প্রশ্ন :
জন্মদিন আপনার কেমন লাগে?
আমাদের বাড়িতে জন্মদিন সেভাবে পালন করা হতো না। একমাত্র আমার বড় ভাই (সাবেক প্রধান বিচারপতি) মোস্তফা কামালের জন্মদিনটা শুধু হইচই করে পালন করা হতো। গান হতো, কবিতা হতো, খাওয়াদাওয়া হতো।
প্রশ্ন :
আপনার জন্মদিন তাহলে প্রথম কবে পালন করা হল?
জন্মদিন সেদিনই পালন করা হয়, ১৯৫৬ সালে যেদিন আমি মেট্রিকে স্ট্যান্ড করলাম, সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হলাম। আমার রেজাল্ট বেরোল ২৬ জুন, ২৮ জুন ছিল আমার জন্মদিন। তখন আব্বা বলল, এইবার মীর্না মার (ফেরদৌসি রহমানের ডাক নাম) জন্মদিন হবে। তখন আমরা পুরানা পল্টনে থাকতাম। সেবারই প্রথম এবং বড় আয়োজনে আমার জন্মদিন পালন করা হলো। আমার বন্ধু, আব্বার বন্ধু, বড় ভাই–ছোট ভাইয়ের বন্ধু সবাই এসেছিল। বাড়ি ভর্তি মেহমান ছিল। শিল্পী সাহিত্যিকেরা এসেছিলেন। অনেক গান হয়েছে। আনোয়ার উদ্দিন খান, সোহরাব হোসেন চাচা, খন্দকার ফারুক আহমেদ, মাহমুদুন্নবী থেকে শুরু করে সবাই গান গেয়েছিলেন। সেই দিনটার কথা কথা খুব মনে পড়ে। আব্বা থাকতে ওই একবারই জন্মদিন পালন হয়েছিল। আমি মেট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট শেষে ইউনিভার্সিটি ভর্তি হলাম—দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় আব্বা মারা গেলেন। এরপর আমরা আর তেমন করে জন্মদিন পালন করিনি। বিয়ের পর বাচ্চারা তাদের আম্মার জন্মদিন পালন করত। আব্বা বলতেন, তোমার জন্মদিন তুমি কেন পালন করবে। জীবনকে এমনভাবে গড়ো যেন মানুষ তোমার জন্মদিন পালন করেন। এই কথাটা আমাকে খুব ভাবাত।
আব্বা বলতেন, তোমার জন্মদিন তুমি কেন পালন করবে। জীবনকে এমনভাবে গড়ো যেন মানুষ তোমার জন্মদিন পালন করেন। এই কথাটা আমাকে খুব ভাবাত।
প্রশ্ন :
আপনাকে কি পরিবারের সবাই মীর্না নামে ডাকত?
পরিবার ও কাছের লোকজন আমাকে মীর্না নামেই ডাকত। ভাইয়ের বন্ধুরাও এই নামেই ডাকত। চাচা-ফুফুরা মীর্না মা, মীর্না মা, বলে ডাকত। সেই ‘মীর্না মা’ ডাকার লোকের এখন খুব অভাব। তবে আমার ভাইয়ের ছেলে–মেয়ে ও তাঁদের বন্ধুরা আমাকে ময়না নামে ডাকে।
প্রশ্ন :
আশি বছরের জীবন। এই প্রজন্মের অনেকেও আপনার পূর্ব পুরুষ এবং আপনাকে চিনলেও আপনার পরিবার সম্পর্কে খুব একটা জানে না। তারা কে কি করেন?
আমার দুই ছেলে। একজন রুবাইয়াত রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে থাকে। সে ফেসবুকে চাকরী করছে। ওর তিন ছেলে–মেয়ে। আর ছোট ছেলে রাজিন রহমান, লন্ডনে থাকে। সেও ওখানকার একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরী করছে। ওর আবার দুই মেয়ে। আমার স্বামী রেজাউর রহমান এখন অবসরজীবন যাপন করছে। ও ছিল মেকানিক্যল ইঞ্জিনিয়ার। ওর একটা ইন্ডাষ্ট্রি ছিল, ফিল্টার তৈরির। দেশের একমাত্র ফিল্টার তৈরির প্রতিষ্ঠান। ছেলেরাও বাইরে চলে গেল, ফ্যাক্টরিও বিক্রি করে দিল।
প্রশ্ন :
শুনেছি আপনি আত্মজীবনী লিখছেন। কাজ কতদুর এগোল?
এই দুঃখে আমার আর ভালো লাগে না। বইটা লেখার কাজ শেষ করতে পারছি না। করোনা মহামারীর কারণে লেখায় খুব একটা মন বসাতে পারছিও না। তারপরও করছি। অল্প কিছু কাজ বাকি আছে। কিছুদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে আশা করি। এই বইয়ে আমার জন্ম থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত যা যা কিছু করেছি, যা যা করিনি, দুঃখ–বেদনা, সবকিছুই পাওয়া যাবে।
লেখায় খুব একটা মন বসাতে পারছিও না। অল্প কিছু কাজ বাকি আছে। এই বইয়ে আমার জন্ম থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত যা যা কিছু করেছি, যা যা করিনি, দুঃখ–বেদনা, সবকিছুই পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন :
আমরা দেখেছি আঙ্গুরবালা জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত গাইতেন। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের মতো শিল্পীরাও এখনো গাইছেন। আপনি শেষ কবে গেয়েছেন।
আমি ২০০৭–৮ পর্যন্ত টানা গান গেয়েছি। ছোটবেলা থেকে গলাটা আমাকে ট্রাবল দিত। তারপরও যে গান গেয়ে গেছি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া। আমার গলাটাকে আরও ক্ষতি করেছি, রাত জেগে জেগে সিনেমার গান রেকর্ডিং করে করে। তখন তো দিনরাত গান গাইতাম—হয় টেলিভিশন, নয় রেডিও, নাহয় সিনেমা নয়তো স্টেজ। সব জায়গাতেই ফেরদৌসীকে দরকার। করাচি, রাশিয়া, চীন—কত দেশে যে গানের জন্য যেতে হয়েছে। আমি গানের ওপরই ছিলাম। গলাটা তো আর মেশিন না, একটা অর্গান। যেহেতু আমার গলাটা আগে থেকে একটু নাজুক, তাই একটুতে ক্লান্ত হয়ে যাই। এই সত্বেও রাত জেগে জেগে গান করেছি।
তখন তো দিনরাত গান গাইতাম। সব জায়গাতেই ফেরদৌসীকে দরকার। করাচি, রাশিয়া, চীন—কত দেশে যে গানের জন্য যেতে হয়েছে। আমি গানের ওপরই ছিলাম। গলাটা তো আর মেশিন না, একটা অর্গান।
প্রশ্ন :
আমরা তো দেখি, দেশের গান গাওয়ার কাজটা রাত জেগেই করা হয়।
শিল্পীর জন্য এটা অনেক বড় ক্ষতি। এতে করে ঠিক সময়ে ঘুম হয় না। আবার গলার ওপর মেশিন চালানো হয়। আগে তো এক চ্যানেলেই সব রেকর্ড করা হতো, একজন ভুল করলে আবার নতুন করে শুরু করতে হতো। তখন একটা গান রেকর্ডিং হতে ২০–৩০ বার টেক করা হতো। অনেক সময় ৬–৭ টেকেও হয়ে যেত। এখন তো অবশ্য আলাদা।
প্রশ্ন :
কণ্ঠের নাজুকতার কারণেই কি তাহলে গান থেকে সরে আছেন?
একদমই তাই, কণ্ঠের কারণেই। কিছুদিন আগে পর্যন্তও চুপচাপ ঘরে বসে গাইতাম। এখন সেটাও পারছি না। গাইতে না পারার একটা বেদনা অনুভব করছি। তবে এমন না যে, আমি টেলিভিশনে বা স্টেজে, ফিল্মে গাইতে চাই। আমার হচ্ছে, ঘরে বসে প্রাণখুলে গাইতে পারলেই হয়। আর কিছুই না। রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত গাইতে চেষ্টা করি, সাধারণত যে গানগুলো সবসময় স্টেজে গাওয়া হয়নি। মনের জন্যই আমার গান, সেটা গাইতে পারলে একটু ভালো হতো। পারছি না বলেই একটু কষ্ট হচ্ছে আরকি।
প্রশ্ন :
গান তো নিশ্চয় শোনেন। ইদানীং নতুন কিংবা পুরোনো শিল্পীদের এমন কোনো গান শুনেছেন, যা আপনার ভালো লেগেছে।
গান আমি খুবই শুনি। নতুন শিল্পীদের যাঁরা টেলিভিশনে গাইতে আসে, সবার গানই কমবেশি শোনা হয়। যেহেতু পুরোনো কালের মানুষ, তাই উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রতি একটা দূর্বলতা আছে। তাই কারো কণ্ঠে ক্ল্যাসিক্যাল শুনলে মনটা ওদিকেই চলে যায়। খুব শুনতে ইচ্ছে করে। ক্ল্যাসিক্যাল গানের প্রচুর রেকর্ডস এবং সিডিও আমার আছে, কিন্তু বাজানোর যন্ত্রগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ওগুলো ঠিকঠাক করলে আবার শোনা হবে।
প্রশ্ন :
একদম তরুণদের গানও শোনা হয় তাহলে। কেমন লাগে? কোনো পরামর্শ আছে কি?
টিভিতে গাইছে যাঁরা তাদের গান শুনি। কয়েকজনের কণ্ঠ তো অপূর্ব। কিন্তু যেটা আমি সবসময় ফিল করি, আরেকটু বোধ হয় সাধনার দরকার। যেটা হয়, আমরা বিকাশ হয়ে যাওয়ার আগে প্রকাশ হয়ে যাই। বেশিরভাগের যেন প্রকাশ করার ইচ্ছাটাই বেশি। কখন সাজগোজ করে টেলিভিশনে গান করব, এই প্রবণতাই যে বেশি। সবার দৃষ্টিতে আসার আগে দরকার নিজেকে তৈরি করা। এই যেমন, আরেকটু সাধনা। আব্বাও বলতেন, ভিত্তিটা শক্ত হতে হবে। গেয়ে অল্পদিনেই নামধাম করে ফেলা যায়, কিন্তু টিকে থাকার জন্য সাধনার বিকল্প নেই। একটা জায়গায় ওঠে গেলে, যদি ভিত না থাকে তাহলে তো নিচে পড়তে হবে। টিকে থাকাটাই অনেক কঠিন। তাই নতুনদের বেসিক ভয়েজ ট্রেনিংটা আরেকটু দরকার।
কয়েকজনের কণ্ঠ তো অপূর্ব। আরেকটু বোধ হয় সাধনার দরকার। বেশিরভাগের যেন প্রকাশ করার ইচ্ছাটাই বেশি। কখন সাজগোজ করে টেলিভিশনে গান করব, এই প্রবণতাই যেন বেশি।
প্রশ্ন :
আশি পার করেছেন। এই সময়ে এসে কী কখনো মনে হয়েছে, জীবনটা যেভাবে কাটাতে চেয়েছিলেন, সেভাবে পেরেছেন?
সত্যি কথা বলতে, আমি জীবনকে নিয়ে অত স্বপ্ন দেখিনি। আমাকে নিয়ে যিনি বেশি স্বপ্ন দেখেছেন, তিনি আমার আব্বা। তিনি চেয়েছিলেন, আমার মেয়ে সিএসপি অফিসার হবে, পড়াশোনায় তুখোড় হবে। ভালো স্কুলে পাঠিয়েছেন, ভালো ওস্তাদ রেখেছেন, গানেও তুখোড় হবে। একটামাত্র মেয়ে, তাঁকে নিয়ে বাবার প্রচুর স্বপ্ন ছিল। আমার বড় ভাই, হি রিটায়ার্ড অ্যাজ এ চিফ জাস্টিস, এর চেয়ে বেশি আর কী হবে। হয়তো প্রেসিডেন্ট হবেন, এর বেশি তো আর না। আব্বাসী ভাই, তার মতো করে বড় হয়েছেন। আমি এমন কিছুই করি নাই, কিন্তু আব্বা বেঁচে থাকলে হয়তো খুশিই হতেন। জীবনে যতটুকু করেছি তাতে আমি সন্তুষ্ট। হয়তো আমি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হতে পারতাম। আব্বার খুব খুব শখ ছিল, আমি যেন পিএইচডি করি। প্রচুর অফার ছিল, কিন্তু গানের চাপের কারণে ওদিকে মন দিতে পারিনি। তার জন্য আমার দুঃখও নেই। জীবনে আমার চাওয়ার কিছুই ছিল না। জীবনকে নিয়ে আমি কখনোই স্বপ্ন দেখিনি। যা হয়েছে তাতে আমি খুশি। সংগীত নিয়ে বিদেশে পড়েছি। না চাইতে সৃষ্টিকর্তা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ। তাই কোনো অনুতাপ, অনুশোচনা নেই।
প্রশ্ন :
আমরা দেখি অনেকে অল্প বয়সে অনেক বেশি কাবু হয়ে যান। আপনি এখনো সজীব, সতেজ। আপনার জীবনের দর্শন কী?
আমি সব সময় প্রাণবন্ত থাকার চেষ্টা করেছি। হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করেছি। নিজেকে কেউ দুখি দুখি ভাবলে, একটা সময় কিন্তু দুখীই হয়ে যায়। আমি খুব অল্প অল্প জিনিসে আনন্দ খুঁজে পেতে চেষ্টা করি। সেটাই হয়তো কারণ। মানুষের জীবনে তো অনেক না পাওয়ার গল্প থাকে। না পাওয়ার দুঃখের চেয়ে অল্প পাওয়াটাই আমাকে বেশি আনন্দ দেয়।
প্রশ্ন :
প্রথম যেদিন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিনের কথা কি মনে আছে?
অনেক বেশি মনে পড়ে। আব্বার সঙ্গে গিয়েছিলাম, কলকাতার মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে। গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। বাবা চেয়েছিলেন, আমি যেন গান গাই। আমি গাইলাম ‘শুধু কাঙালের মতো চেয়েছিনু তার মালাখানি’। এরপর নাজিমউদ্দিন রোডে ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে সাত বছর বয়সে গাইলাম। সম্ভবত ১৯৪৮ সাল। বেতারে তখন রবীন্দ্রসংগীতই হতো।
প্রশ্ন :
করোনার এই সময়ে আপনার রোজকার রুটিন কী?
বেশিরভাগ সময়ে মোবাইলে সময় কাটে। কোনোদিন ভাবিনি, জীবনে এমন দিন দেখতে হবে। জীবনের শেষের দিনগুলো একটু কষ্টে কাটছে মনে করছি। তারপরও ভালো আছি। বই পড়ি, গান শুনি, লেখালেখি করি। তবে মনোযোগ দিতে পারি না। মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত। কাল কী হবে বুঝতে পারছি না। দিনটাই শুরু হয় মৃত্যুর খবর পেয়ে, আতঙ্ক নিয়ে। টেলিভিশন অন করলেই ভাবতে থাকি, না জানি আজ কোন পরিচিতজনের মৃত্যুর খবর শুনতে হবে!
প্রশ্ন :
ঘর থেকে একেবারেই বের হন না?
দেড় বছরে মাত্র তিন দিন ঘরে থেকে বের হয়েছি। এর মধ্যে দুইদিন ভ্যাকসিন নিতে আর একদিন এক্সরে করতে হাসপাতালে যাওয়া।