আসামি আমার দিকে তাকিয়ে বলেছেন, ‘স্যার, আপনাকে কোথায় দেখেছি’

স্বপ্ন ছিল পরিচালক হওয়ার কিন্তু হয়েছেন অভিনেতা। পেশাগতভাবে তিনি একজন পুলিশের কর্মকর্তা। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি খন্দকার লেনিন চেষ্টা করেন অভিনয় ও পরিচালনা করে যেতে। সম্প্রতি ওয়েব ফিল্ম ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ ও ‘এসো ফিরি আলোর পথে’ মঞ্চনাটক নির্দেশনা দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। সাম্প্রতিক প্রথম আলোর মুখোমুখি হলেন এই অভিনেতা
খন্দকার লেনিন। ছবি: ফেসবুক

প্রথম আলো :

নাটক নির্দেশনার অভিজ্ঞতা কেমন?

খন্দকার লেনিন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করেছি। তখন থেকেই নাটকের সঙ্গে যুক্ত, নাটক নির্দেশনা দিয়ে প্রশংসিত হয়েছি। পরবর্তী সময়ে সামাজিক বক্তব্য রাখা যায়, এমন গল্প নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের পর প্রথম নির্দেশনা দিচ্ছি। এখন আমি গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের উদ্যোগে মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ প্রতিরোধে পথনাটক ‘এসো ফিরি আলোর পথে’ নির্দেশনা দিয়েছি। এর মধ্যে আমরা বিপুল সাড়া পাচ্ছি। মানুষকে সচেতন করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

প্রথম আলো :

কী হতে চেয়েছিলেন?

খন্দকার লেনিন: ইচ্ছা ছিল পরিচালক হওয়া। কিন্তু তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনার সময় বিজ্ঞাপনচিত্রে নাম লেখাই, সেটি জনপ্রিয় হয়। সংলাপটি তখন অনেকের মুখে মুখে ছিল, ‘আমার নাম মফিজ, ভাড়া হইছে ত্রিশ’। এই কনসেপ্ট নিয়ে পরে রেদওয়ান রনি নাটক নির্মাণ করেছেন। বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবে জনপ্রিয়তার পর তখন অনেকেই অভিনয়ের জন্য ডাকেন। কিছু কাজ করি। পরবর্তী সময়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়িয়েছি। কিন্তু নির্দেশনায় আর নিয়মিত হওয়া হয়নি।

খন্দকার লেনিন। ছবি: ফেসবুক

প্রথম আলো :

তখন তো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও আপনি তারকা?

খন্দকার লেনিন: হলে থাকতেই খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম। সবাই দেখে বলত, ‘আপনি সেই লোক না।’ যেখানেই যেতাম, চিনে ফেলত। আবার আমার শিক্ষকেরাও পরামর্শ দিতেন আরও ভালো করে শিখে অভিনয় শুরু করতে। সময়টা ভালোই কেটেছে।

প্রথম আলো :

বিজ্ঞাপনচিত্রে কীভাবে সুযোগ পেলেন?

খন্দকার লেনিন: শাহবাগে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সে এখন দেশের বাইরে পিএইচডি করতে গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সে যাচ্ছিল কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে। তার সঙ্গে সেখানে গেলাম। সেখানে অনেকেই অডিশন দিচ্ছে। আমি বসে আছি। সব শেষে হঠাৎ একজন আমাকে ডাকল। বলল অডিশন দিতে। যা করতে বলল, আমি করলাম। পরে দেখি আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম। এই তো সুযোগ। তারিক আনাম খান স্যার আমাকে অনেক সহায়তা করেছেন।

প্রথম আলো :

পরিচিতির কারণে মজার কোনো ঘটনা ঘটে?

খন্দকার লেনিন: এমন ঘটনা তো অনেক। গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) হিসেবে কাজের সূত্রে লুকিয়ে অনেক জায়গায় যেতে হয়। নইলে চিনে ফেলে। একবার আসামি ধরে গাড়িতে নিয়ে এসেছি, আসামি আমার দিকে তাকিয়ে বলেছেন, ‘স্যার, আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি।’ অনেক সময় পেশাগত কাজে রিমান্ডেও আসামি বলছে, ‘স্যার, আপনাকে চিনি। আপনার অভিনয় দেখেছি।’

খন্দকার লেনিন। ছবি: ফেসবুক

প্রথম আলো :

আপনি তো চাইলে অভিনয় ও নির্দেশনায় নিয়মিত হতে পারতেন...

খন্দকার লেনিন: আমরা যে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করি, তখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা যা ছিল, তাতে চাকরিই নিরাপদ মনে করেছি। পারিপার্শ্বিক কারণে আগে চাকরিতে যোগ দিই। পড়াশোনা শেষ করে আমি কিন্তু নির্মাতা হিসেবে সৈয়দ শামসুল হক, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, নাসরিন জাহানসহ অনেকের গল্প থেকে চিত্রনাট্য করার চেষ্টা করেছি। তখন যাদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল, পাইনি। ইচ্ছা আছে সামনে নির্দেশনা দেওয়ার।

প্রথম আলো :

শুনলাম নতুন মঞ্চনাটকের দল গড়ছেন?

খন্দকার লেনিন: হ্যাঁ। কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সহকর্মীকে নিয়ে এই থিয়েটার। সামাজিক সচেতনতামূলক গল্পগুলো নিয়েই কাজ করব।

প্রথম আলো :

ব্যস্ততার ফাঁকে অভিনয়ে কীভাবে সময় দেন?

খন্দকার লেনিন: এটা সময়–সুযোগ বুঝে। কখনো ছুটি নিতে হয়, কখনো সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিডিউল নিয়ে কাজ করি। অফিস আমাকে সহায়তা করে।

প্রথম আলো :

সম্প্রতি কোন কাজের জন্য বেশি প্রশংসিত হয়েছেন?

খন্দকার লেনিন: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ভাইয়ের ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’তে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছি। কাজটি করতে গিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। ফারুকী ভাইয়ের টিম অসাধারণ। সবকিছু আগে থেকে পরিকল্পিত থাকে। সামনে হয়তো ভাইয়ের সঙ্গে আরও কাজ হবে।

প্রথম আলো :

আর কী কাজ আসছে?

খন্দকার লেনিন: অনেক ধারাবাহিকে কাজের প্রস্তাব পাই। কিন্তু সময়ের অভাবে করা হয় না। ঈদে তিনটি নাটক প্রচারিত হয়েছে। তপু খান, সঞ্জয় সমদ্দার, হাসান রেজাউলসহ বেশ কয়েকজন নির্মাতার সঙ্গে নাটক, সিনেমা, সিরিজ নিয়ে কথা হয়েছে; সেই কাজগুলো করব।

প্রথম আলো :

নাটক বা ওটিটির পুলিশের চরিত্রগুলো নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

খন্দকার লেনিন: বেশির ভাগ সময় অসামঞ্জস্য থাকে। তখন খারাপ লাগে। গল্প ইতিবাচক-নেতিবাচক হতেই পারে। কিন্তু উপস্থাপন তো ঠিকমতো করতে হবে। বিষয়টি এমন নয় যে চোখে চশমা বা হাতে ওয়ারলেস থাকলেই চরিত্রটি হয়ে গেল। এখানে আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় রয়েছে। সম্প্রতি শিহাব শাহীন ভাইয়ের সিরিজ ‘গোলাম মামুন’ মুক্তি পেয়েছে। তাঁরা শুটিংয়ের আগে আমাদের সহায়তা নিয়েছেন। অপূর্ব ভাই (সিরিজটিতে গোয়েন্দা পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব) আমাকে ফোন দিয়েছেন, বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। ‘মুন্সিগিরি’র আগে পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী আমাদের অফিসে নিয়মিত এসেছেন। জেনে, বুঝে কাজ করেছেন। এটা খুব জরুরি।