সামনে নতুন কী কাজ আসছে?
নুসরাত ফারিয়া : ‘লাপাত্তা’র কাজ শেষ হলেও পরিচালক মেহেদী হাসান একটি গান করার কথা ভাবছেন। সেটি যদি হয় কাজ বাকি থাকবে। ‘লজ্জা’র শুটিংও শেষ হয়েছে ৬০ শতাংশ, আরও ৪০ শতাংশ বাকি। এর বাইরে একটি সিনেমা ও একটি ওয়েব ফিল্ম নিয়ে কথা চলছে, তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অনম বিশ্বাসের পরিচালনায় ডিসেম্বরে আমার একটি সিনেমা মুক্তির কথা রয়েছে।
প্রথম আলো :
আর কলকাতা?
নুসরাত ফারিয়া : না, আপাতত কলকাতায় কাজ করা হচ্ছে না। তবে হতে পারে। যেহেতু ওদের সঙ্গে প্রতিবছর একটা করে গানের কাজ হয়, যদি যাওয়া-আসার সমস্যা না থাকে, তাহলে হয়তোবা সিনেমারও কাজ আবার শুরু করব।
প্রথম আলো :
তার মানে নতুন গান আসছে?
নুসরাত ফারিয়া : হ্যাঁ, আগামী ঈদে নতুন গান রিলিজের পরিকল্পনা চলছে।
‘লজ্জা’য় আপনার সঙ্গে আছেন আজমেরী হক বাঁধন। একই সিনেমায় সমসাময়িক দুজন শিল্পী থাকলে চরিত্রের তুলনা টানা হয়। সিনেমায় যুক্ত হওয়ার আগে চরিত্রের গুরুত্ব নিয়ে ভেবেছেন?
নুসরাত ফারিয়া : এক বছর আগে ‘কন্যা’ গানের শুটিংয়ের সময় পরিচালক এম এইচ খোকন আমাকে লজ্জার গল্প শোনান। গল্পটি শুনে মনে হয়েছিল, অনেক সম্ভাবনা আছে। আমাদের দেশে এ ধরনের অপরাধনির্ভর গল্পে কাজ খুব একটা হয় না। এরপর এক বছর ধরে নির্মাতারা গল্পটি নিয়ে কাজ করেছেন। বাঁধন আপুর চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপন খুব জরুরি ছিল। আমার চরিত্রের ক্ষেত্রেও একই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্যই চরিত্রের প্রয়োজনে অনেকটা ওজন কমিয়েছি। বাঁধন আপুর সঙ্গে আমার আগে থেকেই ভালো বোঝাপড়া ছিল, তাই একসঙ্গে কাজ করতে কোনো সমস্যা হয়নি। আমার মনে হয় দর্শক অভিনয়ের একটি সুন্দর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখতে পাবেন। আমি নিজেকে অভিনয়ের দিক থেকে খুব শক্তিশালী মনে করি না। তবে বাঁধন আপু খুব ভালো অভিনয় করেন। আমাদের দুজনকে একসঙ্গে পর্দায় দেখে দর্শক গল্পটির নতুন একটি দিক আবিষ্কার করতে পারবেন।
প্রথম আলো :
দুজনের উপস্থিতি গল্পে কতটা নতুন মাত্রা দেবে বলে মনে হয়?
নুসরাত ফারিয়া : আমার মনে হয়, দর্শক অভিনয়ের একটি সুন্দর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখতে পাবেন। আমি নিজেকে অভিনয়ের দিক থেকে খুব শক্তিশালী মনে করি না। তবে বাঁধন আপু খুব ভালো অভিনয় করেন। আমাদের দুজনকে একসঙ্গে পর্দায় দেখে দর্শক গল্পটির নতুন একটি দিক আবিষ্কার করতে পারবেন।
প্রথম আলো :
এমন কোনো চরিত্র আছে, যাতে দর্শক আপনাকে আগে দেখেননি, অথচ অভিনয় করতে চান?
নুসরাত ফারিয়া : গানে, মঞ্চে ও বিজ্ঞাপনে আমার গ্ল্যামার তুলে ধরার সুযোগ আছে। সিনেমায় অভিনয়ের অন্য দিক তুলে ধরতে চাই। চরিত্রের প্রয়োজনে চেহারা বা শারীরিক গঠনে পরিবর্তন আনতেও এখন আমার আপত্তি নেই। আমার কাছে চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চরিত্র হয়ে ওঠার জন্য শারীরিক পরিবর্তন আনতেও কি প্রস্তুত?
নুসরাত ফারিয়া : চরিত্রের প্রয়োজনে যা করা দরকার, আমি তা-ই করছি। ‘ইন্সপেক্টর নটি কে’ সিনেমায়ও পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেছি, তবে সেটি ছিল গ্ল্যামারনির্ভর, বাণিজ্যিক ঘরানার। ‘লজ্জা’য়ও পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করছি, কিন্তু দুটি চরিত্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এ ধরনের পরিবর্তন আনারই চেষ্টা করছি।
প্রথম আলো :
১১ বছর ধরে অভিনয় করছেন, এখন এসে কি মনে হয় দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের অভিনয়ের সত্তা আবিষ্কারের সুযোগ কম ছিল?
নুসরাত ফারিয়া : বাস্তবতা হলো বছরে আমাদের খুব বেশি সিনেমায় কাজ করার সুযোগ থাকে না। আবার সব সিনেমা দর্শক হলে গিয়ে দেখেনও না। প্রত্যেক শিল্পীই চান তাঁর সিনেমা দর্শক দেখুক। এই চাওয়াটা অনেক সময় কাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। তবে আমি সময়োপযোগী কাজ করতে চাই। ২০২৬ সালে এমন কাজ করতে চাই, যা এই সময়ের দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে, পুরোনো ধ্যানধারণায় আটকে থাকবে না। শুধু বেশি কাজ করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, দর্শকের কাছে প্রাসঙ্গিক থাকাটাই আসল।
প্রথম আলো :
তারকার জীবন বাইরে থেকে খুব ঝলমলে। কিন্তু প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা, কাজের অনিশ্চয়তা কিংবা মানুষের মন্তব্যের চাপও আছে। এসবের প্রভাব কি কখনো ব্যক্তিগত নুসরাত ফারিয়ার ওপর পড়ে?
নুসরাত ফারিয়া : না। আমার পরিবার ও আশপাশের মানুষ আমাকে মাটির কাছাকাছি থাকতে সাহায্য করেন। শুটিংয়ে যতটা আদর-যত্ন পাই, বাড়িতে ঠিক ততটাই কম পাই! (হাসি) ছোটবেলা থেকে বড়দের সম্মান করা ও মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেশার শিক্ষা পেয়েছি। সেটি এখনো ধরে রাখার চেষ্টা করি। তবে সামাজিক মাধ্যমে মানুষের মন্তব্য অন্যদের মানসিকভাবে আঘাত করতে পারে। কেউ হয়তো সেগুলোকে শক্তি হিসেবে নেন, আবার কেউ হতাশায় ভুগতে পারেন। তাই মন্তব্য করার আগে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগতভাবে আমি কিছু নীতি মেনে চলি, এত বছর ধরে সেভাবেই কাজ করছি।
সাফল্য মানুষকে অনেক কিছু দেয়, আবার কিছু বিষয় থেকে দূরেও সরিয়ে দেয়। আপনার জীবনে এমন কোনো মূল্য কি দিতে হয়েছে, যেটি বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই?
নুসরাত ফারিয়া : সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বেশি দিতে হয়েছে সময়। মানুষের মনে জায়গা করে নিতে হলে দীর্ঘদিন ধরে কাজের মধ্য দিয়ে আস্থা অর্জন করতে হয়। আমি ১৭–১৮ বছর বয়স থেকে কাজ করছি। এ বছর আমার ৩১ পূর্ণ হয়েছে। জীবনের বড় একটা সময় কাজের পেছনে কেটেছে, যে সময়টা অনেকে অন্যভাবে উপভোগ করেন। তাই আমার কাছে সাফল্যের পেছনে দেওয়া সময়টাই সবচেয়ে বড় ত্যাগ। অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার গায়ে সামান্য আঁচড় লাগলেও দেশের মানুষ যেভাবে আমাকে আগলে রেখেছেন, সুরক্ষা দিয়েছেন, তা আমার জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি।
প্রথম আলো :
বিয়ে নিয়ে আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত নারীদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখেন—নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ে, নাকি মানসিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ?
নুসরাত ফারিয়া : নির্দিষ্ট বয়স বলতে আসলে কী বোঝায়? আমার মনে হয় বয়সের চেয়ে ম্যাচিউরিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ—নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই। একা থাকা সহজ, কিন্তু সংসার করতে হলে বিশেষ বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য ও বোঝাপড়া প্রয়োজন। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের আগে মানুষটিকে ভালোভাবে চেনা, বোঝা এবং নিজের অহংবোধ নিয়ন্ত্রণও জরুরি। আমার বিয়ের সিদ্ধান্তও নেব তখনই, যখন মনে হবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে কিছুটা থিতু হতে চাই। আর বিয়ের পর আবার নতুন কোনো লক্ষ্যে ছুটতে ইচ্ছা করলে জীবনসঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে ছুটব। আশা করছি, এই মানসিক প্রস্তুতি শিগগিরই চলে আসবে, তখন বিয়ে করব। (হাসি)
প্রথম আলো :
তার মানে আপনার বিয়ের একটা ইঙ্গিত পাওয়া গেল। প্রেম কিংবা বিয়ের ক্ষেত্রে একজন মানুষকে বেছে নেওয়ার সময় আপনার কাছে কোন গুণটি সবচেয়ে জরুরি...
নুসরাত ফারিয়া : আমার কাছে বন্ধুত্ব সবচেয়ে জরুরি। দুজন মানুষের একে অপরকে ভালো লাগতে হবে, একসঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতে হবে। জীবনে অনেক কিছু বদলে যাবে, সন্তান বড় হয়ে নিজের পথে চলে যাবে; দিন শেষে দুজন মানুষই একসঙ্গে থাকবে। তাই সারা জীবন যার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে, এমন কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া জরুরি। ভালোবাসার পাশাপাশি একে অপরের প্রতি ভালো লাগা ও বন্ধুত্বও থাকতে হবে।
তারকাদের সংসার ভাঙলে অনেক সময় বিচ্ছেদের কারণ না জেনেই একজনকে দোষারোপ করা হয়...
নুসরাত ফারিয়া : একসময় সমাজ কী বলবে, সেই ভয়ে অনেক মানুষ অসুখী সম্পর্কেও থেকে যেতেন। এর প্রভাব তাঁদের নিজেদের পাশাপাশি সন্তানদের ওপরও পড়ত। এখন মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলছেন, পরামর্শ নিচ্ছেন—কারণ সম্পর্কের নানা সমস্যাকে তাঁরা বুঝতে শিখেছেন। দুজন মানুষ একসঙ্গে সুখী না হলে শুধু লোকের কথার ভয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে মতের অমিল আর কারও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া এক বিষয় নয়। কেউ ভুল করলে সেটাকে সমর্থন করা যায় না। অন্য কারও ক্ষতি না করে দুজন মানুষ নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন, আর সমাজেরও সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত।
প্রথম আলো :
সময়ের সঙ্গে মানুষের স্বপ্ন, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন বদলায়। দুজন মানুষের মধ্যে এই পরিবর্তন দূরত্ব তৈরি করলে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত, নাকি আলাদা পথে হাঁটাও স্বাভাবিক? এ ক্ষেত্রে আপনার জীবনদর্শন কী বলে?
নুসরাত ফারিয়া : কারও প্রতি ভালোবাসা থাকলে সম্পর্কটা নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত। কাউকে একসময় ভালোবেসে থাকলে তাকে ঘৃণা করা আমার কাছে কঠিন। তবে সম্পর্ক ঠিক করার কোনো সুযোগ না থাকলে তিক্ততা বাড়ার আগেই সম্মানের সঙ্গে সরে আসা ভালো। আমার জীবনদর্শন একটু আলাদা। বন্ধুরা বলেন, আমি নাকি সব সমস্যার সমাধান দিতে পারি! (হাসি)
প্রথম আলো :
পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান—শুধু অভিনেত্রী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও? পেশাগত সাফল্যের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনে এমন কোনো স্বপ্ন আছে কি, যা পূরণ হলে জীবনকে সার্থক মনে হবে?
নুসরাত ফারিয়া : স্বপ্নের তো শেষ নেই। আজ আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারাটাও ১৪ বছর আগের আমার একটি স্বপ্ন ছিল। আমি সব সময় বলি, নিজের স্বপ্নের জীবনই যাপন করছি। ভবিষ্যতে পাঁচ বছর পর হয়তো আইন পেশায় থাকব, নয়তো সংসার ও সন্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকব, আবার দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবেও ঘুরে বেড়াতে পারি। আমি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে রাখতে চাই না। তবে জীবনের যে অবস্থানেই থাকি, সুখী ও তৃপ্ত থাকতে চাই। আমার কাছে সুখ নির্ভর করে না ব্যাংকে কত টাকা আছে, কত দামি গাড়ি বা ফ্ল্যাটে থাকি তার ওপর। জীবনে এমন সময় গেছে, যখন সবকিছু ছিল, শুধু সুখটা ছিল না। তাই এখন নিজের ভালো থাকাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই।