অড্রে হেপবার্ন ১৯৮৯ সালের বাংলাদেশ সফরে এসে মিশে গিয়েছিলেন এ দেশের বাচ্চাদের সঙ্গে। এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন তাঁর আশপাশের সবাইকে
অড্রে হেপবার্ন ১৯৮৯ সালের বাংলাদেশ সফরে এসে মিশে গিয়েছিলেন এ দেশের বাচ্চাদের সঙ্গে। এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন তাঁর আশপাশের সবাইকেছবি: ইউনিসেফের ফেসবুক পেজ থেকে

চোখে ভাসে রোমান হলিডে সিনেমার সেই দৃশ্য। পাগলের মতো ভেসপা চালাচ্ছিলেন রাজকুমারী অ্যান। পেছনে বসে ভেসপাটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন সাংবাদিক জো ব্রাডলি। সে এক রোমাঞ্চকর দৃশ্য!
রোমান হলিডের সেই 'রাজকুমারী' অড্রে হেপবার্নের চলে যাওয়ার দিন আজ ২০ জানুয়ারি। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রখ্যাত এই অভিনেত্রী। ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি ৬৩ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডে নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। সেখানেই তাঁর সমাধি।

default-image

১৯২৯ সালের ৪ মে বেলজিয়ামে জন্মেছিলেন অড্রে। মা–বাবা নাম রেখেছিলেন অড্রে ক্যাথলিন রুস্টন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ছদ্মনাম নেন এডা ভন হেমেস্ট্রা। পরে যখন সিনেমার দুনিয়ায় প্রবেশ করলেন, পরিচিতি পেলেন অড্রে হেপবার্ন নামে। গত শতকের প্রতিভাবান এই অভিনেত্রী ও ফ্যাশন আইকনের অভিনয় যেমন ছিল সাবলীল, তেমনি তাঁর দ্যুতিময় চাহনি সহজে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। শৈশবে মা–বাবাকে একসঙ্গে বেশি দিন পাননি অড্রে। মা–বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর অড্রেকে নিয়ে তাঁর মা চলে যান লন্ডনে।

default-image
একা থাকতে ভালোবাসতেন। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'প্রায়ই আমাকে একা থাকতে হতো। শনিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বাসায় যদি একা থাকতে পারতাম, তাতে আমার খুব ভালো লাগত। এভাবেই আমি উজ্জীবিত হই।

এক আলোকচিত্রীর মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন অড্রে। ব্রিটিশ থিয়েটারে কোরাস গার্ল হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর সুযোগ পেয়েছিলেন সিনেমায়। তবে অড্রে হেপবার্নের জীবনের মোড় ঘুরে যায় রোমান হলিডেতে অভিনয়ের পর।

বিজ্ঞাপন

সে ছবিতে প্রযোজকেরা প্রথমে এলিজাবেথ টেলরকে নিতে চাইলেও পরিচালক উইলিয়াম উইলারের অড্রেকে স্ক্রিন টেস্টে ভালো লেগে যায়। ছবিতে সাংবাদিক জো ব্রাডলি চরিত্রে অভিনয় করা গ্রেগরি পেক আগেই বলেছিলেন, অড্রে তাঁর এই অভিনয়ের জন্য অস্কার পাবেন। তাই হয়েছিল, অড্রে ১৯৫৪ সালে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই সেরা নারী অভিনয়শিল্পী হিসেবে প্রথমবারের মতো জিতে নেন অস্কার, বাফটা আর গোল্ডেন গ্লোব—তিনটি পুরস্কার।

default-image

এ ছাড়া তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস, শ্যারেড, দ্য চিলড্রেনস আওয়ার, প্যারিস হোয়েন ইট সিজলস, দ্য নানস স্টোরি, ফানি ফেস, হাউ টু স্টিল আ মিলিয়ন, মাই ফেয়ার লেডির মতো ছবিগুলোয়। অভিনয় করেছেন ওয়ার অ্যান্ড পিস সিনেমায়ও। তবে এক রোমান হলিডের জন্যই আলাদা করে মনে রাখতে হবে অড্রে হেপবার্নকে। এই সিনেমার জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন তখনকার সময়ের ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার।

default-image

লন্ডনের তরুণ শিল্পপতি জেমস হ্যানসনের প্রেমে পড়ে যান অড্রে হেপবার্ন। কিন্তু বেশি দিন টেকেনি তাঁদের প্রেম। পরে একে একে প্রযোজক মাইকেল বাটলার, উইলিয়াম হোলডেন, অভিনেতা মেল ফেরার, ইতালিয়ান মনোবিদ আন্দ্রে ডট্টির সঙ্গে প্রেম হয়েছিল অড্রের। নিদারুণ এক বিষণ্নতায় ভরা ছিল তাঁর জীবন।

একা থাকতে ভালোবাসতেন। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'প্রায়ই আমাকে একা থাকতে হতো। শনিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বাসায় যদি একা থাকতে পারতাম, তাতে আমার খুব ভালো লাগত। এভাবেই আমি উজ্জীবিত হই।'

default-image
পাশ্চাত্যে বসে আমরা জানি যে বাংলাদেশ বন্যা আর দুর্যোগের দেশ। কিন্তু আমার কাছে বাংলাদেশ মানে কবিতা আর সৌন্দর্যের দেশ।
অড্রে হেপবার্ন

ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে ১৯৮৯ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকায় এসেছিলেন উজ্জীবিত এ নারী। এক সপ্তাহ থেকে ফিরে যান ২৪ অক্টোবর। এর মধ্যে তিনি ঘুরে দেখেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের বিভিন্ন দাতব্য কর্মকাণ্ড। এক ফাঁকে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে, এফডিসিতে। মহাখালীর পান্ডা গার্ডেনে এক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়েছিলেন অভিনেত্রী কবরী, আসাদুজ্জামান নূর, লাকী ইনামসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে।

এফডিসিতে তাঁর দেখা হয় তখনকার চলচ্চিত্রশিল্পী, প্রযোজক-পরিচালকসহ অনেকের সঙ্গে। সেদিন এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, 'পাশ্চাত্যে বসে আমরা জানি যে বাংলাদেশ বন্যা আর দুর্যোগের দেশ। কিন্তু আমার কাছে বাংলাদেশ মানে কবিতা আর সৌন্দর্যের দেশ।'

default-image

অভিনেত্রী ববিতাও ছিলেন সেই আয়োজনে। সেদিনের স্মৃতিচারণা করে ববিতা বললেন, 'অড্রে হেপবার্নের আগমন উপলক্ষে সেদিন এফডিসির ঝরনা স্পটে একটি সুন্দর মঞ্চ করা হয়েছিল। সেদিন আমি ইংরেজিতে আর শাবানা আপা বাংলায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাটানো সেই সময়টা আজও আমার জীবনের অসাধারণ একটা মুহূর্ত হয়ে আছে।'

বিজ্ঞাপন

ববিতা আরও বলেন, 'আমি সেদিন অড্রে হেপবার্নকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সিনেমা, আর্ট, কালচার—এসব ছেড়ে এখন পৃথিবী ঘুরে ঘুরে ছোট শিশুদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছ, কেমন লাগছে? উত্তরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “হিউম্যানিটি ইজ দ্য বেস্ট অব অল আর্টস।'

default-image
অড্রে হেপবার্নকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সিনেমা, আর্ট, কালচার—এসব ছেড়ে এখন পৃথিবী ঘুরে ঘুরে ছোট শিশুদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছ, কেমন লাগছে? উত্তরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “হিউম্যানিটি ইজ দ্য বেস্ট অব অল আর্টস।
ববিতা

জীবন অড্রেকে দিয়েছিল অনেক। কিন্তু না পাওয়ার বেদনাও তাঁর কম ছিল না। সাধ ছিল মা হওয়ার। বেশ কয়েকবার তাঁর গর্ভপাত হয়। এ জন্য ক্যারিয়ার থেকে বিরতিও নিয়েছিলেন। তাঁর বড় ছেলে শান হেপবার্ন ফেরারের জন্মের বেশ কয়েক বছর পর মেল ফেরারের সঙ্গে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তিনি ইতালীয় মনস্তত্ত্ববিদ আন্দ্রে ডট্টিকে বিয়ে করেন ১৯৬৯ সালে। এক বছর পরই তাঁর আরেক পুত্রসন্তান, লুকা ডট্টির জন্ম হয়।

অড্রে হেপবার্ন সেই নারী, যাঁর নামে তিন রকম টিউলিপ, লিলি ও গোলাপের নামকরণ করা হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে তাঁর নামে হলিউডের খুব কাছে লাস ভেগাসে একটি সড়কের নাম রাখা হয়। রূপ আর গুণে অনন্য অড্রে হেপবার্ন রবীন্দ্রনাথের কবিতা ভালোবাসতেন।

default-image

১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি, অর্থাৎ আজকের দিনে তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা গ্রেগরি পেক। অড্রে হেপবার্নের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জনসমক্ষে গ্রেগরি আবৃত্তি করেছিলেন অড্রের প্রিয় রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি। 'আই সিম টু হ্যাভ লাভড ইউ ইন নাম্বারলেস ফর্মস, নাম্বারলেস টাইমস.../ ইন লাইফ আফটার লাইফ, ইন এজ আফটার এজ, ফরএভার।' এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, 'অনন্ত প্রেম।' যার প্রথম দুই পঙ্‌ক্তি এমন, 'তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি/ শত রূপে শতবার, জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।'

default-image
হলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন