সবকিছু সহজ করতে গিয়ে জীবনটাই জটিল হয়ে গেছে

পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও তিন মাস আগে আবারও তাঁর শরীরে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ধরা পড়েছে। এবার ওভারিয়ান বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। অস্ত্রোপচারের পর এখন কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন মনজুর কাদের

প্রথম আলো:

এখন আপনার প্রতিদিনের রুটিন কী?

সামিয়া আফরিন : খুব সকালে উঠি। বাইরে হয়তো হাঁটতে যাচ্ছি না, তবে বাসার ছাদে হাঁটাহাঁটি করি। এরপর যোগব্যায়াম ও শ্বাসপ্রশ্বাসের এক্সারসাইজ করি। খেয়াল করলাম, একটা নির্দিষ্ট সময় পর হাঁপিয়ে উঠি, সেটাও ঠিক করার চেষ্টা করছি। যেকোনো রোগীর ক্ষেত্রেই নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। না চাইলেও এসব নিয়ে কাজ করলে শরীরটা ধীরে ধীরে রিফর্ম করে। আসলে প্রাকৃতিক নিয়মেই অনেক কিছু রিফর্ম হয়, শরীরও তার ব্যতিক্রম না। রোগের বিষয়টাকে স্পোর্টিংলি নিতে পারলে পুরো প্রক্রিয়াটা আরও সহজ হয়। খাবারও খুব বুঝেশুনে খাচ্ছি। যতটা সম্ভব ফ্রেশ ফুড খাওয়ার চেষ্টা করছি। বিষয়টা আমার কাছে বেশ মজারও লাগে। আগেকার দিনে ফ্রিজ ছিল না, প্রতিদিন বাজার হতো, প্রতিদিন রান্না হতো। তখন জীবনযাত্রা অনেক সহজ ছিল। এখন সবকিছু সহজ করার চেষ্টা করতে গিয়ে জীবনটাই যেন আরও জটিল হয়ে গেছে।

সামিয়া আফরিন
প্রথম আলো:

এই সময় কোন কোন বিষয় আপনাকে মানসিকভাবে স্বস্তি ও আনন্দ দিচ্ছে? ভালো লাগার মুহূর্তগুলো কীভাবে খুঁজে নিচ্ছেন?

সামিয়া আফরিন : আমার সঙ্গে মা–বাবা থাকেন, সন্তানেরা থাকে—ওদের সঙ্গে সময় কাটাই। টুকটাক বই পড়ার চেষ্টা করি। অনেক সময় আল–কোরআনের সুরার বাংলা তরজমা পড়ি। এগুলো সময় নিয়ে পড়ি। নিয়মিতই পড়ি। মানসিকভাবে আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় গান। গান শুনতে খুব পছন্দ করি, গাইতেও ভালোবাসি। মেলোডিয়াস কোনো গান পেলেই শুনতে থাকি। এই সময়ে মুসাফির ক্যাফের সব গান আমার খুব প্রিয় হয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে, সারাদিন মুসাফির ক্যাফের গান শুনছি। এত সুন্দর! এসবই আমাকে বেশি স্বস্তি দিচ্ছে। অনেক সময় অনেকে ফোন করেন; কিন্তু আমার কথা বলতে ভালো লাগে না, ইচ্ছাও হয় না। তখন নিজের মতো করে সময় কাটানোই বেশি ভালো লাগে। বারান্দায় বসে থাকি, গাছের সঙ্গে সময় কাটাই। আমার দুটি বিড়াল আছে, ওদের সঙ্গেও সময় কাটাতে বেশ ভালো লাগে। এত মায়া! ভেবেছিলাম নিরাপত্তার কথা ভেবে ওদের রুমে ঢুকতে দেব না। কিন্তু কীসের কী—দুটিই সারাক্ষণ আমার রুমে বসে থাকে। কাছের বন্ধুরা আসে। ওদের সঙ্গে সময় কাটাই, তবে খুব বেশি নয়। হয়তো আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা বসে কথা বলার পর ওরাও বুঝতে পারে আমার আর ভালো লাগছে না। তখন তারাও চলে যায়।

স্বামী (ডানে) ও সন্তানের সঙ্গে সামিয়া আফরীন
ছবি : সামিয়ার ফেসবুক থেকে
প্রথম আলো:

আর পরিবারের সহযোগিতা?

সামিয়া আফরিন : সত্যি বলতে, বাসার সবার সহযোগিতা অবিশ্বাস্য। আমার হাজব্যান্ডের সাপোর্টের কথা আর কী বলব! মানুষ যখন ভালনারেবল থাকে, তখন কারও ছোট্ট কথাতেও অনেক বেশি আপসেট বা ইমোশনাল হওয়ার একটা বিষয় থাকে। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারগুলো স্বামী–সন্তান ও মা–বাবা বেশ ভালোভাবেই বোঝে। অনেক সময় শরীরে ইরিটেশনের কারণে হয়তো আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে বা কারও কথা শুনতে ভালো লাগছে না—এ বিষয়গুলো ওরা খুব ভালোভাবে বোঝে। তাই ওরা কেউ কোনো যুক্তিতর্কে যায় না। জানি, এ পর্যায়টা চলে গেলে এসবও থাকবে না। ছোটখাটো বিষয়গুলো ওরা খুব সুন্দরভাবে সামলে নেয়।

প্রথম আলো:

দীর্ঘ চিকিৎসার অভিজ্ঞতা জীবনকে দেখার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন এনেছে?

সামিয়া আফরিন : ২০২২ থেকে ২০২৩—দুই বছর চিকিৎসা চলেছে। এরপর তিন বছর ফলোআপ। এই সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে একটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এখন আমি খুব বেশি স্ট্রেসফুল কথা সহ্য করতে পারি না। আগে যে বিষয়গুলো আমাকে খুব বেশি ইফেক্ট করত না, এখন সেগুলোও করে। সেই জায়গা থেকে, নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা ভেবে, আবেগ ঠিক রাখতে টক্সিক মানুষ থেকে দূরে থাকি। আমরা সবাই সামাজিক, সবার সঙ্গে চলাফেরা করব; কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিজেকে নিরাপদে রাখাটাও জরুরি—এটাও বুঝতে হয়।

আরও পড়ুন
উপস্থাপক সামিয়া আফরিন
কোলাজ
প্রথম আলো:

চিকিৎসার মধ্যেও নিজেকে কাজের সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন। এখন কী কী কাজ করছেন বা সামনে আর কী কী পরিকল্পনা আছে?

সামিয়া আফরিন : আমার ‘পারপাস’ নিয়ে পডকাস্ট করছি। অপারেশনে যাওয়ার আগে সব কটি পর্বের শুটিং শেষ করেছি। এখন সেগুলো নিয়েই কাজ চলছে, একটার পর একটা প্রচার হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের কাজ করছি, এর ফেসবুক পেজটাকেও আপগ্রেড করার চেষ্টা করছি। অনেক মানুষ সাহায্য চান। সেখান থেকে কোনো কার্যক্রম এখন চালাতে পারছি না, সাহায্য করতে পারছি না—এটা ভেবে খারাপ লাগে। এ বছর আমার বেশ কিছু কার্যক্রমের পরিকল্পনা ছিল। ঈদের আগে ক্যানসার অ্যাওয়ারনেসের জন্য একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প করে এসেছি। অক্টোবর–নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে সচেতনতার জন্য আরও দুটি মেডিক্যাল ক্যাম্প করার পরিকল্পনা ছিল, গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীতে। কিন্তু শারীরিক অবস্থার কারণে এখন ট্রাভেল করাটাও মুশকিল। সেই শক্তিটা পাব না। তবে আল্লাহ যদি চান, এগুলো করতে চাই। আমার মনে হয়, আমরা কত ভাগ্যবান! সেরা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছি, ভালো খাবার পাচ্ছি, অনেক ভালো আছি। অথচ আমাদের আশপাশে কত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, তাদের জন্য খারাপ লাগে। প্রতিদিন সকালে উঠে চিন্তা করি, ওদের জন্য যদি কিছু করে যাওয়া যায়। আমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে সম্ভব। একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার একটা ওয়েলনেস স্টুডিও চালু করারও ইচ্ছা আছে। সেটাও করতে চাই।