‘চিকনি চামেলি’ থেকে ‘কালা চশমা’ নাচে বাজিমাত ক্যাটরিনার

ক্যাটরিনা কাইফ। আইএমডিবি

বলিউডের নাচের গানে ক্যাটরিনা কাইফের উপস্থিতি এখন আলাদা এক আকর্ষণ। ‘শিলা কি জওয়ানি’, ‘চিকনি চামেলি’, ‘কমলি’, ‘কালা চশমা’, ‘স্ব্যাগ সে স্বাগত’—একটির পর একটি গানে তাঁর নাচ দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। পর্দায় তাঁর শরীরী ভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস আর ছন্দের সঙ্গে তাল মেলানোর ক্ষমতা দেখে আজ অনেকেরই মনে হতে পারে, ক্যাটরিনা বুঝি শুরু থেকেই দুর্দান্ত নৃত্যশিল্পী ছিলেন।

কিন্তু বাস্তব গল্পটা একেবারেই আলাদা। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নাচ নিয়ে কম অপমান সহ্য করতে হয়নি ক্যাটরিনাকে। এমনকি এক কোরিওগ্রাফার তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি নাচে শূন্য। তোমার ছেড়ে দেওয়া উচিত।’ সে কথাই একসময় ক্যাটরিনাকে বিশ্বাস করিয়ে দিয়েছিল, হয়তো তিনি সত্যিই নাচতে পারেন না। অথচ কয়েক বছর পর সেই ক্যাটরিনাই এমন সব গানে নাচলেন, যেগুলো বলিউডের জনপ্রিয় নাচের গানের তালিকায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

সম্প্রতি কোরিওগ্রাফার বসকো মার্টিস ও সিজার গোমেজের পডকাস্টে ক্যাটরিনার নাচ নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে সেই পুরোনো দিনের গল্প। সেখানে ছিলেন কোরিওগ্রাফার ও পরিচালক ফারাহ খান। তাঁরাই মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘শিলা কি জওয়ানি’ কীভাবে ক্যাটরিনার ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন এনেছিল।

‘শিলা কি জওয়ানি’ বদলে দিয়েছিল সব
‘তিস মার খান’ সিনেমার ‘শিলা কি জওয়ানি’ শুধু একটি জনপ্রিয় আইটেম গান ছিল না, ক্যাটরিনার জন্য এটি ছিল ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। গানটি মুক্তির পর দর্শকের চোখে ক্যাটরিনার পরিচয়ই যেন বদলে যায়।
পডকাস্টে বসকো বলেন, ‘শিলা কি জওয়ানি’ ক্যাটরিনার জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ ছিল। ফারাহও তাঁর সঙ্গে একমত হন।

তবে ফারাহর মনে পড়ে, সেই সময় ক্যাটরিনাকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কেউ খুব একটা চিনতেন না। ক্যাটরিনা এর আগে ‘টাচ মি’সহ বেশ কিছু গানে নেচেছেন। কিন্তু সেগুলো তাঁকে নাচের তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি।

ফারাহ বলেন, ‘তখন আমরা জানতামই না যে ক্যাটরিনা নাচতে পারে। সে “টাচ মি” করেছিল, কিন্তু নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিল না। ক্যাটরিনার সঙ্গে আমার প্রথম কোরিওগ্রাফ করা গান ছিল “জাস্ট চিল”—“ম্যায়নে পেয়ার কিউঁ কিয়া” সিনেমার।’
এরপর আসে ‘শিলা কি জওয়ানি’। ফারাহ জানান, গানটির শুটিংয়েও ছিল না বিশাল আয়োজন। মাত্র ১০ জন ছেলে ও ক্যাটরিনাকে নিয়ে গানটির শুটিং করেছিলেন তিনি। কিন্তু পর্দায় সেই গান যে এত বড় আলোড়ন তুলবে, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেননি।
গানটি মুক্তির পর ক্যাটরিনার নাচ নিয়ে দর্শকের ধারণা বদলে যায়। তাঁর নাচের সঙ্গে যুক্ত হয় একধরনের আত্মবিশ্বাস, সাবলীলতা ও তারকাসুলভ উপস্থিতি।

ক্যাটরিনা কাইফ। আইএমডিবি

‘তুমি নাচে শূন্য’
ক্যাটরিনার এই পরিবর্তনের পেছনে অবশ্য শুধু একটি গান নয়, ছিল দীর্ঘ পরিশ্রম। পডকাস্টে বসকো জানান, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ক্যাটরিনাকে নাচের জন্য অপমান করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ক্যাটরিনা অনেক পরিশ্রম করতেন, কিন্তু এক কোরিওগ্রাফার তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি নাচে শূন্য। তোমার ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
কথাটি শুনে ফারাহ খান বিস্মিত হন। তিনি মজা করে বলেন, ‘আহা, বেচারি! শূন্য তো ছিল না। হয়তো চার–পাঁচ ছিল। কিন্তু “শিলা কি জওয়ানি”র পর সে ৯ বা ১০ হয়ে গেল।’
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ক্যাটরিনার পরিবর্তনের গল্প। একজন মানুষকে তাঁর দুর্বলতার কথা বলা খুব সহজ। কিন্তু সেই দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করা কঠিন। ক্যাটরিনা সেটিই করেছিলেন।

অপমানের পর ক্যাটরিনা নাচ ছেড়ে দেননি; বরং আরও বেশি অনুশীলন করেছেন। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। একসময় যে জায়গায় তাঁকে ‘শূন্য’ বলা হয়েছিল, সেখান থেকেই তিনি নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান, যেখানে তাঁর নাচই হয়ে ওঠে জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

ক্যাটরিনা কাইফ। আইএমডিবি

বসকোর কথায় বদলে যায় আত্মবিশ্বাস
ক্যাটরিনা নিজেও এর আগে এক সাক্ষাৎকারে নাচ নিয়ে তাঁর শুরুর দিকের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, একজন কোরিওগ্রাফারের মন্তব্য তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, তিনি কখনোই ভালো নৃত্যশিল্পী হতে পারবেন না।

ক্যাটরিনার মনে হয়েছিল, তিনি নাচতেই পারেন না।  এই জায়গায় বসকোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাটরিনার ভাষ্য অনুযায়ী, বসকো তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে তিনি আসলে ভালো নাচেন। শুধু নিজের ওপর আরেকটু কাজ করতে হবে। এই ছোট্ট উৎসাহই হয়তো তাঁর আত্মবিশ্বাসে বড় পরিবর্তন আনে।
পরে বসকো–সিজার জুটির কোরিওগ্রাফিতেই ‘রেস’ সিনেমার ‘টাচ মি’ গানে নাচেন ক্যাটরিনা। সেই সময়ও তাঁর নাচ নিয়ে কাজ করার সুযোগ ছিল। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে শুরু করেন, নাচ তাঁর নাগালের বাইরে নয়।

‘চিকনি চামেলি’ থেকে ‘কালা চশমা’
‘শিলা কি জওয়ানি’র পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ক্যাটরিনাকে। ‘অগ্নিপথ’–এর ‘চিকনি চামেলি’ তাঁর নাচের জনপ্রিয়তাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দেয়। এই গানে ক্যাটরিনার নাচ ছিল আরও আক্রমণাত্মক, শক্তিশালী ও ছন্দময়। গানটি মুক্তির পর তাঁর নাচ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসে।

এরপর ‘ধুম ৩’–এর ‘কামলি’। এখানে আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নাচের চ্যালেঞ্জ ছিল। গানের কোরিওগ্রাফি, শরীরের নমনীয়তা ও দ্রুতগতির মুভমেন্ট—সব মিলিয়ে গানটি ক্যাটরিনার নাচের আরেকটি দিক দেখায়।

আরও পড়ুন

‘কালা চশমা’তে এসে ক্যাটরিনার নাচ আবার বদলে যায়। এবার ছিল পার্টি ধাঁচের নাচ, সহজ ভঙ্গি ও তারুণ্যের ছন্দ। গানটি শুধু সিনেমার দর্শক নয়, সামাজিক অনুষ্ঠান ও পার্টিরও অন্যতম জনপ্রিয় গান হয়ে ওঠে।

এর সঙ্গে যোগ হয় ‘স্ব্যাগ সে স্বাগত’, ‘আফগান জালেবি’, ‘নাচদে নে সারে’র মতো গান। একসময় যাঁকে নাচের জন্য শুনতে হয়েছিল ‘তুমি শূন্য’, তিনিই তখন বলিউডের অন্যতম নির্ভরযোগ্য নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী।

দুই বছর বড় পর্দার বাইরে
এই মুহূর্তে অবশ্য ক্যাটরিনা তাঁর নাচের ক্যারিয়ারের সেই ব্যস্ত সময় থেকে কিছুটা দূরে। গত দুই বছর তাঁকে বড় পর্দায় দেখা যায়নি। ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর তিনি প্রথম সন্তানের মা হন। বর্তমানে মাতৃত্বের সময় উপভোগ করছেন অভিনেত্রী।
ক্যাটরিনার সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘মেরি ক্রিসমাস’। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত এ সিনেমায় বিজয় সেতুপতির সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও পরে ওটিটিতে দর্শকের আগ্রহ তৈরি করে।

হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে