ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত অভিনেতা রাসেল
ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের চারটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ব্রিটিশ কমেডিয়ান ও অভিনেতা রাসেল ব্র্যান্ড। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টের একটি জুরিবোর্ড তাঁকে একজন নারীকে ধর্ষণ এবং আরও তিন নারীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা আরও দুটি ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের চেষ্টা-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন ৫১ বছর বয়সী রাসেল ব্র্যান্ডের স্ত্রী লরা ব্র্যান্ড। জুরির সদস্যরা একে একে রায় ঘোষণা করার সময় চোখ বন্ধ করে ছিলেন অভিনেতা। তবে তাঁর মধ্যে বিশেষ কোনো আবেগের প্রকাশ দেখা যায়নি। রায় ঘোষণার পর বিচারক জোয়েল বেনাথান জানান, ব্র্যান্ডকে উল্লেখযোগ্য মেয়াদের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। আগামী সোমবার (৯ নভেম্বর) তাঁর সাজা ঘোষণা করা হবে। এরই মধ্যে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
যুক্তরাজ্যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ফলে ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়ের পর তাঁর সম্ভাব্য সাজা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চার নারীর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে চার নারীর সঙ্গে সংঘটিত অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ব্র্যান্ড। ঘটনাগুলো ঘটেছিল বিভিন্ন স্থানে। এর মধ্যে রয়েছে একটি বেতারকেন্দ্র, একটি রেকর্ডিং স্টুডিও এবং লন্ডনে তাঁর নিজ বাসভবন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি ধর্ষণ এবং তিনটি যৌন নিপীড়নের ঘটনা রয়েছে। অন্যদিকে ১৯৯৯ সালে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ, ২০০৪ সালে আরেক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ এবং ২০০১ সালে এক নারীকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টার অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
চার সপ্তাহ ধরে চলা এই বিচারপ্রক্রিয়ায় ছয় নারী ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ এনেছিলেন। তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, যৌন অপরাধের অভিযোগকারীরা আজীবন পরিচয় গোপন রাখার অধিকার পান।
অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন ব্র্যান্ড
বিচার চলাকালে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন রাসেল ব্র্যান্ড। তাঁর দাবি ছিল, অতীতে তিনি অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালেও সব ক্ষেত্রেই শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল উভয়ের সম্মতিতে। অভিযোগকারীদের বর্ণনায় কিছু ঘটনা নতুনভাবে সাজানো হয়েছে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।
তবে আদালতে শুনানির সময় প্রসিকিউশন পক্ষ জানায়, ব্র্যান্ড নিজের জনপ্রিয়তা, পরিচিতি ও প্রভাব ব্যবহার করে নারীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী নারীদের বক্তব্য ও সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে মামলাটি সাজানো হয়।
মামলার জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি ডেভিড রবার্টস আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, ব্র্যান্ড তাঁর তারকাখ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে যৌন অপরাধ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, নিজের ইচ্ছা পূরণের ক্ষেত্রে সম্মতি পাওয়া গেল কি না, সেটিকে গুরুত্ব দিতেন না ব্র্যান্ড।
তদন্তে শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য
রাসেল ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ফোরের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘ডিসপ্যাচেস’এবং দ্য টাইমস ও সানডে টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। এরপর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ।
তদন্তের অংশ হিসেবে শতাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন কর্মকর্তারা। নেওয়া হয় চার শতাধিক সাক্ষীর জবানবন্দি এবং পর্যালোচনা করা হয় ১ হাজার ৪০০টির বেশি নথি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানের পুরোনো নকশা, ছবি ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
তদন্তে ব্র্যান্ডের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সাক্ষীদের বর্ণনা ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। পুলিশের দাবি, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ ও ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত ছিল। তাই সাক্ষ্য, পুরোনো নথি এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মামলার প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়।
রায় ঘোষণার পর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট অ্যান্ডি ফারফি অভিযোগকারী নারীদের সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ব্র্যান্ড তাঁর প্রভাব, সামাজিক অবস্থান ও খ্যাতি ব্যবহার করে নারীদের শোষণ করেছেন। এ রায় প্রমাণ করে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।
আরও দুই ধর্ষণের অভিযোগে তদন্ত
চারটি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেও ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে আরও দুটি ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। অভিযোগকারীদের একজনের বয়স ঘটনার সময় ১৬ বছর ছিল বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগে এখনো নতুন কোনো দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়নি।
মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্র্যান্ডকে সতর্কতামূলকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে অভিযোগকারীদের বয়সসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি পুলিশ।
কেটি পেরির সঙ্গে বিয়ে, পরে ধর্মীয় ভাবমূর্তি
একসময় হলিউড ও ব্রিটিশ বিনোদনজগতের পরিচিত মুখ ছিলেন রাসেল ব্র্যান্ড। কমেডিয়ান হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর অভিনয়েও সাফল্য পান তিনি। ‘ফরগেটিং সারাহ মার্শাল’, ‘গেট হিম টু দ্য গ্রিক’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন।
২০০৯ সালে মার্কিন পপ তারকা কেটি পেরির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয়। ২০১০ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। তবে ২০১১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। পরবর্তী সময়ে ব্র্যান্ডের জীবনযাপনে পরিবর্তন আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় ও রক্ষণশীল ভাবধারার বক্তব্য প্রচার শুরু করেন তিনি। অনলাইনে নিজের অনুসারীদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ভিন্ন এক ভাবমূর্তিতে।
কিন্তু যৌন অপরাধের অভিযোগ এবং এবার আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা তাঁর সেই ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সোমবার সাজা ঘোষণার মধ্য দিয়ে মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হবে।
এএফপি ও বিবিসি অবলম্বনে