যদি ভেসেও যাই, মরেও যাই, শটটা দিতে চাই

কক্সবাজারে ‘মৎস্যকন্যা’ নাটকের শুটিং শেষ করে সোমবার দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন সাফা কবির। ওই দিনই সন্ধ্যায় শোনালেন শুটিংয়ে অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতার গল্প। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের

প্রথম আলো:

কক্সবাজারের শুটিংয়ে আপনি ছাড়া আর কে কে ছিলেন?

সাফা কবির: আমি, খায়রুল বাসার ও পরিচালক সেরনিয়াবাত শাওন। আমাদের তিনজনের একটা সুন্দর জুটি আছে। আগেও আমরা সুন্দর কিছু কাজ উপহার দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ‘মৎস্যকন্যা’ করে মনে হয়েছে, নিরীক্ষাধর্মী একটি নাটক অভিনয়জীবনে যোগ হয়েছে।

প্রথম আলো :

কেন এমনটা মনে হয়েছে?

সাফা কবির: গল্পটা এক মৎস্যকন্যাকে নিয়ে। এটার জন্য মারমেইডের একটা কস্টিউম বানানো হয়েছে। প্রথমবারের মতো আন্ডারওয়াটার শুটিং করেছি। কক্সবাজারের প্রেসিডেন্ট বিচে এ অংশের শুটিং করেছি। এর বাইরে ইনানীতেও শুটিং করেছি।

প্রথম আলো:

আন্ডারওয়াটার শুটিং করতে কেমন লাগল?

সাফা কবির: শীতে আন্ডারওয়াটার শুটিং অনেক কষ্টের। তার মধ্যে মারমেইডের কস্টিউম পরে বেশি নড়াচড়া করা যায় না। সাঁতার কাটাও খুব চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু টিম খুব সহযোগিতা করেছে। একদিন তো টানা ছয় ঘণ্টা মারমেইড পোশাক পরে একভাবে বসে ছিলাম; নড়তে-চড়তে পারিনি। ওই পোশাক পরার পর আমাকে ধরাও যাচ্ছিল না। পোশাকটা এমনভাবে বানানো, যে ধরে, তারই অস্বস্তি হচ্ছিল। আমারও হয়েছে। এই পোশাকের কারণে শরীরের কোথাও চামড়া ছিলে গেছে। নাটক তো আমি অনেক দিন থেকে করছি, দর্শকদের নতুন কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা সব সময় থাকে। সে চিন্তা থেকে এমন চ্যালেঞ্জ নেওয়া। দর্শক একটা গল্পে নতুনভাবে দেখুক, এমনটাই চেয়েছি।

প্রথম আলো :

এ পোশাক কে বানিয়েছেন?

সাফা কবির: আমার বন্ধু সাগুফতা এই পোশাক বানিয়েছে। যখন যা বলি না কেন, সে করে দেয়। ১৫ দিন সময় লেগেছে। অনেক কষ্ট করেছে।

প্রথম আলো:

মারমেইডের পোশাক পরে সমুদ্রের পানিতে নেমে শুটিং করতে ভয় লাগেনি?

সাফা কবির: সিরিয়াস গল্প, দুঃখের গল্প অনেক করি; এ রকম ইলিউশনধর্মী কাজ বেশি করা হয়নি। এর আগে করেছিলাম ওয়েব ফিল্ম টিকিট। ‘মৎস্যকন্যা’য় মারমেইডের পোশাক পরে ঝাঁপ দিয়ে সাগরে ডুব দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে তৈরি ছিলাম। যে করেই হোক দৃশ্যটা করব, এমনই ছিল চাওয়া। পরিচালকসহ ইউনিটের সবাইকে বলেছিলাম, যদি ভেসেও যাই, মরেও যাই, আমি শটটা দিতে চাই। টিমকে এ–ও বলেছিলাম, যদি পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে উঠে না আসি, তাহলে তোমরা আমাকে নিয়ে এসো। অভিনয়জীবনে এমন ঝুঁকি কয়েকবার নিয়েছি, যা কখনো বলা হয়নি।

সাফা কবির
শিল্পীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

প্রথম আলো :

কী কী ঝুঁকি, কয়েকটা যদি বলতেন...

সাফা কবির: মনে পড়ছে, ইন্দোনেশিয়া সাগরপাড়ে একবার ‘অদৃশ্য ভালোবাসা’ নাটকের শুটিং করছিলাম। চিকন একটা পিলার ছিল ওখানে যেটা সাগরে চলে গেছে, শেষ মাথায় আমার কোমরপানি। পরিচালক মেহেদি হাসান বলছিলেন, তুমি যদি এই পিলারের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে, তাহলে শটটা ভালো হতো মনে হয়। বললাম, চলেন, করি। তিনি বললেন, তুমি পারবে? রাজি হতেই বললেন, না না দরকার নেই। কারণ, খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ ধরনের দৃশ্যে বাইরের দেশে কী হয়, শরীরটাকে কোনো একটা উপায়ে বেঁধে রাখে, এরপর শিল্পী কাজটা করেন। আমাদের তো সেভাবে কিছুই থাকে না। নিজ দায়িত্বে হেঁটে গেলাম, এরপর নিজ দায়িত্বে ফিরে এলাম। যখন ফিরলাম, টিম আমাকে বাহবা দিয়েছিল।

প্রথম আলো:

আপনি কি এমনিতে খুব সাহসী?

সাফা কবির: দেখে সবাই ভাবেন, আমি খুব নরম স্বভাবের; এটা করতে পারব না, ওটা পারব না। কিন্তু আমি খুবই সাহসী। অনেকের এমনও ধারণা, তুমি গ্রামে শুটিং করো? অথচ আমি গ্রামের এমন সব জায়গায় শুটিং করেছি, যেখানে বসার, থাকার জায়গা, এমনকি ওয়াশরুমও নেই।

প্রথম আলো :

এত কষ্টের পেছনে কোন ভাবনা কাজ করে?

সাফা কবির: অভিনয় ভালোবেসে করি। ব্যক্তিজীবনে আমি খুবই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন একজন মানুষ। আমার ওসিডিও আছে। বাসায় সামান্য ধুলাবালু চোখে পড়লে কাউকে না বলে নিজেই পরিষ্কার করি। অথচ শুটিংয়ে যখন যাই, ড্রেনের পাশে বসেও ভাত খাই। আমাদের এখানে বেশির ভাগ জায়গা শুটিংবান্ধব নয়। শিল্পীদের কমফোর্ট দিতে পারে না।

প্রথম আলো :

কিন্তু যত দূর জানি, আপনি তো আয়েশি জীবনে অভ্যস্ত।

সাফা কবির: সত্যিই আমি খুব প্রিভিলেজড সন্তান। মা–বাবার একমাত্র মেয়ে। এমনও হয়েছে, কখনো আমাকে এক গ্লাস পানিও ঢেলে খেতে হয়নি। একটাই স্বপ্ন আমার, নিজেকে একজন সফল অভিনেত্রী হিসেবে দেখা। যখন দুনিয়াতে থাকব না, তখন যেন কাজ দিয়ে মানুষের মনে থাকতে পারি। এ জন্য যত কষ্ট করা।

প্রথম আলো:

ছোটবেলা থেকে তো আপনি অভিনয় করেননি?

সাফা কবির: অভিনয়টা আমি খুঁজে বের করেছি। এটা করতে আমার ভালো লাগে। এটার প্রতি আমি নিবেদিতপ্রাণ। এর আগে মডেলিং, উপস্থাপনা, আরজেসহ অনেক কিছুই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে মনে হয়েছে, আমি অভিনয়টাই করতে চাই।

সাফা কবির
প্রথম আলো

প্রথম আলো :

শুটিংয়ে যে এত কষ্ট, আপনার মা–বাবা জানেন?

সাফা কবির: মা–বাবাকে কষ্টের কথা বলিই না। এখনো বাবাকে যদি বলি শরীরটা ভালো লাগছে না, জ্বর আসছে মনে হয়; বাবা সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, জ্বর নিয়ে কিসের শুটিং, তুমি না করে দাও, বাসায় চলে আসো। আমাকে এমনও বলা হয়েছিল, নয়টার পর কোনো শুটিংয়ের দরকার নেই। আমার মা–বাবা এখনো বলেন, এত কষ্ট করার দরকার নেই। শুধু প্যাশনের কারণে এটা করছি। জীবনে এমনও দিন গেছে, কুহেলিকা নামের একটা ওয়েব ফিল্মের জন্য টানা ২৮ ঘণ্টা শুটিং করেছি। রাঙামাটিতে। যদিও বিরতি ছিল। কিন্তু টানা ২৮ ঘণ্টা শুটিং সেটে স্ট্যান্ডবাই ছিলাম। দেখা গেছে, ঘুমে পড়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে ডাক পড়ছে, এটাও খুবই কষ্টকর অভিজ্ঞতা ছিল।

প্রথম আলো :

সবশেষে জানতে চাই, মা–বাবা তাঁদের মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলেন?

সাফা কবির: আমার পরিবার থেকে কোনো চাপ নেই। আমারও আপাতত এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। কাজ করছি। কাজ করে যাব।

সাফা কবির
শিল্পীর ইনস্টাগ্রাম থেকে