বিশেষ সাক্ষাৎকার: হাওয়ার পরিচালক
আমার কাছে সিনেমা মানে গল্প না, আমার কাছে সিনেমা মানে জীবন
মুক্তির এক মাস পার করেছে ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্র। মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত এই ছবি দেশের বাইরেও প্রদর্শিত হচ্ছে। এসবের মধ্যে ছবিটি নিয়ে আইনি জটিলতার মুখোমুখিও হন পরিচালক। সব জটিলতা অবসানের পথে। ছবিটিসহ অন্যান্য প্রসঙ্গে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কথা হলো পরিচালকের সঙ্গে
প্রশ্ন :
‘হাওয়া’ ছবি মুক্তির মাস পেরিয়েছে। এখনো দর্শকের চাহিদা আছে। এতটা সাড়া পাবেন ভেবেছিলেন?
প্রথমত, ছবিটি নিয়ে প্রত্যাশা একেবারেই ছিল না। কারণ, আমি একটা ছবি বানিয়েছি—এমন চিন্তা থেকে ছবিটি বানাইনি, যেখানে ব্যবসায়িক সফলতার ব্যাপারটা মাথায় ছিল। আমি আসলে আমার মতো করে আমার প্রথম ছবিটা বানিয়েছি। ‘হাওয়া’ ছবি বানানোর লেসনও বলতে পারি। আমি মনে করি, আমি যে সামনে ছবি বানাব, এটা তারই একটি প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে ভিজ্যুয়াল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি নানান ফর্মে—আজ থেকে ১০-১২ বছর আগেও টেলিভিশন নাটক বানিয়েছিলাম। মাঝখানে লম্বা সময় বিজ্ঞাপনচিত্র বানিয়েছি। একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছিলাম। ‘হাওয়া’ আমার প্রথম ছবি, নিজের জন্য শেখার জায়গা ছিল।
প্রশ্ন :
তাহলে আপনারা কি ভেবে ছবিটি বানিয়েছিলেন?
আমরা ভেবেছিলাম, নতুন গল্প বলার ভঙ্গিমাটা দর্শকের সামনে প্রকাশ করতে চাই। দর্শক কমার্শিয়াল যে ভঙ্গিমায় ছবি দেখেন, এর বাইরে যে গল্প এবং জীবনের গল্প থাকে, সিনেমায় আমরা সেটা হাজির করতে চেয়েছি। দর্শকের যে ব্যাপক আগ্রহ এবং ‘হাওয়া’ নিয়ে তাঁদের যে উচ্ছ্বাস, সেটা বরং আমাদের অনুপ্রাণিত করবে সামনে আরও নতুন ধরনের গল্প বলার। আমি বিশ্বাস করি, সামনে আরও যাঁরা নতুন সিনেমা বানাবেন, যেসব নির্মাতা নতুন গল্প নিয়ে দর্শকের সামনে আসতে চান, তাঁদের জন্য এটা একটা সাহসের গল্প হবে। আমাদের নিজেদের জন্যও ‘হাওয়া’ একটা সাহসের গল্প। অনুপ্রেরণার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে ছবিটা বানিয়েছিলাম, তরুণেরা এই ছবি দেখবেন। কিন্তু এটা তরুণেরা তো দেখেছেনই, পাশাপাশি সব বয়সী মানুষ ‘হাওয়া’ ছবিকে বিশ্বাস করেছেন। তাঁদের ভালো লাগা তৈরি হয়েছে—সেটা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে সামনে নতুন ছবির জন্য, আমাদের সাহসী করে তুলেছে নতুন গল্প বলার জন্য।
প্রশ্ন :
বলা হচ্ছে, এই দর্শকেরা একেবারে নতুন। তাঁদের প্রেক্ষাগৃহে আনতে কতটা চ্যালেঞ্জ ছিল?
এটা মোটেও চ্যালেঞ্জ ছিল না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমাদের এখানে যেভাবে ফর্মুলা ছবি হচ্ছে, সেসব ছবি দেখে তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাঁরা নতুন ধরনের গল্প দেখতে চান। ফর্মুলা ছবির বাইরের গল্প কিছু দেখতে চান। শুধু আপার ক্লাস বা মিডল ক্লাস নয়—এই ছবি কিন্তু সব শ্রেণির মানুষ দেখেছেন। তার মানে সব শ্রেণির দর্শকের মধ্যে একধরনের নতুন গল্প অনেক দিন ধরে দেখার আগ্রহ ছিল। নতুন সাউন্ড, নতুন শব্দ, নতুন ভিজ্যুয়াল দেখার আগ্রহ ছিল কিন্তু সে ধরনের ছবি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছিল না। কিন্তু তাঁরা ঠিকই নানা মাধ্যমে ছবি দেখতেন। ছবি দেখা, গান শোনা কিন্তু কখনোই বন্ধ হয় না। আজকে কনসার্ট সেভাবে হচ্ছে না, তাই বলে শ্রোতারা গান শোনা বন্ধ করে দিয়েছেন—বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। গান শুনছেন ঠিকই, অন্য কোনো মিডিয়ামে। আজকে কনসার্ট যদি হয়, দর্শক কিন্তু হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। আমরা ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভ্যালে হাজার হাজার মানুষ দেখেছি। তার মানে শাস্ত্রীয় সংগীতও এ দেশের মানুষ শোনে। তাই উপস্থাপনাটা জরুরি। আমি মনে করি, সিনেমার উপস্থাপনাটা সুন্দর ছিল আমার। সিনেমার উপস্থাপনাটা যদি সুন্দর করা যায়, নতুন করা যায়, আগ্রহ তৈরি করা যায়—দর্শক ঠিকই আছেন, দর্শক সিনেমা হলে আসবেনই।
প্রশ্ন :
আপনার কথায় মনে হচ্ছে ফর্মুলা ছবির সময় শেষ।
ফর্মুলা ছবির সময় শেষ না। ফর্মুলা নতুন হতে হবে। নতুন ফর্মুলায় গল্প বলতে হবে। ২০–৩০ বছর আগের ছবির যে ডিজাইন ছিল, তা তো এই সময়ে এসে কাজ করবে না। মানুষের জীবনযাত্রা বদলে গেছে, আমাদেরও তাই বদলে যেতে হবে।
প্রশ্ন :
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমাদের বদলে যেতে হবে?
আমাদের বদলে যেতে হবে ঠিকই কিন্তু গল্প হতে হবে আমাদের। গল্প কখনো বৈশ্বিক হয় না, গল্প হয় নিজের। নিজের গল্প নিয়ে যেতে হয় বিশ্বের কাছে। আঞ্চলিকতা ধরা না গেলে কখনো বিশ্বকে ধরা যায় না। গল্পে আঞ্চলিকতা এবং নির্মাণে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে।
প্রশ্ন :
অনেকের মতে, এখনকার ছবি নির্মাণে প্রযুক্তিগত ব্যাপারও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে?
আইফোন আমার যেমন আছে, আমেরিকার একজন ছেলের কাছেও আছে। প্রযুক্তি কোনো ব্যাপার না। প্রযুক্তি এখন মানুষের ঘরের দুয়ারে। প্রযুক্তি দিয়ে ছবি হয় না। ছবিটা আগে ঠিকঠাকমতো হতে হবে। সিনেমার মান বিচার হয় চিন্তায়, ভিজ্যুয়ালে। সাহিত্যের মান বিচার হয় তো সাহিত্যের ভেতর দিয়ে—কোন কাগজে ছাপা হলো কিংবা কোন কলমে লেখা হলো তা দিয়ে কখনোই সাহিত্যের বিচার হয় না। সিনেমার মানের বিচারও হবে সিনেমা বলার ভেতর দিয়ে, সিনেম্যাটিক ভাষা দিয়ে, গল্পবলার ধরনের ভেতর দিয়ে।
প্রশ্ন :
সিনেমা মানে আপনার কাছে কী?
আমার কাছে সিনেমা মানে গল্প না, আমার কাছে সিনেমা মানে জীবন। সিনেমায় আমি যে মানুষের কথা বলছি, সে মানুষের জীবন পর্দায় দেখতে পাচ্ছি কি না, সেটা আমার কাছে মুখ্য বিষয়।
প্রশ্ন :
ছবিটির দর্শকসাড়া তো এককথায় দারুণ। একদমই নতুন দর্শক। ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখতে করণীয় কী বলে মনে করেন?
প্রতিটি জেলা শহরে আমাদের অনেক ভালো মানের প্রেক্ষাগৃহ লাগবে। ‘হাওয়া’ মুক্তির পর যে পরিমাণ টেক্সট পেয়েছি, বেশির ভাগের কথা আমাদের সিনেমা হল নেই। আমরা ছবি দেখব কীভাবে? তার মানে হল লাগবে, দর্শকও আছেন। ভালো মানের আধুনিক সাউন্ডসহ প্রজেকশন–ব্যবস্থা লাগবে। প্রেক্ষাগৃহ লাগবে আগে এ জন্যই বলছি, ভালো মানের ছবি তৈরি হলেও প্রেক্ষাগৃহের কারণে ছবি পৌঁছানো যাচ্ছে না। সারা দেশে আরও প্রেক্ষাগৃহ থাকলে ‘হাওয়া’ আরও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ত। নতুন নির্মাতাদের ছবি লাগবে—যাঁরা পুরোনো, তাঁরা তো আছেনই, সঙ্গে নতুন চিন্তার ছবি লাগবে। নতুন চিন্তা তো নতুন নির্মাতাদের কাছ থেকেই আসে। আর আমাদের যারা অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের বিশ্বাস করতে হবে নতুন গল্পে প্রযোজনা করায়। দর্শক আসলে তৈরি হয়ে আছেন, তাঁরা শুধু প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছিলেন না। তাঁরা অন্য কোনো মাধ্যমে ঠিকই ছবিটি দেখছিলেন। যখন ভালো ছবি হয়, সেটা যে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দর্শক দেখেন, তা প্রমাণিত। দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালো ছবি লাগবে, আর দর্শক যেখানে ছবিটা দেখবেন, সেটার সুন্দর একটা পরিবেশ লাগবে।
প্রশ্ন :
‘হাওয়া’ ছবির সাফল্য নতুন ছবি বানাতে কতটা উদ্বুদ্ধ করছে আপনাকে?
প্রত্যেক নির্মাতার প্রথম ছবিটি তাঁর লেসন। আমি তো কোনো ফিল্ম স্কুল থেকে পড়িনি। আমি আসলে সিনেমা বানাতে বানাতে সিনেমা বানানো শিখব। ওটাই হয়েছে। উদ্বুদ্ধ করেছে বলতে, আমি সিনেমা বানানোর সময়টা বেশি এনজয় করেছি। স্ক্রিপ্ট যখন লিখেছি, তখন আমার জীবনের সুন্দর সময়। শুটিং ও এডিটিংয়ের সমটায়ও দারুণ। মুক্তির পর দর্শকের যে উচ্ছ্বাস দেখেছি, তাতে ভালো লাগা তৈরি হতে পারে, নির্মাতার জন্য দুঃখজনক অধ্যায়ও তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন :
কেমন সেটা?
এই আনন্দ, এই উচ্ছ্বাস আমাকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই আমাকে এখান থেকে দ্রুত সরে পড়া উচিত এবং নতুন ছবিতে মনোনিবেশন করা উচিত।
প্রশ্ন :
নতুন ছবির পরিকল্পনা...
একটা পরিকল্পনা করছি। এটা তো সহজ প্রক্রিয়া না। চেষ্টা করছি। আগামী বছর শুরু করব।
প্রশ্ন :
‘হাওয়া’ ছবি নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়তে হয়েছে। কতটা চিন্তায় পড়তে হয়েছিল?
কিছুটা চিন্তিত তো করবেই। আমি ছবি বানিয়েছি, সেটা নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা চলবে। কিন্তু শুধু পাখিবিষয়ক নয়, অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে—যা বিব্রতকর ছিল। চিন্তায় ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা ছিল। যাহোক, এখন তো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে আদালতের মাধ্যমে।