অভিনন্দন। প্রজ্ঞাপন ঘোষণার পর কোনো চাপ...
অর্থী আহমেদ : আসলে স্বীকৃতির সঙ্গে দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়।
প্রথম আলো :
উচ্ছ্বাস, ভয় নাকি কৃতজ্ঞতা—এ কয় দিনে কোন বিষয়টা আপনার ভেতর বেশি কাজ করেছে?
অর্থী আহমেদ : অবশ্যই কৃতজ্ঞতা। এত অল্প বয়সে এত বড় একটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার আমাকে দেওয়া, অবশ্যই যাঁরা নির্বাচিত করেছেন, তাঁদের প্রতি। আমার গুরু লুবনা মরিয়মের প্রতি, বিশেষ করে আমার শিক্ষার্থীদের প্রতি, যাঁরা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন, বিশ্বাস রেখে আমার সঙ্গে কাজ করে আসছেন।
আপনি বলছিলেন, অল্প বয়সে স্বীকৃতি। এই যে ৩১ বছর বয়সে একুশে পদক; মনে হয় কি, এই স্বীকৃতি একটু আগেই চলে এল?
অর্থী আহমেদ : আমি তো আসলে এটা কখনো প্রত্যাশা করিনি। এ বিষয়ে কিছু জানতামও না। কেন জানি মনে হয়, যাঁরা নির্বাচন করেছেন, তাঁরা হয়তো ভেবেছেন—তরুণদের দিলে আরও অনেক তরুণ অনুপ্রাণিত হবেন। আমি যে কাজটা করছি, সেটা একদম স্রোতের বিপরীতে গিয়ে। সে ধরনের কাজ করতে আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন। নাচ তো শুধু মঞ্চে গিয়ে করা বা শিক্ষার্থীদের শেখানো নয়। নাচ একটা সমাজে অবদান রাখা এবং সেই অবদান নিয়ে আরও মানুষের জীবন পরিবর্তন করা—এটা তো বেশ কষ্টসাধ্য বিষয়। অনেক বাধা অতিক্রম করে এখনো এ কাজটা করছি। এই কঠিন কাজগুলো যেন অন্য তরুণেরা করতে অনুপ্রাণিত হন, সে কারণে আমাকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটা তো শুধু আমার একার নয়। আরও অনেক তরুণ নৃত্যশিল্পী যাঁরা আছেন, যাঁরা হতাশ হয়ে যান, কাজ করছেন কিন্তু স্বীকৃতি পাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য হয়তো এটা বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, তরুণেরা আরও অনুপ্রাণিত হবেন। তাঁরা ভাববেন, ভালো কাজ সততার সঙ্গে করলে স্বীকৃতি আসে। আরও মনে হয়, মানুষের ভালো থাকার মাধ্যম হিসেবে নাচটাকে বেছে নেওয়ার ভাবনাটা আরও ছড়াবে। ছোটবেলায় যাঁরা নানা কারণে নাচ ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাঁরাও উৎসাহ পাবেন।
স্রোতের বিপরীতের কথা বলছিলেন, এটা বলতে কী বোঝাতে চাইছেন?
অর্থী আহমেদ : সবাই যখন মঞ্চনির্ভর কাজ করছিল, চার বছর আগে তখন আমি ভিন্নভাবে ভেবেছি। আমাদের নাচের জগৎটা এমন, এখানে খুব একটা বাইরের মানুষ ঢুকতে পারেন না। সেই জায়গা থেকে আমি নাচটাকে নৃত্যশিল্পীদের মাঝখান থেকে বের করে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ করার চেষ্টা করেছি। সাধারণ মানুষের ভালো লাগার মাধ্যম হিসেবে নাচকে দেখার চেষ্টা করেছি। আমি যখন বড়দের এবং কর্মজীবী মানুষদের নাচ শেখানো শুরু করি, সে সময় এ ভাবনাটা নিয়ে অনেকে বলেছেন, সময় নষ্ট করছি। নাচটাকে কেউ সিরিয়াসলি নেবে না, এটাকে ওজন কমানোর প্রোগ্রাম হিসেবে নেবে। কিন্তু সেই ধারণা তো আমি দিনে দিনে পাল্টে দিয়েছি। গত কয়েক বছরে আমরা আটটা মেজর প্রোডাকশন করেছি। সেই প্রোডাকশগুলোতে দর্শক তাদের উন্নতি দেখেছে। এখন শুধু তারা শুধু শিক্ষানবিশ নয়, বিভিন্ন পেশায়ও ভালোও করছে। অনেকে এটাকে ভাবিদের জিম এবং জুম্বা ক্লাস বলেছিল। কিন্তু দিনে দিনে আমার শিক্ষার্থীদের উন্নতি তো দর্শক দেখেছে। বড় হয়ে যারা নাচ শিখেছে, তারা দেশে–বিদেশে বিভিন্ন পেশাদার শোতে পারফর্ম করছে। সাধারণ নৃত্যশিল্পীদের মতোই পারফর্ম করছে। হয়তো এই প্ল্যাটফর্ম না পেলে এ স্বপ্নটা তারা দেখত না। এখন পর্যন্ত সাড়ে সাতশ অ্যাডাল্ট বিগিনার আমার কাছে নাচ শিখেছে। আরও দুই-তিন হাজার ওয়েটিং লিস্টে আছে, তারাও নাচ শিখতে চায়। আমার শিক্ষার্থীরা ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সী। এই যে সাধারণ মানুষের ভালো থাকার মাধ্যম হিসেবে, নাচটাকে তাদের জীবনের একটা অংশ করা, এ ভাবনাটা আসলে নতুন। আমিই প্রথম এটা শুরু করি। এ কাজগুলো আসলে আমাদের দরকার। প্রতিদিন আমরা এত ট্রমার মধ্য দিয়ে যাই, ভালো থাকার মাধ্যম হিসেবে নাচের মতো সুন্দর একটা শিল্পমাধ্যমকে জীবনের অংশ করা প্রয়োজন।
কখন এবং কী ভেবে এটা শুরু করেছিলেন?
অর্থী আহমেদ : আমি কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভরতনাট্যমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছি। এরপর চেন্নাইয়ে ড্যান্স সাইকোলজির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এরপর যখন দেশে ফিরে আসি, আমাকে অনেকে বলত, ছোটবেলায় নাচ শেখার খুব শখ ছিল, মা–বাবা দেয়নি। আবার কেউ বলত, একটা সময় পর্যন্ত শিখেছি, তারপর ছেড়ে দিতে হয়েছে। সবার এই আক্ষেপের কথা শুনে আমার খুব কষ্ট লাগত। কেন এখন বড় হয়ে শিখতে পারছে না। ছোটদের সঙ্গে গিয়ে অস্বস্তি হবে। ওই ভাবনা থেকে, ডেমো হিসেবে ২৫ জনকে নিয়ে একটা ক্লাস শুরু করি। ওই ক্লাসে আমি দেখতে পাই, কীভাবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। কীভাবে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, শরীরকে ভালোবাসা, ভালো থাকা—এই বয়সে কিছু করতে পারবে, এই বিশ্বাস ফেরত আনতে পারছে। তখন চিন্তা করি যে এটাকে আমার আরও বড় জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আমাকে কাজ করতে হবে। মানুষের ভালো থাকার মাধ্যম হিসেবে যেন নাচটাকে বেছে নেয়।
প্রথম আলো :
ভবিষ্যতের জন্য আপনার এই অর্জন কী ধরনের মানদণ্ড তৈরি করে দিল?
অর্থী আহমেদ : একে তো মনে হয়, তরুণেরা আরও অনুপ্রাণিত হবে। তারা ভাববে, ভালো কাজ সততার সঙ্গে করলে স্বীকৃতি আসে। আরও মনে হয়, মানুষের ভালো থাকার মাধ্যম হিসেবে নাচটাকে বেছে নিচ্ছে—এই ভাবনা আরও ছড়াবে। ছোটবেলায় যারা নানা কারণে নাচ ছেড়ে দিয়েছিল, তারাও উৎসাহ পাবে।
একুশে পদকের জন্য নাম প্রস্তাবের একটি প্রক্রিয়া থাকে। কারা আপনাকে এই স্বীকৃতির জন্য যোগ্য মনে করেছেন, জানেন?
অর্থী আহমেদ : আমার নাম কারা প্রস্তাব করেছেন, আমি জানি না। তবে মন্ত্রণালয় থেকে হয়েছে, এটা আমাকে বলেছে।
একুশে পদকের জন্য আপনার নাম মনোনীত হওয়ার পেছনে নিজের কোন ভূমিকা বা অবদানকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
অর্থী আহমেদ : আমার মনে হয়, নাচ নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এবং নাচকে জীবনের অংশ করে তোলা—এই ভাবনাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি, এটাই হয়তো সবার নজরে পড়েছে।
প্রথম আলো :
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর একটা পক্ষের কাছ থেকে যেমন শুভকামনা পাচ্ছেন, তেমনি নাচের সঙ্গে জড়িত একটা বিশাল অংশ আপনার এই পদক প্রাপ্তিতে অবাক হয়েছে। এ নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখিও হচ্ছে...
অর্থী আহমেদ : ১০-১২ জন নৃত্যশিল্পী মন খারাপ করেছেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। আমার মনে হয়, সব বিষয়ে সমালোচনার প্রয়োজন আছে। গুরুজনেরা পাননি বলে আমারও মন খারাপ। আমাকে তৈরি করার পেছনে সম্পূর্ণ অবদান লুবনা মরিয়মের। এই মানুষটার আরও ২০ বছর আগে একুশে পদক পাওয়া উচিত ছিল। এ দেশে এ মুহূর্তে নাচে কেউ একুশে পদক পাওয়ার দাবিদার হলে তিনি লুবনা মরিয়ম, আর কেউ নন। তাই আমার এ পদক আমি গুরু লুবনা মরিয়মকে উৎসর্গ করছি।
নাচের সঙ্গে সখ্য কবে থেকে?
অর্থী আহমেদ : তিন বছর বয়সে মা আমাকে ছায়ানটে ভর্তি করিয়ে দেন। দীর্ঘ সময় ধরে সাধনাতে লুবনা মরিয়মের সঙ্গে কাজ করেছি। অগ্রণী স্কুল থেকে এসএসসি ও উদয়ন থেকে এইচএসসি শেষ করে রবীন্দ্রভারতীতে চলে যাই। ফেরত এসে দেশে ও দেশের বাইরে নাচ নিয়ে পারফর্ম করেছি। তালিম নেওয়ার কথা যদি বলি, আমার গুরু লুবনা মরিয়ম ও কীর্তিরাম গোপাল।
প্রথম আলো :
দেশে ও দেশের বাইরে নাচে আপনার আদর্শ কারা?
অর্থী আহমেদ : অনেককেই আদর্শ মনে করি। তাঁদের মধ্যে লুবনা মরিয়ম তো আছেনই, এর বাইরে কীর্তিরাম গোপাল, আকরাম খান ও প্রয়াত চন্দ্রশেখর গুরুজিও আমার ভীষণ পছন্দের।
প্রথম আলো :
নাচ নিয়ে আপনার স্বপ্নটা কী?
অর্থী আহমেদ : ঘরে ঘরে সবাই নাচ শিখবে। নৃত্যশিল্পী হওয়ার জন্য নয়, নিজেকে ভালোবাসার জন্য, নিজে ভালো থাকার জন্য এবং ভালো নাচ বোঝার জন্য। শিশুদের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশে নাচ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বড় হয়ে কারও যেন আক্ষেপ না থাকে, আমি নাচ পারি না। আর এমনিতে আমার মনে হয়, নাচ নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এবং নাচকে জীবনের অংশ করে তোলা—এ ভাবনাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি, এটাই হয়তো সবার নজরে পড়েছে।