মনে হয়েছে, অদ্ভুত একটা রসায়নও ছিল তাঁদের দাম্পত্যের মধ্যে
কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে জয়া আহসান অভিনীত নতুন চলচ্চিত্র ‘ঝরা পালক’। কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন অবলম্বনে তৈরি এ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন কবির স্ত্রীর চরিত্রে। সায়ন্তন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবিটিসহ অন্যান্য প্রসঙ্গে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় কথা হয় জয়ার সঙ্গে।
প্রশ্ন :
আপনি ঢাকায়, নাকি কলকাতায়?
এখন ঢাকার বাসায় আছি।
প্রশ্ন :
দর্শকের সঙ্গে তাহলে মুক্তি পাওয়া ছবিটি দেখা হলো না। মুক্তির আগে নিশ্চয় দেখেছেন?
দেখেছি তো অবশ্যই। মুক্তির আগে স্পেশাল স্ক্রিনিং হয়েছিল। আমন্ত্রিত সবার সঙ্গে দেখেছি। তখন চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, কবি জয় গোস্বামীসহ অনেকেই এসেছিলেন। তাঁরা সবাই প্রশংসা করেছিলেন।
প্রশ্ন :
‘ঝরা পালক’-এ আপনি কবিপত্নী লাবণ্য প্রভা দাশ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কেমন ছিল এই চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা? নিজেকে লাবণ্য প্রভা দাশ হিসেবে পর্দায় দেখে কেমন লাগল?
চরিত্রটি নিয়ে কিন্তু অনেক বিতর্ক আছে। নানা মানুষ নানা কিছু বলেন আরকি। কিন্তু আমরা যখন ছবিটি করতে গেলাম, অনেক রিসার্চ ওয়ার্ক হয়েছে। আমি নিজেও পড়াশোনা করেছি। তখন আমি আসলে অন্য এক মানুষকে আবিষ্কার করলাম। সেই ভদ্রমহিলা কিন্তু নিজে ভালো অভিনয় করতেন। খুব বিদুষী নারী ছিলেন। থিয়েটারে অভিনয় করতেন। ভালো লিখতেন। কিন্তু তিনি আসলে সবকিছুর বাইরে জীবনানন্দ দাশকে তাঁর জায়গাটা করে দেওয়ার জন্য স্যাক্রিফাইস করেছেন। তাঁদের এত টানাটানির সংসার ছিল। আসলে ওই মহিলাই চাকরি করে, টিউশনি করে চালাতেন অনেকখানি। জীবনানন্দ দাশ বাস্তবতাবিবর্জিত একজন মানুষ ছিলেন—আমার যা মনে হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আসলে সংসার করা খুব সহজ নয়। মহিলা নিজেও খুব একটা স্বস্তি পাননি জীবনে। তারপরও নানাভাবে প্রেরণা দিয়েছেন জীবনানন্দকে। এই চলচ্চিত্রে আমরা জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যের যে চরিত্রগুলো আছে, সেগুলোকে আমার চরিত্রের ভেতর দিয়ে দেখি।
প্রশ্ন :
সেটা কেমন?
যেমন এখানে আমি ডাবল একটা চরিত্র করেছি। আরেকটির নাম সুরঞ্জনা, যে কিনা এখনকার দিনের একজন ফিল্ম ডিরেক্টর। আমরা নানা ছায়া এই মহিলার চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখেছি।
প্রশ্ন :
আপনার কি দ্বৈত চরিত্র?
দ্বৈত বললে হবে না, আরও অনেকগুলো রোল এই মহিলার ভেতর দিয়ে আমরা দেখতে পাই। আমার কাছে মনে হয়েছে, অদ্ভুত একটা রসায়নও ছিল তাঁদের দাম্পত্যের মধ্যে। ছবিটা দেখলে আরও পরিষ্কার হবে। এখানে একটা ছবির মধ্যে অনেকগুলো চরিত্র দেখা যাবে। জীবনানন্দ দাশ নানা চরিত্র এই মহিলার মধ্য দিয়ে দেখতেন।
প্রশ্ন :
চরিত্রটি পর্দায় ফুটিয়ে তোলা কতটা কঠিন ছিল?
কঠিন ছিল। জীবনানন্দ দাশের অন্য চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তোলার জন্য আমাকে কমবেশি সবই পড়তে হয়েছে। এমনিতে উইমেন সাইকোলজির জায়গা থেকে অভিনয় করার, সেটা তো রয়েছেই। তবে কবি জয় গোস্বামী ও চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী আমারসহ অন্য সবারই ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
প্রশ্ন :
কবির জীবনী নিয়ে কাজ, অন্য কবির প্রশংসা পেয়ে কেমন লেগেছে?
যখন ওনারা প্রশংসা করেন, তখন মনে হয়, আমি সফল। আমার কথা বাদ দিলাম, তাঁরা যখন প্রশংসা করেছেন, তখন মনে হয়েছে, চরিত্রটার প্রতি অন্তত সুবিচার করতে পেরেছি। চরিত্রটাকে অনেক ভালোও বেসেছি। ভালোবাসতে হয়েছে। কারণ, জীবনানন্দ দাশ ও তাঁর পুরো পরিবারকে টেনে নিয়েছেন এই মহিলাই।
প্রশ্ন :
জীবনানন্দ দাশ চরিত্রে ব্রাত্য বসু অভিনয় করলেন। তাঁর সঙ্গে প্রথম কাজ। আপনার স্বামীর চরিত্রে কেমন করলেন?
রাহুল ব্যানার্জি অল্প বয়সী জীবনানন্দ দাশের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু দুটো লাবণ্য প্রভা দাশ আমিই করেছি। সবাই সবার জায়গায় অসম্ভব ভালো করেছেন আসলে। ব্রাত্যদার কথা বলতে গেলে, তিনি তো একজন মন্ত্রী। রাজ্য শাসন করেন, তাঁর একটা পজিশনও আছে। এসব পেছনে ফেলে, একটা চরিত্রকে কতটা ভালোবাসলে, একজনের আর্ট–কালচারের প্রতি কতটা দায়ভার থাকলে, সেগুলোকে বাইরে রেখে এসে সাধারণ একজন মানুষের মতো অভিনয় করে গেছেন, ভাবতেই অবাক লাগে। এটা বড় শিক্ষণীয় জায়গা। কারণ, তিনি তো একটি ইনস্টিটিউশন, শুধু অভিনয়ের জায়গায় নয়, একজন ইন্টেলেকচুয়ালও—সবকিছু মিলিয়েই তো তিনি।
প্রশ্ন :
আপনি বলছিলেন, কবির স্ত্রী হওয়াটা কঠিন ছিল। একজন শিল্পীর স্বামী বা স্ত্রী হওয়াটা কতটা কঠিন?
এই চরিত্রটায় যে অভিনয় করেছি, সে–ও তো আসলে একজন শিল্পীপত্নী। শিল্পীর এসব ফ্যান্টাসি, বাস্তবতাহীনতা এগুলোর সঙ্গে চলা, চলতে গিয়ে আমিও অনুভব করেছি, আসলে একজন শিল্পীর সঙ্গে দীর্ঘদিন চলা এবং মানিয়ে নেওয়া, আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা খুব সাধারণ বিষয় নয় আসলে। এটার জন্য ধৈর্যশীল হতে হয়। অন্য রকম ধৈর্য থাকতে হয়। সহনশীলতা হতে হয়। অবশ্যই শিল্পী মানুষটার প্রতি প্রচণ্ড রকম ভালোবাসা না থাকলে যেকোনো শিল্পীর সঙ্গে সংসার করা সত্যিই কঠিন কাজ।
প্রশ্ন :
তাহলে তো শিল্পীর স্ত্রী ও স্বামীদের অ্যাওয়ার্ড দেওয়া উচিত?
এটা তো সত্য, শিল্পীদের স্বামী–স্ত্রীদের অ্যাওয়ার্ড দেওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণভাবে সহবস্থান এই জিনিসটা কিন্তু খুবই কঠিন কাজ। এটা যাঁরা করেন, তাঁদের তো সাধুবাদ জানাই। শিল্পীদের খুবই মুড সুইং হয়ে থাকে, সেটা আমি নিজেও একজন শিল্পী বলেই বলছি। ‘ঝরা পালক’–এ আমি যে চরিত্রে অভিনয় করেছি, সে যার সঙ্গে থাকত, তার তো অসম্ভব বেশি মুড ছিল। বাস্তবের জীবনে তিনি এক্সিস্টই করতেন না। তাই বলি, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক তাঁদের জীবনসঙ্গী যাঁরা থাকেন, তাঁদের সবাইকে আমি সশ্রদ্ধ প্রার্থনা করি।