নৃত্য দিবস আপনার কাছে কী—উদ্যাপন, নাকি আত্মসমালোচনার দিন
লায়লা হাসান : আমি বলব, এটি একই সঙ্গে উদ্যাপন এবং আত্মসমালোচনার দিন। উদ্যাপন—কারণ, এই দিনে আমরা সবাই একত্র হই, একধরনের মিলনমেলা হয়; দেশ–বিদেশের শিল্পীরা তাঁদের কাজ নিয়ে আসেন, একে অন্যের কাজ দেখা, ভাবের আদান–প্রদান হয়। আবার এটি আত্মসমালোচনার দিনও—কারণ, অন্যের কাজ দেখে আমি নিজেকে যাচাই করতে পারি; আমি কী করছি, কোথায় ঘাটতি আছে, কীভাবে নিজেকে আরও উন্নত করতে পারি—সেসব নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। শুধু ঘরে বসে চর্চা করলে কেউ জানবে না আমি কী করছি। এই দিনে আমরা একত্র হয়ে নিজেদের কাজকে সামনে আনি, নিজেদের শুদ্ধ করার একধরনের প্রতিশ্রুতি নিই।
প্রথম আলো :
বাংলাদেশে এই দিবস পালনের শুরুটা কেমন ছিল?
লায়লা হাসান: বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে আমরা প্রথম এই দিবস পালন শুরু করি। তখন আমরা আন্তর্জাতিক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেই সংগঠনের একটি ডান্স কমিটির মাধ্যমে আমরা উদ্যোগ নিই। তখন এত বড় আয়োজন ছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি বড় হয়েছে। এখন এটি একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর আন্তর্জাতিকভাবে একটি বার্তা আসে, সেটিকে কেন্দ্র করে আমরা আমাদের আয়োজন করি। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পীরাও নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। ফলে এটি শুধু পারফরম্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ভাবনারও একটি জায়গা তৈরি করে।
প্রথম আলো :
নাচকে আপনি কীভাবে দেখেন—শিল্প হিসেবে, নাকি আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে?
লায়লা হাসান: নাচ আমার কাছে দুটোই। এটি যেমন একটি শিল্প, তেমনি এটি আত্মপ্রকাশের একটি মাধ্যম। আমাদের মনের কথা, জীবনের অভিজ্ঞতা, অবস্থান—সবকিছুই আমরা শরীরের ভঙ্গি, অভিব্যক্তি দিয়ে প্রকাশ করি। নাচ শুধু দেখার বিষয় নয়, এটি অনুভবের বিষয়। একজন শিল্পী তাঁর ভেতরের যে অনুভূতি, সেটা শরীরের ভাষায় প্রকাশ করেন—এটাই নাচের আসল শক্তি।
আপনার সময়ে নাচ শেখা আর এখনকার প্রজন্মের শেখার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
লায়লা হাসান: আমরা যখন শুরু করি, ষাটের দশক ও পরবর্তী সময়ে, তখন নাচ শেখাটা ছিল মূলত গুরু–শিষ্য পরম্পরাভিত্তিক। সরাসরি গুরুর কাছেই শিখতে হতো। যেমন ললিতকলা একাডেমি বা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিকের পরিবেশে আমরা বেশ কয়েকজন গুরুর কাছ থেকে শিখেছি। সুযোগ কম ছিল, কিন্তু শেখাটা ছিল নিবিড়ভাবে। একজন গুরুই ছিলেন অনেকটা মূল ভরসা, তাঁর কাছ থেকেই পুরো ভিত্তিটা গড়ে উঠত। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন শেখার সুযোগ অনেক বেশি বিস্তৃত। দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষক আসছেন, অনেকে বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, আবার শিখে এসে এখানে শেখাচ্ছেন। শুধু তা–ই নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে—লন্ডন, কানাডা বা অন্য যেকোনো দেশ থেকে নাচ শেখা বা দেখা সম্ভব হচ্ছে। ইউটিউব, অনলাইন ক্লাস এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখতে পারছে। এ কারণে এখনকার শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি অনেক বেশি প্রসারিত। তারা একাধিক উৎস থেকে শিখতে পারছে, তুলনা করতে পারছে, নিজের মতো করে ভাবতে পারছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী কাজও করছে। শেখার পরিধি অনেক বড় হয়েছে, সুযোগও অনেক বেড়েছে। তবে আমাদের সময়ের একটি আলাদা শক্তি ছিল—গভীরতা ও একাগ্রতা। সীমিত সুযোগের কারণে যা শিখতাম, তা খুব মনোযোগ দিয়ে, ধৈর্য নিয়ে এবং গুরুর সান্নিধ্যে শিখতাম। সেই শেখাটা ছিল অনেকটা একমুখী কিন্তু গভীর। সব মিলিয়ে বলা যায়, আগে শেখা ছিল সীমিত কিন্তু গভীর, আর এখন শেখা হয়েছে বিস্তৃত, বহুমুখী ও সুযোগসমৃদ্ধ। বর্তমান প্রজন্ম সত্যিই সৌভাগ্যবান—কারণ তারা অনেক বেশি সুযোগ পাচ্ছে, আবার সেই সুযোগ ব্যবহার করে নিজেদের আরও উন্নত করার সম্ভাবনাও তাদের বেশি।
এত সুযোগের মধ্যে গুরু–শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব কি কমে যাচ্ছে?
লায়লা হাসান: গুরু–শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব আমার মতে কোনোভাবেই কমে যাচ্ছে না, বরং এর প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। তবে চর্চার ধরনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আজকাল প্রযুক্তির কারণে শেখার অনেক সুযোগ বেড়েছে। ইউটিউব, টেলিভিশন বা বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম থেকে সহজেই নাচ দেখা ও শেখার চেষ্টা করা যাচ্ছে। এতে করে প্রাথমিকভাবে কিছুটা ধারণা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং বাহ্যিকভাবে কিছু অঙ্গভঙ্গি বা স্টেপ অনুকরণ করাও সহজ হয়েছে। কিন্তু নৃত্যশিল্প কেবল অনুকরণ বা বাহ্যিক রূপ নয়। এর গভীরে আছে ভাব, ব্যাকরণ, শুদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি—যা সরাসরি একজন গুরু ছাড়া পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় একজন শিল্পী কেবল নাচ শেখেন না, তিনি নাচের দর্শন, শুদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থও শিখে থাকেন। সেটাই একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী তৈরির ভিত্তি। যাঁরা দ্রুত শেখার মানসিকতায় শুধু ভিডিও দেখে নাচ শেখার চেষ্টা করেন, তাঁরা অনেক সময় বাহ্যিক অংশটা ধরতে পারলেও শিল্পের গভীরতা ও শুদ্ধতা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেন না। ফলে নৃত্যশিল্পের আসল সৌন্দর্য অনেক ক্ষেত্রেই অপূর্ণ থেকে যায়। তাই আমি মনে করি, প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু গুরু–শিষ্য পরম্পরাই নৃত্যশিল্পের শুদ্ধ ও গভীর শিক্ষার মূল ভিত্তি। এই ধারাকে ধরে রাখাই একজন সত্যিকারের শিল্পীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ভাইরাল’ নাচকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
লায়লা হাসান: সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ভাইরাল’ নাচকে আমি পুরোপুরি ইতিবাচক বা পুরোপুরি নেতিবাচক—দুটোর কোনোটাই একপাশে রেখে দেখি না, বরং মিশ্রভাবে দেখি। ভাইরাল নাচ অবশ্যই কিছু ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে নাচের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে, নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে এবং কোনো কোনো সময় ভালো মানের কনটেন্ট হলে তা অনুপ্রেরণাও দিতে পারে। যদি সেই নাচ সঠিক ব্যাকরণ, শৃঙ্খলা ও নান্দনিকতার সঙ্গে করা হয় এবং কেউ সেটাকে নিজের শিল্পচর্চার সঙ্গে মিলিয়ে গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে সেটি কিছুটা হলেও শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ভাইরাল নাচ শিল্পকে খুব বেশি এগিয়ে নেয় না। ফলে এগুলো অনেক সময় নাচের গভীরতা, ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় ভিত্তিকে পুরোপুরি উপস্থাপন করতে পারে না। এ কারণে শিল্পের মূল শুদ্ধতা ও শৃঙ্খলার জায়গাটি কিছুটা হালকা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই আমার মতে, ভাইরাল নাচকে আমি ‘শিল্পের মূল চালিকা শক্তি’ হিসেবে দেখি না। তবে যদি কেউ বেছে বেছে, বিচার-বিবেচনা করে গ্রহণ করেন এবং নিজের প্রশিক্ষণ ও চর্চার সঙ্গে যুক্ত করেন, তাহলে সেটি সীমিতভাবে উপকারী হতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়—ভাইরাল নাচ কিছুটা জনপ্রিয়তা তৈরি করে, কিন্তু সত্যিকারের নৃত্যশিল্পের গভীরতা ও মানকে এগিয়ে নিতে পারে কেবল তখনই, যখন সেটি শৃঙ্খলিত চর্চা ও শিল্পবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়।
বৈশ্বিক প্রভাবের মধ্যে বাংলাদেশের নাচের অবস্থান কী?
লায়লা হাসান: বৈশ্বিক প্রভাবের মধ্যে বাংলাদেশের নাচের অবস্থানকে আমি একটি পরিবর্তনশীল কিন্তু শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো অবস্থান হিসেবে দেখি। বিশ্বায়নের ফলে বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাচ ও সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের নৃত্যচর্চার একটি পরিচিতি ও সংযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে কিছু শিক্ষার্থী ও শিল্পী অন্য দেশের নাচ অনুসরণ বা অনুকরণে আগ্রহী হয়েছেন, আবার অনেকে নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধরে রেখে সেটাকেই চর্চা ও প্রসারের চেষ্টা করছেন। এই দুই ধারা এখন পাশাপাশি চলছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতনতা তৈরি হয়েছে। সরাসরি অনুকরণের প্রবণতা কিছুটা কমেছে বলে মনে হয় এবং অনেকেই বুঝতে শিখেছেন যে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখা জরুরি। ফলে যাঁরা সত্যিকারের নৃত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গেই থাকতে চাইছেন এবং সেটাকে ভিত্তি করেই কাজ করছেন। অবশ্যই কিছু ক্ষেত্রে ফিউশন বা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হচ্ছে, যা বৈশ্বিক প্রভাবের অংশ। তবে সেটি যদি আমাদের নিজস্ব নাচের সৌন্দর্য ও শুদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে, তাহলে সেটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখা যায়। সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক প্রভাব থাকলেও বাংলাদেশের নাচ এখনো তার নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আমরা ধীরে ধীরে এমন একটি অবস্থানের দিকে যাচ্ছি, যেখানে আধুনিকতার সঙ্গে সংযোগ থাকলেও শিকড়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটছে না—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
মঞ্চভিত্তিক নাচ আর ভিডিও বা রিলস—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কীভাবে দেখেন?
লায়লা হাসান: আমার দৃষ্টিতে মঞ্চভিত্তিক পারফরম্যান্সই বেশি চ্যালেঞ্জিং এবং স্থায়ী মূল্যবোধসম্পন্ন। কারণ, মঞ্চে একজন শিল্পীকে দীর্ঘদিনের অনুশীলন, ত্যাগ এবং নিবিড় চর্চার মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। সাত-আট বছর কিংবা তার বেশি সময় ধরে কঠোর সাধনার পর একজন সত্যিকারের মঞ্চশিল্পী তৈরি হন। তিনি কেবল নাচ শেখেন না—নাচকে ধারণ করেন, আত্মস্থ করেন, তারপর সেটি দর্শকের সামনে জীবন্ত করে তোলেন। মঞ্চে কোনো ‘রিটেক’ নেই; একবারেই নিজের দক্ষতা, অনুভূতি ও নিয়ন্ত্রণ দিয়ে পারফর্ম করতে হয়—এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে স্ক্রিনভিত্তিক পারফরম্যান্স—যেমন রিলস বা ভিডিও তুলনামূলকভাবে তাৎক্ষণিক এবং অনেক ক্ষেত্রে সহজলভ্য। এখানে বারবার চেষ্টা করার সুযোগ থাকে, এডিটিং থাকে। ফলে একটি পারফরম্যান্সকে নিখুঁত করে তোলা সহজ হয়। অবশ্যই কিছু মানসম্মত কাজ এখানে হচ্ছে, তবে সব সময় তা গভীর সাধনা বা দীর্ঘ প্রশিক্ষণের ফল নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অনুকরণ করে দ্রুত তৈরি করা সম্ভব, যা এর স্থায়িত্ব ও গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাই বলা যায়, স্ক্রিন পারফরম্যান্সের নিজস্ব গুরুত্ব থাকলেও মঞ্চের যে শক্তি, গভীরতা ও স্থায়িত্ব—সেটি অনেক বেশি। মঞ্চ একজন শিল্পীর প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই করে, সে কারণেই এটি বেশি চ্যালেঞ্জিং।
পেশা হিসেবে নাচ—এখনকার বাস্তবতা কী?
লায়লা হাসান: নৃত্যশিল্পকে পেশা হিসেবে নেওয়া আমাদের দেশে এখনো পুরোপুরি নিরাপদ বা নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেনি—এটাই বাস্তবতা। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিল্পী কিংবা শিক্ষকের অভাব নেই, দেশ-বিদেশে তালিম নেওয়া অনেক প্রতিভাবান মানুষ আছেন। কিন্তু তাঁদের কাজের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষেত্র, নিয়মিত প্ল্যাটফর্ম এবং স্থায়ী আয়ের সুযোগ এখনো খুব সীমিত। কয়েকজন শিল্পী অবশ্য নাচকে পেশা হিসেবে নিয়ে টিকে আছেন—বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দিয়ে কিছু আয় করছেন। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত–মারিয়াম বা ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে কেউ কেউ কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে নাচ শিখিয়েও কিছু উপার্জন হয়। কিন্তু এই আয়ে স্থায়ীভাবে সংসার চালানো বেশির ভাগের জন্যই কঠিন। ফলে বাস্তব চিত্রটা হলো—অধিকাংশ নৃত্যশিল্পীকেই অন্য কোনো পেশায় যুক্ত থাকতে হয় জীবিকার নিরাপত্তার জন্য, আর নাচকে চালিয়ে যেতে হয় ভালোবাসা ও সাধনার জায়গা থেকে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই অনিশ্চয়তা নিয়ে হতাশা ও আক্ষেপ দেখা যায়, কারণ তারা জানে—শুধু নাচ শিখে নিশ্চিত কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও তুলনামূলকভাবে কম এবং যা আছে, তা মূলত সংগঠনকেন্দ্রিক, ব্যক্তি শিল্পীর জন্য নিয়মিত সহায়তা খুব বেশি নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, নৃত্যশিল্প এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে এটিকে একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন। তবে সম্ভাবনা একেবারে নেই, এমনও নয়। সঠিক পরিকল্পনা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্ষেত্র বিস্তারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে হয়তো নাচের মধ্যেই স্বনির্ভর হয়ে ওঠার পথ আরও উন্মুক্ত হবে—এই আশাই রাখা যায়।
নারী নৃত্যশিল্পীদের অবস্থান কীভাবে বদলেছে?
লায়লা হাসান: আমার দৃষ্টিতে নারী নৃত্যশিল্পীদের জন্য পরিস্থিতি আগের তুলনায় অবশ্যই অনেকটা সহজ হয়েছে এবং ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে অনেক সামাজিক বাধা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা এবং গ্রহণযোগ্যতার সংকট ছিল, এখন সেই অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। নারীরা এখন আগের চেয়ে বেশি স্বাধীনভাবে প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন, দলগতভাবে কাজ করতে পারছেন, বিভিন্ন মঞ্চে ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারছেন। অনেক মানসম্পন্ন নারী নৃত্যশিল্পী এখন নিয়মিত ডাক পাচ্ছেন, পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছেন এবং নিজেদের কাজের মাধ্যমে আয়ও করছেন। ফলে তাঁরা অনেকটা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। এখন তাঁরা শুধু পারফর্ম করছেন না, বরং নিজেদের জায়গা নিজেরাই তৈরি করছেন—প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, দল গঠন করছেন, বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন এবং নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ অর্জন করছেন। আগে যে চলাফেরা বা অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা বাধা ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—নারী নৃত্যশিল্পীরা এখন নিজেদের মূল্য বুঝতে শিখেছেন এবং আত্মপ্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা আর শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকছেন না, বরং নিজেরাই সুযোগ তৈরি করে নিচ্ছেন। তাই বলা যায়, নারী নৃত্যশিল্পীদের জন্য পরিবেশ এখন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সহায়ক, উন্মুক্ত এবং আত্মপ্রকাশের জন্য অনুকূল হয়ে উঠেছে।
নতুন প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?
লায়লা হাসান: নতুন প্রজন্মের নৃত্যশিল্পীদের জন্য আমার পরামর্শ হলো—প্রথমেই নিজের শিল্পটিকে গভীরভাবে শেখার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। নাচ শুধু অঙ্গভঙ্গি বা অভিব্যক্তির বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস, ব্যাকরণ, নিয়মকানুন ও একটি সুগভীর ঐতিহ্য। তাই এই শিল্পকে সত্যিকার অর্থে আয়ত্ত করতে হলে সেটিকে জানতে, বুঝতে এবং অনবরত চর্চার মাধ্যমে নিজের ভেতরে ধারণ করতে হবে। একজন শিল্পী হঠাৎ করে তৈরি হন না। দীর্ঘদিনের সাধনা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। যদি শেখার জায়গাটাই মজবুত না হয়, তাহলে সেই ঘাটতি খুব দ্রুতই প্রকাশ পায়। ফাঁকি দিয়ে বা অল্প জ্ঞান নিয়ে বেশি দিন এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, শিল্পের ভান্ডার যদি পূর্ণ না হয়, তাহলে তা একসময় ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু সঠিকভাবে শিখে, বুঝে এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারলে সেটিই হবে একজন শিল্পীর আসল অর্জন, যা দর্শকের কাছেও গ্রহণযোগ্য ও উপভোগ্য হয়ে উঠবে। তাই আমি বলব—নিষ্ঠাবান হও, নিয়মিত চর্চা করো এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাও, যেখানে তুমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেশ-বিদেশে নিজের শিল্পকে উপস্থাপন করতে পারো।