার লাইফে একটা ভালো কাজ অ্যাটলিস্ট আসুক। সিরিয়াসলি আই ওয়াজ সার্চিং ফর গুড মুভি। দম আমার পারসোনাল লাইফকে চেঞ্জ করে দিয়েছে। আমার পারসোনালিটিকে চেঞ্জ করে দিয়েছে, আমার ক্যারিয়ারটাও চেঞ্জ করে দিয়েছে। যেটা আসলে আমার খুব দরকার ছিল। মাঝখানে হোপলেস হয়ে গিয়েছিলাম, আমার মা মারা গেলেন। সবকিছু মিলিয়ে অনেক ডাউন ছিলাম। দম আমার লাইফে অনেক চেঞ্জ নিয়ে এসেছে।

প্রথম আলো:

পরবর্তী কাজ নির্বাচনের জন্য একটু চাপ তো তৈরি হলো।

পূজা চেরী: হ্যাঁ, এটা তো একটা আছে। অনেক বড় একটা দায়িত্ব কাঁধে চলে এসেছে। নিজের মানমর্যাদা ধরে রাখার জন্য আসলে সিলেক্টিভ হয়ে যেতে হবে। বছরে পাঁচ–ছয়টা কাজ না করে, একটাই যদি করা যায়, সেটাই আমার জন্য এনাফ। সেই একটা কাজে যদি না আসে, তাহলে কোনো কাজই করার দরকার নেই। এ জিনিসটাই আসলে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

আরও পড়ুন
আড্ডার ফাঁকে দম টিম
মীর হোসেন
প্রথম আলো:

দেশের বাইরে মুক্তির বিষয়ে কী ভাবছেন?

শাহরিয়ার শাকিল: অন্যান্য সিনেমার ক্ষেত্রে যে ধরনের রেসপন্স পাই, এবার সেটার চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছি। ধুরন্ধর টু যারা ডিস্ট্রিবিউট করেছে, তারা আমাদের দম ডিস্ট্রিবিউট করছে ইন্টারন্যাশনালি। আগের বারের চেয়ে এবার আমরা আরও বেশি আশাবাদী।

রেদওয়ান রনি: ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে প্রফেশনালি সিনেমা কিন্তু আমাদের একটু কম যায়। বাঙালি কমিউনিটির বাইরে ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্সকে যদি আমরা ডিস্ট্রিবিউশনের মাধ্যমে যুক্ত করতে পারি, তাহলে কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটা বড় ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কমিউনিটি বেজড স্ক্রিনিং বড় মার্কেট; কিন্তু এখান থেকে বের হয়ে অন্যান্য দেশের সিনেমা, যে রকম কোরিয়ান সিনেমা ওয়ার্ল্ডওয়াইড কিন্তু ডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছে। ইন্ডিয়ান সিনেমা মেইনস্ট্রিম মার্কেটে ডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছে। নেপালের সিনেমা অনেক সময় হয়।

বাংলাদেশের সিনেমার এই সম্ভাবনাটা অনেক দিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এটাকে প্রপার ওই জায়গায় মেকিং করে মানে কেউ দেখলে যেন মনে না করে, এটা ওয়ার্ল্ড সিনেমার বাইরের কোনো সিনেমা। আমাদের টিজার ট্রেলার প্রকাশের সময় থেকেই ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিবিউটররা যোগাযোগ শুরু করছে। ইনফ্যাক্ট সিনেমা রিলিজের আগেই বড় বড় ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে আলোচনা হয়ে গেছে। আমরা খুব আশাবাদী।