‘ইচ্ছা করেই এমন প্রশ্ন রাখা হয়, যেগুলো বিব্রতকর’

কখনো সুগন্ধি কারখানার রহস্যময়ী নারী, কখনো রাখালি, কখনো জেলবন্দী বিপ্লবী; কখনো আবার যৌনপল্লির বিশাখা। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত বনলতা সেন–এ নানা রূপে হাজির হয়েছেন মাসুমা রহমান নাবিলা। তাঁর অভিনয়–ভাবনা, চরিত্রের প্রস্তুতি ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছে নাজমুল হক

প্রথম আলো:

‘আয়নাবাজি’, ‘তুফান’ থেকে ‘বনলতা সেন’...

মাসুমা রহমান নাবিলা: এখন ফিরে তাকালে মনে হয় কম কাজ করলেও আমি অনেক ভাগ্যবান। কারণ, এই তিনটি সিনেমার কোনোটিই এমন হয়নি যে এল আর চলে গেল, দর্শকেরা টের পেল না। আমার বিশ্বাস, যখনই বাংলা সিনেমার কথা উঠবে, এই তিনটা সিনেমার নাম আসবে। মনে হয়, এই কাজগুলো দিয়ে মানুষ আমাকে অনেক দিন মনে রাখবে।

প্রথম আলো:

আরও কিছু সিনেমা ক্যারিয়ারে যোগ হতে পারত, এমন কোনো আক্ষেপ আছে?

মাসুমা রহমান নাবিলা: প্রথম প্রথম কষ্ট দিত, এখন দেয় না। যার ভাগ্যে যতটুকু লেখা আছে, তা মেনে নিতে হয়। মাঝেমধ্যে অন্য সিনেমা দেখে মনে হয়েছে, আমি যদি এই সিনেমার অংশ হতাম! কিন্তু আমার সিনেমাগুলো দেখেও হয়তো অনেকের এমন মনে হতে পারে (হাসি)। একসময় মনে হয়েছে আমি হয়তো ‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড’ হয়ে যাচ্ছি, মানুষ আমাকে ভুলতে বসেছে। কিন্তু এখন এই কাজগুলো দিয়ে আবার মানুষের মনে জায়গা হচ্ছে। এখন আর আমি খুব বেশি আশা করি না, কারণ বেশি আশা করলেই হতাশা আসে।

প্রথম আলো:

‘মিডিয়া পলিটিকস’ নিয়ে প্রায়ই কথা শোনা যায়...

মাসুমা রহমান নাবিলা: ব্যক্তিগতভাবে কখনো পলিটিকসের শিকার হইনি, তবে ইন্ডাস্ট্রিতে ফেবারিটিজম বা দলবাজি আছে—এটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যাদের নির্দিষ্ট গ্রুপের সঙ্গে ওঠাবসা বা লিয়াজোঁ আছে, তারা কাজ বেশি পায়। একজন পরিচালক আমাকে বলেছিলেন যে আমাকে নাকি দেখা যায় না। আসলে কোনো ফরমাল আমন্ত্রণ ছাড়া যাওয়া হয় না। আমার ছোট্ট মেয়ে আছে, তাই হুটহাট কোথাও আড্ডা বা মিটিংয়ে যেতে পারি না। ফলে যারা সব সময় চোখের সামনে থাকে, তাদের কথাই নির্মাতাদের আগে মনে আসে। এটাকে অনেকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ‘কমফোর্ট জোন’ বলেন।

মাসুমা রহমান নাবিলা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

প্রথম আলো :

আপনার ভক্তদের মধ্যে পারিবারিক দর্শকের সংখ্যা বেশি...

মাসুমা রহমান নাবিলা: আমি যেভাবে কাজ করি এবং আমার লাইফস্টাইল যেমন, সেটা হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে ভালো লাগে। সত্যি বলতে আমি খুব সাধারণ জীবন যাপন করি। এটা যে সচেতনভাবে করি তা নয়, তবে আমি যদি তারকাদের মতো জীবন যাপন করতাম, তাহলে আমার আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের আমার সঙ্গে চলতে কষ্ট হতো। বন্ধুদের বা বাচ্চার স্কুলের অভিভাবকদের কাছেও কখনো নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করি না। আমি টের পাই যে গৃহিণী, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং নারীরা আমাকে খুব পছন্দ করেন, কারণ তাঁরা হয়তো আমার সঙ্গে নিজেদের রিলেট করতে পারেন। তারকাখ্যাতি আলাদা রেখে সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

প্রথম আলো:

‘বনলতা সেন’ সিনেমায় একসঙ্গে এতগুলো চরিত্র, প্রস্তুতি কেমন ছিল?

মাসুমা রহমান নাবিলা: আমরা অনেক লম্বা সময় মহড়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। প্রতিটি দৃশ্যের মহড়া হয়েছে কস্টিউম ও প্রপসসহ। প্রতিদিন সংলাপগুলো বলতে বলতে আমরা ধীরে ধীরে চরিত্রের মনস্তত্ত্বে ঢুকে গিয়েছিলাম এবং ওটা ধারণ করেছিলাম। পরিচালক উজ্জ্বল ভাই খুবই পারফেকশনিস্ট। উনি কোনো দ্বিধা নিয়ে অপ্রস্তুত অবস্থায় কাজ করতে চান না। আমাদের প্রস্তুতি এতটাই ছিল যে শুটিংয়ে কোনো এনজি শট দিতে হয়নি।

প্রথম আলো :

এই রূপগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার বেশি প্রিয়?

মাসুমা রহমান নাবিলা: বিশাখা এবং সেই বিদ্রোহী বা বিপ্লবী নারী—এই দুটি চরিত্র আমার সবচেয়ে পছন্দের; কারণ, তারা দুজনই প্রতিবাদী ও স্ট্রং নারী।

মাসুমা রহমান নাবিলা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

প্রথম আলো :

চরিত্রগুলো ধারণ করার ফলে বাস্তব জীবনে কি কোনো প্রভাব পড়ে?

মাসুমা রহমান নাবিলা: এই সিনেমার ক্ষেত্রে অতটা প্রভাব পড়েনি। হয়তো অভিজ্ঞতার কারণে বা সংসারে পিচ্চি ছোট থাকার কারণে দ্রুত বের হতে পেরেছি। কিন্তু আয়নাবাজির সময় চরিত্রের আবহটা আমার মধ্যে অনেক দিন ছিল।

প্রথম আলো:

সিনেমাটি মুক্তির পর দর্শকদের কোনো প্রতিক্রিয়া কি আপনার মনে গেথে আছে?

মাসুমা রহমান নাবিলা: অনেকেই বলেছেন যে তাঁরা জানতেন না বনলতা সেন দেখতে কেমন, কিন্তু এখন থেকে ‘বনলতা সেন’ কবিতা পড়তে গেলে আমার চেহারাটাই তাঁদের চোখে ভাসবে। কবিতার চরিত্র হিসেবে মানুষ আমাকে মনে রাখছে, এটা বিশাল পাওয়া।

প্রথম আলো :

অভিনয়ের পাশাপাশি নিয়মিত উপস্থাপনাও করেন...

মাসুমা রহমান নাবিলা: উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও আমি খুব সিলেক্টিভ। চেষ্টা করি এমন অনুষ্ঠান করতে, যা নিয়ে মানুষ আলোচনা করবে। মাঝেমধ্যে ব্র্যান্ডের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে চুক্তির অংশ হিসেবে কিছু কাজ করতে হয়, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গুণগত মান আর আলোচনার সুযোগ দেখে অনুষ্ঠান নির্বাচন করি। এ জন্য উপস্থাপনায় আমার কাজের সংখ্যা কম।

মাসুমা রহমান নাবিলা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
প্রথম আলো:

কিন্তু এখন তো এখানেও ভাইরাল হওয়ার একটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। আপনি বিষয়টি নিয়ে কতটা সচেতন?

মাসুমা রহমান নাবিলা: বনলতা সেন মুক্তির পর অনেক জায়গায় যেতে হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ জায়গায় একই ধরনের প্রশ্ন। আবার উপস্থাপকদের দেখেছি, স্ক্রিপ্টের বাইরে কোনো প্রশ্ন করেন না। একই উত্তর দিতে দিতে নিজের কাছেও তো খারাপ লাগে। যদি নিজের ক্ষেত্রে বলি, যখন কোনো উপস্থাপনা করি, তখন একটা ফ্লোতে ঢুকে যাই। এটা খুব জরুরি। আর একজনের সম্পর্কে জানতে না-ই পারি, কিন্তু তার কাছ থেকে কিছু জানা বা তাকে এক্সপ্লোর করা, একটু চেষ্টা করলেই কিন্তু যায়। আর ভাইরালের বিষয় বলতে গেলে, এখন তো ইচ্ছা করেই এমন কিছু প্রশ্ন রাখা হয়, যেগুলো বিব্রতকর। অনেক অনেক পডকাস্ট, ইউটিউবে অনুষ্ঠান—কিন্তু কয়টা মানসম্পন্ন, প্রশ্ন থেকে যায়।